কক্সবাংলা ডটকম(১ জুলাই) :: ভারতের কাছে পঞ্চম প্রজন্মের Su-57E Stealth Fighter যুদ্ধবিমান সরবরাহ এবং যৌথভাবে উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া।
একই সময়ে ভারতের নিজস্ব Advanced Medium Combat Aircraft (AMCA) প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের General Electric (GE)-এর F414 জেট ইঞ্জিন সংগ্রহ নিয়ে জটিলতা দেখা দেওয়ায় নয়াদিল্লির প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার প্রস্তাব ভারতের জন্য একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
ভারতীয় গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, GE-এর সঙ্গে F414 ইঞ্জিন সরবরাহ নিয়ে চলমান আলোচনায় বড় ধরনের অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রাথমিক মূল্য প্রস্তাবের তুলনায় ইঞ্জিনের দাম প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন করে ব্যয় ও প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে হিসাব-নিকাশ করছে।
প্রথম ধাপে AMCA-এর পাঁচটি উড়ন্ত প্রোটোটাইপ তৈরির জন্য প্রয়োজন হবে ১৫টি F414 ইঞ্জিন। ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় পুরো প্রকল্পের সময়সূচি ও বাজেট চাপে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে রাশিয়া ভারতের কাছে শুধু Su-57E যুদ্ধবিমান বিক্রির প্রস্তাবই দেয়নি, বরং যৌথ উৎপাদন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, লাইসেন্সভিত্তিক নির্মাণ এবং স্থানীয় শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধিরও প্রস্তাব দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিষয়ক সাময়িকী Defense Security Asia-এর তথ্যমতে, মস্কো ভারতকে সংবেদনশীল অ্যারোস্পেস প্রযুক্তি ও নির্দিষ্ট সফটওয়্যার সোর্স কোড ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে, যা রাশিয়ার প্রচলিত রপ্তানি নীতির তুলনায় ব্যতিক্রমী বলে বিবেচিত হচ্ছে।
সেন্ট পিটার্সবার্গ ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ফোরাম-২০২৬-এ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন প্রকাশ্যে বলেন, ভারত ও রাশিয়া যৌথভাবে এমন একটি আধুনিক যুদ্ধবিমান প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে পারে, যেখানে উভয় দেশের মধ্যে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও শিল্প অংশীদারিত্বের সুযোগ আরও বিস্তৃত থাকবে।
বর্তমান আলোচনায় জানা গেছে, প্রথম পর্যায়ে ৩৬ থেকে ৬০টি সম্পূর্ণ প্রস্তুত Su-57E যুদ্ধবিমান দ্রুত ভারতীয় বিমানবাহিনীর কাছে সরবরাহের প্রস্তাব রয়েছে।
একই সঙ্গে পরবর্তী ধাপে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত Hindustan Aeronautics Limited (HAL)-এর মাধ্যমে লাইসেন্সপ্রাপ্ত উৎপাদন, মিশন সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন, যন্ত্রাংশের স্থানীয় উৎপাদন (Localization) এবং ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, যদি ভারত সোর্স কোড ও প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পায়, তবে ভবিষ্যতে দেশীয়ভাবে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র, সেন্সর, অ্যাভিওনিক্স ও অন্যান্য অস্ত্র ব্যবস্থা Su-57E-তে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে ভারতের স্বাধীনতা অনেক বাড়বে। ফলে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

অন্যদিকে AMCA প্রকল্পকে ভারতের ভবিষ্যৎ বিমান শক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়।
ডিআরডিও (DRDO) এবং HAL-এর যৌথ উদ্যোগে নির্মিত এই পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ যুদ্ধবিমানটি অভ্যন্তরীণ অস্ত্র বহন ব্যবস্থা, উন্নত স্টিলথ প্রযুক্তি, আধুনিক AESA রাডার, নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা এবং অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ব্যবস্থায় সজ্জিত হওয়ার কথা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী এটি অভ্যন্তরীণভাবে প্রায় ১,৫০০ কেজি এবং বাহ্যিকভাবে প্রায় ৫,৫০০ কেজি পর্যন্ত অস্ত্র বহন করতে সক্ষম হবে।
তবে ইঞ্জিন সংকটের কারণে প্রকল্পটির সময়সূচি ইতোমধ্যেই পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভারতের দেশীয় ইঞ্জিন উন্নয়ন কর্মসূচি এখনও পূর্ণাঙ্গ পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
ফলে আপাতত বিদেশি ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না।
ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইঞ্জিনের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পের বাজেট পুনর্মূল্যায়ন করতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিকল্প উৎস খুঁজে দেখলেও এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো এর ইঞ্জিন। ইঞ্জিন প্রযুক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন না করলে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিরক্ষা শিল্পে প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন কঠিন হবে।
এ কারণে ভারত নিজস্ব ইঞ্জিন উন্নয়নের কাজ আরও জোরদার করার পাশাপাশি রাশিয়া, ফ্রান্সসহ সম্ভাব্য অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গেও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাশিয়ার এই প্রস্তাব কেবল একটি বাণিজ্যিক প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয় নয়; এর গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে।
বর্তমানে চীনের হাতে J-20 এবং J-35—দুটি পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ যুদ্ধবিমান রয়েছে।
এর মধ্যে J-35 ভবিষ্যতে পাকিস্তানের কাছেও সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই বাস্তবতায় ভারতের দ্রুত স্টিলথ সক্ষমতা অর্জনের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে। সে কারণেই Su-57E প্রস্তাবকে অনেক বিশ্লেষক ভারতের জন্য একটি অন্তর্বর্তী সমাধান হিসেবে দেখছেন, যা AMCA পূর্ণাঙ্গভাবে উৎপাদনে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ভারতীয় বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
তবে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, রাশিয়ার প্রস্তাব, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইঞ্জিন আলোচনা এবং ভারতের নিজস্ব AMCA কর্মসূচি—এই তিনটি বিষয় এখন পরস্পরের সঙ্গে কৌশলগতভাবে জড়িয়ে গেছে।
আগামী কয়েক মাসে নয়াদিল্লি কোন পথে এগোবে, তার ওপরই নির্ভর করবে দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ আকাশ প্রতিরক্ষার ভারসাম্যে নতুন কোনো পরিবর্তন আসে কি না।














