শনিবার ১৮ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশে মব সহিংসতা, রাজনৈতিক সংঘাত ও নারী নির্যাতন বেড়েছ : ৬ মাসে নিহত ১৩৩

🗓 বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

👁️ ৩০ বার দেখা হয়েছে

🗓 বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

👁️ ৩০ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(১৫ জুলাই) :: চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

একইসঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতা, নারী ও শিশু নির্যাতন, সাংবাদিক নিপীড়ন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা এবং সীমান্তে হতাহতের ঘটনাও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।

বুধবার (১৫ জুলাই) প্রকাশিত সংস্থাটির ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

দেশের ১৬টি জাতীয় দৈনিক, বিভিন্ন অনলাইন গণমাধ্যম, সংস্থাটির নিজস্ব তথ্যসংগ্রহ ও ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ মূল্যায়ন করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরের প্রথম ছয় মাসে সারা দেশে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ২৬১টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৩৩ জন এবং আহত হয়েছেন ২৫৬ জন।

গত বছরের একই সময়ে এমন ঘটনার সংখ্যা ছিল ১৪১টি, যেখানে নিহত হয়েছিলেন ৬৭ জন এবং আহত হন ১১৯ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মব সহিংসতার ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

এইচআরএসএস জানায়, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তার, ব্যক্তিগত বিরোধ, ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ এবং গুজব ছড়িয়ে পড়ার মতো নানা কারণে এসব সহিংসতা সংঘটিত হয়েছে। সংস্থাটি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বন্ধে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্রও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ছয় মাসে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা এবং দলীয় কোন্দলের ঘটনায় অন্তত ৫৬ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক সংঘর্ষে ৫ হাজার ২৪৬ জনের বেশি নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত কিংবা হামলার শিকার হয়েছেন।

নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৩৭ জন, জামায়াতে ইসলামীর ৬ জন এবং আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ৩ জন রয়েছেন।

এছাড়া রাজনৈতিক সহিংসতার ৮৩০টি ঘটনার মধ্যে ৬৭৩টিই বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল অথবা বিএনপির সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে ঘটেছে, যা মোট ঘটনার প্রায় ৮১ শতাংশ।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সহিংসতার চিত্রও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এতে বলা হয়েছে, নির্বাচনকেন্দ্রিক ৩৯৬টি সহিংস ঘটনায় ১৩ জন নিহত এবং ২ হাজার ৫৭৮ জন আহত হয়েছেন। নির্বাচনপূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ৬০০টিরও বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

রাজনৈতিক মামলা ও গ্রেপ্তারের তথ্য তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) এবং বিএনপি-জামায়াত সংশ্লিষ্ট সহিংসতা ও বিভিন্ন সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় অন্তত ১৪৪টি মামলা দায়ের হয়েছে।

এসব মামলায় ৩ হাজার ২৬৮ জনকে নামীয় আসামি এবং ২৪ হাজার ৫১৮ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ১ হাজার ৬২১ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫৬ শতাংশ বেশি।

নির্যাতনের শিকারদের মধ্যে ৪০৪ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে ২৩৮ জনই ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী।

এছাড়া ৮৮ জন নারী ও কন্যাশিশু সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৭ জনকে।

যৌতুকজনিত নির্যাতনে ১৯ জন নিহত, ৮ জন আহত এবং ৩ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন। পারিবারিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৩২০ জন, আহত ২১১ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ১৪৭ জন নারী।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এইচআরএসএস। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে ৪০টি সভা-সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বাধার ঘটনা ঘটেছে।

এসব ঘটনায় ৩১১ জন আহত এবং ৩৮ জন আটক হয়েছেন। আটক ও আহতদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক এবং সাধারণ নাগরিকও ছিলেন।

এ সময় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর আওতায় ৩০টি পৃথক মামলায় ৮১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪৪ জনকে।

সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানির ঘটনাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ছয় মাসে ২০০টি ঘটনায় ৩৮৩ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে আহত হয়েছেন ২৩৪ জন, লাঞ্ছিত হয়েছেন ৬০ জন, হুমকি পেয়েছেন ৪৯ জন এবং আটক হয়েছেন ১১ জন সাংবাদিক।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, ছয় মাসে সংখ্যালঘুদের ওপর ৫০টি হামলার ঘটনায় ৫৬ জন আহত হয়েছেন।

একই সময়ে ১৯টি মন্দির, ১৫টি প্রতিমা এবং ৪৩টি বসতবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে।

সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৩২টি ঘটনায় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর হামলায় ৯ জন নিহত এবং ৩৫ জন আহত হয়েছেন।

আহতদের মধ্যে ১৪ জন গুলিবিদ্ধ। অন্যদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ২০টি সহিংস ঘটনায় একজন নিহত, পাঁচজন আহত এবং পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে মৃত্যুর বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজত, নির্যাতন, গুলিবর্ষণ ও কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’-সংক্রান্ত ঘটনায় ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

একই সময়ে দেশের বিভিন্ন কারাগারে কমপক্ষে ৫৮ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৫ জন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের, একজন বিএনপির এবং ৪২ জন সাধারণ কয়েদি।

প্রতিবেদনের সার্বিক মূল্যায়নে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা, মব জাস্টিস, কারাগার ও হেফাজতে মৃত্যু, নারী ও শিশু নির্যাতন, সাংবাদিক নিপীড়ন, শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা—এসব প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।

তিনি মানবাধিকার সুরক্ষায় কার্যকর আইন প্রয়োগ, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর