মঙ্গলবার ৬ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব জ্বালানি খাতে : বিপিসির ভর্তুকি ১৯ হাজার কোটি টাকা

🗓 মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

👁️ ৭০ বার দেখা হয়েছে

🗓 মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

👁️ ৭০ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(২১ জুলাই) :: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের জ্বালানি খাত নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) কয়েক মাস ধরেই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে চলতি অর্থবছরে জ্বালানি তেল আমদানিজনিত লোকসান সমন্বয়ের জন্য সরকারের কাছে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি।

বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুনের ২৩ তারিখ পর্যন্ত চার মাসে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি।

এ ক্ষতি পূরণে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কাছে পাঁচ দফায় চিঠি পাঠিয়ে ভর্তুকি চাওয়া হয়েছে। সর্বশেষ চিঠিতে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে বিষয়টি নিয়ে সরকার, বিপিসি এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মধ্যেও আলোচনা হয়েছে। আইএমএফ বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের আর্থিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার যদি বিপিসির ক্ষতি পুষিয়ে দিতে প্রয়োজনীয় ভর্তুকি দিতে না পারে, তাহলে দেশের বাজারে আবারও জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে পারে।

আর জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পেলে পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ ও নিত্যপণ্যের বাজারে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।

বিশ্ববাজারে আবারও ঊর্ধ্বমুখী তেলের দাম

যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও বাড়তে শুরু করেছে।

সর্বশেষ হিসাবে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার অতিক্রম করেছে। সেপ্টেম্বরে সরবরাহযোগ্য তেলের মূল্য চুক্তি অনুযায়ী ২ দশমিক ০৯ ডলার বা ২ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেড়ে ৯০ দশমিক ১৯ ডলারে পৌঁছেছে।

এর আগে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে উঠেছিল, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম সর্বোচ্চ মূল্য। সে সময় বিশ্বব্যাপী তেল আমদানিকারক দেশগুলো সরবরাহ সংকট ও অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে ব্যাপক চাপে পড়ে।

ডিজেল আমদানিতে সবচেয়ে বেশি চাপ

বাংলাদেশে আমদানি করা মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ৭০ শতাংশই ডিজেল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি পেলেই বিপিসির আর্থিক চাপ বহুগুণে বেড়ে যায়। যদিও অকটেন ও পেট্রোল বিক্রিতে কিছুটা লাভ হয়, তবে তা ডিজেল বিক্রির লোকসান পূরণে যথেষ্ট নয়।

বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, যুদ্ধ শুরুর আগেই প্রতি লিটার ডিজেলে ৩০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছিল। সে সময় সরকার থেকে কোনো ভর্তুকি দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম আরও বাড়ায় ক্ষতির পরিমাণ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়।

বর্তমানে দেশে প্রায় দুই মাসের জ্বালানি মজুদ রয়েছে বলে জানিয়েছে বিপিসি। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি বিভাগ আমদানির পরিমাণ বাড়িয়ে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে।

ভর্তুকির জন্য একাধিকবার চিঠি

বিপিসির চতুর্থ দফার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানি বিভাগ অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির প্রস্তাব পাঠায়। এতে মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে বিপিসির ক্ষতির হিসাব তুলে ধরা হয়।

পরবর্তীতে জুন মাস পর্যন্ত ক্ষতির হিসাব যুক্ত করে নতুন করে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির দাবি জানানো হয়। সর্বশেষ ২ জুলাই জ্বালানি বিভাগ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে তিন মাসের ক্ষতি বিবেচনায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। পঞ্চম দফার আবেদনটিও বিপিসি বোর্ডের সুপারিশসহ জ্বালানি বিভাগে জমা দেওয়া হয়েছে।

উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যবহার করে সরবরাহ স্বাভাবিক

সূত্র জানায়, জ্বালানি সরবরাহে কোনো ধরনের সংকট এড়াতে বিপিসি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ থেকেও অর্থ ব্যবহার করেছে।

ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-২, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম জেট ফুয়েল পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্পের জন্য সংরক্ষিত প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার একটি অংশ সাময়িকভাবে ব্যবহার করে জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রাখা হয়েছে।

তেলের দাম বাড়লে বাড়বে মূল্যস্ফীতিও

বিপিসির পরিচালক (অর্থ) ও যুগ্মসচিব নাজনীন পারভীন বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণের চূড়ান্ত ক্ষমতা জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের হাতে।

বিপিসি কেবল আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় সুপারিশ পাঠায়। তিনি বলেন, বর্তমানে বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য স্বাভাবিক পর্যায়ে নেই এবং এ অবস্থায় সরকার ভর্তুকি দিলেও অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ম. তামিম বলেন, ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি পেলে পরিবহন খাতের ব্যয় বেড়ে যায় এবং তার প্রভাব সব ধরনের পণ্যের বাজারে পড়ে।

ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের একটি কার্যকর ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া না থাকায় বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও চাপ

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জ্বালানি আমদানিতে প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছে।

রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক কর্মশালায় তিনি বলেন, বৈশ্বিক সংঘাত ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সংকট দ্রুত নিরসন না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য আরও বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে একদিকে বিপুল ভর্তুকির চাপ, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার সংকট—এই তিনটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হতে পারে।

এই বিভাগ এর আরো খবর

দুর্গাপূজা ঘিরে সতর্ক বিএনপি

মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর