কক্সবাংলা ডটকম(৩০ জুন) :: বর্তমানে অনেক পরিবারেই একটি অতিপরিচিত দৃশ্য দেখা যায়। শিশু কাঁদছে কিংবা খেতে চাইছে না, আর ব্যস্ত অভিভাবক তার কান্না থামাতে হাতের কাছে থাকা স্মার্টফোন বা ট্যাবলেটটি বাড়িয়ে দিচ্ছেন।
কার্টুনের রঙিন দুনিয়ায় মগ্ন হয়ে শিশুটি শান্ত হচ্ছে ঠিকই কিন্তু এর বিনিময়ে তার যা ক্ষতি হচ্ছে তা অপূরণীয়।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক এক গবেষণার বরাতে বলা হয়েছে, দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের ‘স্ক্রিন টাইম’ বা ডিজিটাল স্ক্রিনের সামনে রাখার অভ্যাস তাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মানের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এ বয়সে স্ক্রিন ব্যবহার শিশুর সামগ্রিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের স্ক্রিন থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
যুক্তরাজ্যের চার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—ইউনিভার্সিটি অব লিডস, লিডস ট্রিনিটি, লাফবোরো ও অ্যাস্টন ইউনিভার্সিটির গবেষকদের একটি যৌথ দল গবেষণাটি পরিচালনা করেছে। দলটির নাম ‘অ্যাকশন অন ডিজিটাল ডিভাইস ইমার্সিভ কন্ডিশনস টিম’।
এ বিষয়ের ওপর বিশ্বজুড়ে এখন পর্যন্ত যত গবেষণা হয়েছে, তার মধ্যে এটিকে সবচেয়ে বড় ও বিস্তৃত পর্যালোচনা হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।
গবেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে সরকার বা নীতিনির্ধারকরা মূলত কিশোর-কিশোরীদের ডিজিটাল অভ্যাস এবং ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞার ওপর বেশি নজর দিচ্ছেন।
ফলে একদম ছোট শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহারের বিষয়টি আড়ালে পড়ে যাচ্ছে, যাকে গবেষকরা ‘বেবি ব্লাইন্ড স্পট’ বা শিশুদের ক্ষেত্রে নীতিমালার অন্ধবিন্দু হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অথচ বর্তমান যুগে দৈনন্দিন অভিভাবকত্বের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার।
লিডস ইউনিভার্সিটির মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের সিনিয়র লেকচারার ও গবেষণার অন্যতম প্রধান গবেষক রেফ ক্লেটন বলেন, ‘অভিভাবকরা নিজেরা কীভাবে স্ক্রিন ব্যবহার করবেন, সেই বিষয়ে সঠিক নির্দেশনার অভাব রয়েছে। ফলে তারা অজান্তেই সন্তানদের ছোটবেলা থেকে স্ক্রিনের প্রতি একটি অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস ও সম্পর্কের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।’
গবেষণায় দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের নিয়মিত ও ইচ্ছাকৃতভাবে স্ক্রিনের সামনে রাখার বেশকিছু ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে প্রধান ক্ষতিগুলো হলো—
⚫ অভিভাবকদের সঙ্গে দূরত্বের সৃষ্টি: স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে শিশুরা মা-বাবা বা পরিচর্যাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের ও মানসিক বন্ধন তৈরির সুযোগ কম পায়।
⚫ শারীরিক খেলার অভাব: অন্য শিশুদের সঙ্গে স্বাভাবিক খেলাধুলা করার সময় কমে যায়।
⚫ ভাষাগত বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়া: শিশুদের ভাষা শেখা ও কথা বলার স্বাভাবিক ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ে।
⚫ ঘুমের সমস্যা ও অতিরিক্ত উদ্দীপনা: অতি অল্প বয়সে স্ক্রিন দেখার ফলে শিশুদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে।
⚫ চোখের ক্ষতি ও স্থূলতা: স্ক্রিনের আলো চোখের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে ও দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কারণে শৈশবকালীন স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
⚫ ডিজিটাল ডিভাইসের ওপর নির্ভরতা: মা-বাবার কাছ থেকে সান্ত্বনা পাওয়ার পরিবর্তে শিশুরা এখন নিজেদের শান্ত করতে বা স্বস্তি পেতে ডিজিটাল ডিভাইসের দিকে ঝুঁকছে। \
যদিও গবেষণায় স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে নির্দিষ্ট কোনো বিকাশজনিত রোগের সরাসরি কারণ বা প্রভাবের সম্পর্ক প্রমাণিত হয়নি, তবে গবেষকরা বলছেন, দুই বছরের কম বয়সী কোনো শিশুরই নিয়মিত ইচ্ছাকৃতভাবে স্ক্রিন দেখা উচিত নয়।
যুক্তরাজ্যের সাবেক মন্ত্রী ও ‘১০০১ ক্রিটিক্যাল ডেইজ ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা অ্যান্ড্রিয়া লিডসম এ গবেষণাকে একটি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘মানুষের জীবনের প্রথম ১০০১ দিন হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিকাশের সময়। এ সময়ে স্ক্রিন শিশুদের খুব কমই উপকার করে, বরং বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।’
তিনি বলেন, ‘কোনো কনটেন্ট যখন গবেষণায় শিশুদের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হচ্ছে, তখন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সেটিকে “শিশুদের উপযোগী” হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়।’













