বুধবার ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কর্মক্ষম বয়সেই ঝরে যাচ্ছে প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন

🗓 শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬

👁️ ৮৯ বার দেখা হয়েছে

🗓 শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬

👁️ ৮৯ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(৪ জুলাই) :: পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনা, স্বপ্ন পূরণ এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার আশায় প্রতিবছর লাখো বাংলাদেশি তরুণ-তরুণী কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে পাড়ি জমান।

কিন্তু কঠোর কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যঝুঁকি, দুর্ঘটনা, নির্যাতন এবং নানা প্রতিকূলতায় তাদের অনেকের জীবন থেমে যাচ্ছে কর্মক্ষম বয়সেই।

ফলে প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা এবং মৃত্যুর পর দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জোরদারের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

বরিশালের সাইফুল ইসলাম মাত্র ২৭ বছর বয়সে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

একইভাবে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে মাত্র ২৫ বছর বয়সে কাজের উদ্দেশ্যে কুয়েতে যান মো. মিলন। তিন বছর পর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনিও মারা যান প্রবাসেই।

সাইফুল ও মিলনের মতো হাজারো বাংলাদেশি তরুণের জীবন অকালে ঝরে যাচ্ছে বিদেশের মাটিতে। অথচ এদের অধিকাংশই ছিলেন সম্পূর্ণ কর্মক্ষম বয়সের মানুষ।

অভিবাসন গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (আরএমএমআরইউ)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালে মারা যাওয়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের গড় বয়স ছিল মাত্র ৩৮ বছর। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের সর্বোচ্চ কর্মক্ষম সময় ২০ থেকে ৪০ বছর বয়স। ফলে এত অল্প বয়সে প্রবাসী শ্রমিকদের মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক।

গবেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন—বিদেশে কর্মরত সুস্থ-সবল তরুণ শ্রমিকরা কেন এত কম বয়সে মারা যাচ্ছেন এবং কেন অধিকাংশ মৃত্যুর প্রকৃত কারণ স্পষ্টভাবে জানা যাচ্ছে না।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ তাসনীম সিদ্দিকী গণমাধ্যমকে বলেন, প্রবাসী কর্মীদের প্রায় ২৭ শতাংশ মৃত্যুই অস্বাভাবিক। অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতন কিংবা কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর অভিযোগ থাকলেও মৃত্যুসনদে শুধু ‘হার্ট ফেইলিউর’ উল্লেখ করা হয়। তার মতে, মরদেহ দেশে পৌঁছানোর পর যদি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়, তাহলে পুনরায় ময়নাতদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের কাছে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করা প্রয়োজন।

প্রবাসে কোনো শ্রমিক মারা গেলে কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই খবর দেশে পৌঁছে যায়। কিন্তু মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে স্বজনদের দীর্ঘদিন নানা দপ্তরে ছোটাছুটি করতে হয়। অনেক পরিবারকে আর্থিক সংকট, প্রশাসনিক জটিলতা এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার কারণে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

মো. মিলনের মরদেহ দেশে আনতে তার পরিবার কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেও প্রত্যাশিত সহায়তা পায়নি। পরে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, কুয়েতে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসী এবং স্বজনদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ৪৩ দিন পর দেশে ফেরানো সম্ভব হয় তার মরদেহ। একই ধরনের ভোগান্তির শিকার হন বরগুনার রনি মীরের পরিবারও। গত ২৪ এপ্রিল কুয়েতে তার মৃত্যুর পর মরদেহ দেশে ফিরতে সময় লাগে এক মাসেরও বেশি।

তাসনীম সিদ্দিকীর মতে, বিদেশ থেকে মরদেহ দেশে আনার জন্য সরকারি আর্থিক সহায়তা আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বৈধ বা অবৈধ—যে পথেই বিদেশে যাক না কেন, যদি কোনো প্রবাসী দেশের জন্য রেমিট্যান্স পাঠিয়ে থাকেন, তবে তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই গ্রহণ করা উচিত।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ড-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বোর্ডের সহায়তায় দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে ৪ হাজার ৪৩৮ জন প্রবাসীর মরদেহ। এ জন্য প্রায় ৪১২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

শুধু চলতি বছরের এপ্রিল মাসেই কুয়েত, মালয়েশিয়া ও লিবিয়া থেকে ৩৪ জন প্রবাসীর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তাদের প্রত্যেক পরিবারের জন্য ৩৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের সহায়তায় দেশে ফিরিয়ে আনা মরদেহের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ছিল ২০২৫ সালে। ওই বছর ১ হাজার ২৭৮ জন প্রবাসীর মরদেহ দেশে আনা হয় এবং তাদের পরিবারকে দেওয়া হয় ১১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশে ফিরেছে আরও ৪৯৯ জন প্রবাসীর মরদেহ।

অন্যদিকে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছে ৪ হাজার ৮১৩ জন প্রবাসীর মরদেহ, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৫৫২, ২০২২ সালে ৩ হাজার ৯০৪ এবং ২০২১ সালে ৩ হাজার ৮১৮ জন। ১৯৯৩ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট ৫৬ হাজারেরও বেশি প্রবাসীর মরদেহ দেশে ফিরেছে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিদেশে কর্মসংস্থান পান ৬ লাখ ১৭ হাজার ২০৯ জন বাংলাদেশি। ২০২২ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ লাখ ১০ হাজার ৩৪ জনে। ২০২৩ সালে রেকর্ড ১৩ লাখ ৩ হাজার ৪৫৩ জন বিদেশে কর্মসংস্থান লাভ করেন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা কিছুটা কমে ১০ লাখ ১১ হাজার ৯৬৯ জনে নেমে এলেও, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিদেশে কর্মসংস্থান হয়েছে ১১ লাখ ৩২ হাজার ৫১৯ জনের, যার মধ্যে ৬২ হাজার ৩৫২ জন নারী।

অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদানও ক্রমাগত বাড়ছে। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১৩ হাজার ৭৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৪ সালে এসেছে ২৬ হাজার ৮৯০ মিলিয়ন ডলার, ২০২৩ সালে ২১ হাজার ৯৪২ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২২ সালে ২১ হাজার ২৮৫ মিলিয়ন ডলার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি এই প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মপরিবেশ এবং মৃত্যুর পর মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আরও কার্যকর নীতি গ্রহণ করা সময়ের দাবি।

এদিকে চলতি বছরের জুন মাসে সংসদে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান প্রবাসীদের অধিকার সুরক্ষা এবং তাদের নানাবিধ সমস্যা সমাধানে একটি কার্যকর ও দায়িত্বশীল টাস্কফোর্স গঠনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “কোনো রেমিট্যান্স যোদ্ধা মারা গেলে তার মরদেহ সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় খরচে দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে এবং তার পরিবারকে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।”

প্রবাসী শ্রমিকদের রক্ত-ঘামে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। তাই জীবিত অবস্থায় তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মৃত্যুর পর সম্মানজনকভাবে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই বিভাগ এর আরো খবর

উখিয়ায় ১ লাখ ৪০ হাজার ইয়াবাসহ দুইজন আটক

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কুতুবদিয়ায় পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঈদগাঁওতে দুই ট্রাকের সংঘর্ষে হেলপার নিহত

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর