কক্সবাংলা ডটকম(১৬ জুলাই) :: আটলান্টার রাত যেন লিখে রাখল আর একটি বিশ্বকাপ ক্লাসিক।
দীর্ঘ সময় পিছিয়ে থেকেও শেষ মুহূর্তের দুরন্ত প্রত্যাবর্তনে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে গেল আর্জেন্তিনা।
৮৫ মিনিট পর্যন্ত যে দল হারতে বসেছিল, তারাই শেষ বাঁশি বাজার সময় উদযাপনে মেতে উঠল।
আর সেই নাটকের কেন্দ্রে ছিলেন লিওনেল মেসি, এনজ়ো ফার্নান্দেজ় এবং লাউতারো মার্তিনেজ়।
সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ইতিহাসে সপ্তমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল লিওনেল মেসির আর্জেন্তিনা।
এর ফলে ফাইনালে ওঠার সংখ্যায় তারা ইতালিকে পিছনে ফেলে ব্রাজ়িলের রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলল। এখন তাদের সামনে রয়েছে শুধু জার্মানি।
সেই সঙ্গে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপের ফাইনালেও উঠল আর্জেন্তিনা। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর এ বারও শিরোপা ধরে রাখার সুযোগ রয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের সামনে।
আগামী ১৯ জুলাই, রবিবার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হবে আর্জেন্তিনা। সেই ম্যাচেই নির্ধারিত হবে ২০২৬ বিশ্বকাপের নতুন চ্যাম্পিয়ন।
ইংল্যান্ডের চাপ, বিশ্বকাপে বিরল রেকর্ড
শুরু থেকেই ম্যাচে ছিল টানটান উত্তেজনা। বলের দখল এবং আক্রমণের ক্ষেত্রে কিছুটা এগিয়ে ছিল ইংল্যান্ড। দ্রুত গতির আক্রমণে বারবার আর্জেন্তিনার রক্ষণকে ব্যস্ত রাখছিল তারা। অন্যদিকে, আর্জেন্তিনা ধৈর্য ধরে পাস খেলেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে আনার চেষ্টা করছিল। ফলে মাঠে জমে ওঠে কৌশল বনাম গতির এক আকর্ষণীয় লড়াই।
এই সতর্ক লড়াইয়ের মাঝেই গড়ে ওঠে বিশ্বকাপের ইতিহাসে বিরল এক রেকর্ড। ১৯৬৬ সাল থেকে পরিসংখ্যান রাখা শুরু হওয়ার পর এই প্রথম কোনও বিশ্বকাপ ম্যাচের প্রথম ৩০ মিনিটে গোলে বা গোলমুখে একটি শটও দেখা গেল না। দুই দলের নিখুঁত রক্ষণ, শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থান এবং ভুল এড়িয়ে খেলার মানসিকতাই এই অদ্ভুত পরিসংখ্যানের জন্ম দেয়।
প্রথমার্ধে গোল না হলেও উত্তেজনার কোনও অভাব ছিল না। মাঝমাঠে দখলের লড়াই, কঠোর ট্যাকেল, শরীরী সংঘর্ষ এবং প্রতি মুহূর্তে বাড়তে থাকা চাপ ম্যাচটিকে করে তুলেছিল রুদ্ধশ্বাস। তবে দুই দলের রক্ষণভাগ এতটাই দৃঢ় ছিল যে, বিরতির আগে গোলের তালা ভাঙতে পারেনি কেউই। ফলে প্রথম ৪৫ মিনিট শেষ হয় গোলশূন্য সমতায়।
গর্ডনের গোলে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড, পিকফোর্ডের দুর্দান্ত সেভ
দ্বিতীয়ার্ধে অপেক্ষার অবসান হয় ৫৫ মিনিটে। ডেক্লান রাইসের পাস থেকে ডান প্রান্তে বল পান মরগ্যান রজার্স। তাঁর নিখুঁত ক্রসে নাহুয়েল মোলিনার পিছন দিয়ে দৌড়ে এসে অ্যান্থনি গর্ডন নিয়ন্ত্রিত শটে এমিলিয়ানো মার্তিনেজ়কে পরাস্ত করেন। ইংল্যান্ড বেঞ্চে তখন উচ্ছ্বাসের বিস্ফোরণ। তবে গোল খাওয়ার পর আক্রমণের গতি বাড়ায় আর্জেন্তিনা। সমতা ফেরানোর সবচেয়ে বড় সুযোগ আসে নিকোলাস গঞ্জালেসের সামনে। লিওনেল মেসির নিখুঁত ক্রস থেকে তাঁর ওয়ান টাচে শট প্রায় জালেই ঢুকে যাচ্ছিল। কিন্তু জর্ডান পিকফোর্ড অসাধারণ ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে ইংল্যান্ডকে রক্ষা করেন। সেমিফাইনালের মঞ্চে এটি নিঃসন্দেহে ম্যাচ বাঁচানো একটি সেভ ছিল।
