বুধবার ১ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডিজিটাল ডিভাইস স্ক্রিনের আলোয় হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব

🗓 শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬

👁️ ৯৪ বার দেখা হয়েছে

🗓 শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬

👁️ ৯৪ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(১৫ মে) :: একসময় বিকাল মানেই ছিল মাঠে ছুটে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা আর হইচই। এখন সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে মোবাইল ফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ ও টেলিভিশনের স্ক্রিন। একক পরিবার, ব্যস্ত নগরজীবন এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিটি দিনে শিশুদের শৈশব ক্রমেই আটকে যাচ্ছে ডিজিটাল পর্দার ভেতর।

ইরার গল্প : একটি পরিবারের বাস্তবতা

পাঁচ বছর বয়সী ইরা ঘুম থেকে উঠে আবার ঘুমানো পর্যন্ত মোবাইল ফোন হাত থেকে নামায় না। মোবাইল কেড়ে নিতে গেলে সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার শুরু করে। স্কুলশিক্ষিকা মা ও ব্যবসায়ী বাবার অনুপস্থিতিতে সারাদিন গৃহকর্মীর কাছে থাকা ইরার ছোটবেলায় খাওয়ার অনীহা দূর করতে মোবাইলে কার্টুন দেখানো হতো। এরপর ধীরে ধীরে মোবাইলই হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী।

সম্প্রতি ইরার মুখে অশ্লীল শব্দ শুনে থমকে যান তার মা। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, তিনি স্কুলে থাকার সময় গৃহকর্মী ইরার সামনেই মোবাইলে অশ্লীল ভিডিও দেখত। এই ঘটনার পর ওই মা স্কুল থেকে এক মাসের ছুটি নিয়ে সন্তানের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন।

গবেষণা কী বলছে

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) সম্প্রতি এক গবেষণায় উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার ছয়টি স্কুলের ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৪২০ জন শিশুর ওপর পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, পাঁচজনের মধ্যে চারজন শিশু (৮৩ শতাংশ) প্রতিদিন ২ ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিন ব্যবহার করছে। গড়ে একটি শিশু প্রতিদিন স্মার্টফোন, টেলিভিশন, ট্যাবলেট, কম্পিউটার ও গেমিং ডিভাইসে প্রায় ৪.৬ ঘণ্টা সময় কাটাচ্ছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত ২ ঘণ্টার সীমার দ্বিগুণেরও বেশি।

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, দেশের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি শিশু চোখের সমস্যায় ভুগছে এবং ৮০ শতাংশ শিশু প্রায়ই মাথাব্যথায় আক্রান্ত হচ্ছে। যেসব শিশু দিনে ২ ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তারা গড়ে মাত্র ৭.৩ ঘণ্টা ঘুমায়, যা সুস্থ বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার তুলনায় অনেক কম। এ ছাড়া প্রায় ১৪ শতাংশ শিশু স্থূলতার শিকার এবং অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারকারীদের মধ্যে এই হার আরও বেশি।

শিশুর মস্তিষ্কে কী হচ্ছে

চলতি বছরের মার্চ মাসে যুক্তরাজ্যের ইস্ট অ্যাঙ্গলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট লন্ডনের বিজ্ঞানীরা পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যেখানে এক সেকেন্ডে একটি দৃশ্য বিশ্লেষণ করতে পারেন, একটি ছোট শিশুর মস্তিষ্ক একই তথ্য বিশ্লেষণ করতে সময় নেয় প্রায় দশগুণ। ফলে ইউটিউব, সোশ্যাল মিডিয়ার রিলস বা কার্টুনের দ্রুত পরিবর্তনশীল দৃশ্যগুলো শিশুর ধীর মস্তিষ্কের জন্য অসহ্য চাপ তৈরি করে। এতে শিশু স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও সহজে উত্তেজিত হয়, ছোট বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, ডিজিটাল ডিভাইস এখন জীবনের অংশ হলেও শিশুদের সুস্থতার জন্য সীমা নির্ধারণ করা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী স্কুলগামী শিশুদের বিনোদনমূলক স্ক্রিন টাইম দিনে ২ ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত।

চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও পেডিয়েট্রিক সার্জন ডা. জামসেদ ফরিদী জামি জানান, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার শিশুর চোখে চাপ সৃষ্টি, মাথাব্যথা ও মনোযোগ কমানোর পাশাপাশি সরাসরি মেলামেশা কমিয়ে দেয়, যা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

আইসিডিডিআরবির অ্যাসিস্টেন্ট সায়েন্টিস্ট ডা. শাহরিয়া হাফিজ কাকন অভিভাবকদের সতর্ক করে বলেন, শিশুর দেরিতে ঘুমানো, বারবার মাথাব্যথা, অস্বাভাবিক খিটখিটে মেজাজ বা খেলাধুলার প্রতি অনীহার মতো লক্ষণগুলো এড়িয়ে গেলে বিপদ আরও বাড়বে।

অন্য দেশ কী করছে

শিশুদের স্ক্রিন আসক্তির ক্ষতিকর দিক বিবেচনায় নিয়ে অনেক দেশ কঠোর পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। গত ২৭ মার্চ ইংল্যান্ড সরকার নির্দেশনা জারি করে জানিয়েছে, দুই বছরের কম বয়সী শিশুকে একা স্ক্রিন দেখানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সীদের জন্য অভিভাবকের সঙ্গে বসে দৈনিক সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা স্ক্রিন দেখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। খাবার সময় এবং ঘুমানোর অন্তত ১ ঘণ্টা আগে স্ক্রিন বন্ধ রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

পরিবার থেকেই শুরু হোক সমাধান

ঢাকার ফার্মগেটের ব্যবসায়ী আবুল হাশেম বলেন, শিশুর কান্না থামাতে বা ব্যস্ত রাখতে মোবাইল হাতে তুলে দেওয়ার সহজ সমাধান অজান্তেই ডিজিটাল আসক্তি তৈরি করছে। তিনি নিজে বাড়িতে ডিভাইস ব্যবহারের নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করেছেন এবং সপ্তাহে একদিন ‘নো ডিভাইস ডে’ পালন করেন। এতে তাঁর পরিবারে স্ক্রিন আসক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে বলে তিনি জানান।

গবেষকরা বলছেন, প্রযুক্তি পুরোপুরি বন্ধ করা সমাধান নয়, বরং শিশুদের বাড়িতে ও স্কুলে স্বাস্থ্যকর ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। অভিভাবকদের উচিত নিজেরা মোবাইল আসক্তি কমিয়ে সন্তানের সামনে ভালো উদাহরণ তৈরি করা এবং শিশুর হাতে গল্পের বই, রঙিন খাতা ও খেলনা তুলে দিয়ে প্রকৃতির কাছে নিয়ে যাওয়া। একই সঙ্গে বাংলাদেশে এই ‘অদৃশ্য মহামারী’ নিয়ন্ত্রণে জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম শুরু করার এখনই উপযুক্ত সময় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এই বিভাগ এর আরো খবর

লাভ কমায় কমতে পারে চাল উৎপাদন

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর