কক্সবাংলা ডটকম(১১ জুন) :: নয়াদিল্লি থেকে ‘এই সময়’-কে দীর্ঘ একান্ত সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
গণভবন ছেড়ে আসা, ইস্তফা না-দেয়ার কারণ থেকে বর্তমান সরকারের মূল্যায়ন, নিজের ও দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—সব বিষয়েই খোলামেলা সবিস্তার কথা বলেছেন শেখ মুজিবের কন্যা।
আজ তার তৃতীয় পর্ব।
প্রশ্ন: অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই বাংলাদেশ পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছে বলে আলোচনা ছিল। বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলেও পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?
শেখ হাসিনা: রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখা আর পাকিস্তানি ভাবধারায় রাষ্ট্রকে ফিরিয়ে নেওয়া এক বিষয় নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে যে কোনো সম্পর্ক হতে হবে ইতিহাসের সত্যকে স্বীকার করে, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা রক্ষা করে এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও আত্মসম্মান অক্ষুণ্ণ রেখে। কিন্তু বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দুর্বল করা, পাকিস্তানপন্থী শক্তিকে পুনর্বাসন করা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রভাব বাড়ানোর যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তার মধ্যে গভীর রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে।
প্রশ্ন: আপনার মতে, ইউনূস সরকারের পর বিএনপি সরকারের আমলে কি বাংলাদেশ পাকিস্তানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে? এ পরিবর্তনকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
শেখ হাসিনা: যারা এটিকে ‘নতুন কূটনীতি’ বলে প্রচার করছেন, তাদের কাছে আমার প্রশ্ন— পাকিস্তান কি ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়েছে? যুদ্ধাপরাধের দায় স্বীকার করেছে? বাংলাদেশের মানুষের ক্ষতকে সম্মান জানিয়েছে? যদি তা না করে থাকে, তাহলে এত দ্রুত সামরিক ও কৌশলগত ঘনিষ্ঠতার প্রয়োজন কেন? এটি শুধু কূটনৈতিক বিষয় নয়, বাংলাদেশের আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। যারা ১৯৭১-কে ভুলে যায়, তারা বাংলাদেশকে বুঝতে পারে না। আর যারা বাংলাদেশকে পাকিস্তানের ছায়ায় ফিরিয়ে নিতে চায়, তারা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিপজ্জনক খেলা খেলছে।
প্রশ্ন: নির্বাচনের পর অনেকে বলেছিলেন, জামায়াতকে ঠেকাতে বাধ্য হয়ে বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন। বিএনপি সরকার কি সেই প্রত্যাশার মর্যাদা দিতে পারছে?
শেখ হাসিনা: যারা ভেবেছিলেন বিএনপি জামায়াতের চেয়ে ভালো বিকল্প হবে, তারা ইতিহাস ভুলে গিয়েছিলেন। বিএনপি ও জামায়াত একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বিএনপির হাত ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামীর পুনর্বাসন হয়েছে। দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী হিসেবে তারা একই রাজনৈতিক চেতনার অংশীদার। এদের আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
প্রশ্ন: তাহলে বিএনপি সরকারের বর্তমান ভূমিকা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
শেখ হাসিনা: যদি সত্যিই মানুষ জামায়াতকে ঠেকাতে বিএনপিকে ভোট দিয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন হলো— বিএনপি কেন মৌলবাদী শক্তিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে? কেন মাজারে হামলার ঘটনা ঘটছে? কেন সুফি দরগাহগুলো নিরাপদ নয়? কেন সংখ্যালঘুরা আতঙ্কে রয়েছে? কেন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আহমদিয়া ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে? কেন শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে অসাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর আঘাত আসছে?
প্রশ্ন: বিএনপি সরকারের সঙ্গে ভারত নতুন করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছে। এতে কি আপনার রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হবে?
শেখ হাসিনা: একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারত তাদের কূটনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে, এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ থাকবে। এর সঙ্গে আমার অবস্থান দুর্বল হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। আমার অবস্থান নির্ভর করে বাংলাদেশের জনগণের ওপর। কঠিন সময়ে ভারত সরকার ও জনগণ আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, এজন্য আমি কৃতজ্ঞ। তবে আমার রাজনৈতিক অবস্থান কোনো বিদেশি রাষ্ট্র বা সরকারের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল নয়।
প্রশ্ন: ভারত যদি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের স্বার্থে আপনাকে বিচারের জন্য বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে চায়, সেক্ষেত্রে আপনার অবস্থান কী হবে?
শেখ হাসিনা: আমি সবসময় বাংলাদেশের জনগণের শক্তির ওপর আস্থা রাখি। আমার রাজনীতি দেশের মানুষের জন্য এবং জনগণের সমর্থনই আমার প্রধান ভিত্তি। কোনো রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের ওপর আমার রাজনৈতিক অবস্থান নির্ভর করে না।
প্রশ্ন: তারেক রহমান সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা কতটা সফল হবে বলে মনে করেন?
শেখ হাসিনা: বাংলাদেশ ও ভারতের টেকসই সম্পর্কের ভিত্তি হলো প্রকৃত গণতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যারা এসব মূল্যবোধ রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে, রাজনৈতিক স্বার্থে ভারতবিরোধী অপপ্রচারকে প্রশ্রয় দিচ্ছে এবং অতীতে ভারতের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলার চেষ্টা করেছে, তাদের সঙ্গে ভারতের কোনো ‘নতুন ইনিংস’ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা আমি দেখি না।