মেসির জাদু, এনজ়োর সমতা
সময়ের কাঁটা যত এগোচ্ছিল, ততই বাড়ছিল আর্জেন্তিনার চাপ। আক্রমণে গতি আনতে ৮২ মিনিটে লাউতারো মার্তিনেজ়কে নামান লিওনেল স্কালোনি। আর লাউতারো নামার পরই বদলে যায় ম্যাচের রং। ৮৫ মিনিটে আসে সেই বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। কর্নার থেকে সরাসরি বল না তুলে ছোট পাসে আক্রমণ সাজায় আর্জেন্তিনা। এর পর মেসি নিজের চেনা জাদু দেখান। ডান দিকে বল পেয়ে এক মুহূর্তে ইংল্যান্ডের রক্ষণকে বিভ্রান্ত করে ফাঁকা জায়গায় থাকা এনজ়ো ফার্নান্দেজ়কে বল বাড়িয়ে দেন। প্রায় ২০ গজ দূর থেকে এনজ়োর দুর্দান্ত শটে কোনও সুযোগই পাননি পিকফোর্ড। বল জালে জড়াতেই গর্জে ওঠে আর্জেন্তিনা শিবির। ম্যাচ ফেরে সমতা। অক্সিজেন পায় আর্জেন্তিনা
অতিরিক্ত সময়ে লাউতারোর গোল, ইংল্যান্ডের স্বপ্নভঙ্গ
সমতা ফেরানোর পর আর থামেনি আর্জেন্তিনা। ইংল্যান্ডের রক্ষণ তখন স্পষ্ট চাপে। এর মধ্যেই ঘাড়ে চোট পেয়ে কিছুটা সময় মাঠে বসে পড়েন জন স্টোন্স। পরে অবশ্য তিনি খেলা চালিয়ে যান। চতুর্থ রেফারি অতিরিক্ত নয় মিনিট সময় দেখাতেই নাটকের জন্য মঞ্চ পুরো প্রস্তুত হয়ে যায়। অতিরিক্ত সময়ে আবারও আক্রমণের সূচনা করেন মেসি। তাঁর পাস থেকে তৈরি হয় আর্জেন্তিনার আরও একটি বিপজ্জনক আক্রমণ। ডান দিক থেকে ভেসে আসা ক্রসে সবার আগে পৌঁছে যান লাউতারো মার্তিনেজ়। কাছ থেকে শক্তিশালী হেডে বল জালে জড়িয়ে দেন তিনি।
এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে যায় ইংল্যান্ড। যে দল দ্বিতীয়ার্ধের বেশির ভাগ সময় এগিয়ে ছিল, তারাই শেষ দিকে দুই গোল হজম করে হার মেনে নেয়।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে উল্লাসে ফেটে পড়ে আর্জেন্তিনা। ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে টানা দ্বিতীয়বার এবং ইতিহাসে সপ্তমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিলেন মেসিরা। আর ইংল্যান্ডের জন্য অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হলো, ফাইনালের স্বপ্ন আবারও ভেঙে গেল শেষ মুহূর্তের হৃদয়ভাঙা নাটকে।
ইংল্যান্ডের একাদশ
জর্ডান পিকফোর্ড, রিস জেমস, জন স্টোন্স, মার্ক গুয়েহি, জেড স্পেন্স, ডেক্লান রাইস, ইলিয়ট অ্যান্ডারসন, জুড বেলিংহ্যাম, মরগ্যান রজার্স, হ্যারি কেন, অ্যান্থনি গর্ডন।
আর্জেন্তিনার একাদশ
এমিলিয়ানো মার্তিনেজ়, নাহুয়েল মোলিনা, ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্তিনেজ়, নিকোলাস তাগলিয়াফিকো, গিউলিয়ানো সিমিওনে, লিয়ান্দ্রো পারেদেস, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, এনজ়ো ফার্নান্দেজ়, লিওনেল মেসি, জুলিয়ান আলভারেজ়।















