বুধবার ২২ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খাদ্য নিরাপত্তায় নতুন মাইলফলক বাংলাদেশের

🗓 মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

👁️ ১৩ বার দেখা হয়েছে

🗓 মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

👁️ ১৩ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(২১ জুলাই) :: খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে বাংলাদেশ। সরকারি খাদ্যগুদাম ও সাইলোতে ধান, চাল ও গম মিলিয়ে মোট খাদ্যশস্যের মজুদ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ লাখ ৫০ হাজার টনে, যা দেশের ইতিহাসে সরকারি পর্যায়ে সর্বোচ্চ খাদ্য মজুদের রেকর্ড। এর মধ্যে প্রায় ২০ লাখ ৫০ হাজার টনই চাল এবং বাকি অংশ গম। খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের কৃষি উৎপাদন, সংগ্রহ কার্যক্রম এবং সংরক্ষণ অবকাঠামোর উন্নয়নের সমন্বিত ফল হিসেবেই এই রেকর্ড অর্জিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে খাদ্যশস্য উৎপাদন বৃদ্ধি, আমন ও বোরো মৌসুমে বাম্পার ফলন, কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ধান সংগ্রহ এবং সরকারি গুদামের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে এই নজিরবিহীন মজুদ সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত পরিসরে খাদ্যশস্য আমদানিও মজুদ বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।

খাদ্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, সরকারি গুদামে সাড়ে ১৩ লাখ টন খাদ্যশস্য থাকলেই সেটিকে ‘নিরাপদ মজুদ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাধারণত এর মধ্যে ১০ লাখ টন চাল এবং সাড়ে ৩ লাখ টন গম অন্তর্ভুক্ত থাকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দেশের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে এই মজুদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে নিরাপদ মজুদের তুলনায় প্রায় ১০ লাখ টন বেশি খাদ্যশস্য সরকারি গুদামে সংরক্ষিত রয়েছে, যা সরকারের খাদ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে।

খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (সংগ্রহ) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, বর্তমান মজুদ খাদ্য বিভাগের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তিনি জানান, গত মৌসুমে আমন সংগ্রহ অভিযান থেকে প্রায় ১২ লাখ টন খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশ থেকে প্রায় ৫ লাখ টন গম আমদানি করা হয়েছে। বর্তমানে চলমান বোরো সংগ্রহ অভিযানে ১৮ লাখ টন সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ইতোমধ্যে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ টন খাদ্যশস্য সরকারি গুদামে জমা পড়েছে। ধানের সংগ্রহ মূল্য কৃষকবান্ধব ও যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ, অনুকূল আবহাওয়ায় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পরিকল্পিত সংগ্রহ ব্যবস্থাপনাই এই সাফল্যের মূল কারণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, গত আমন সংগ্রহ অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ন্যায্যমূল্যে ধান ক্রয় করা। পাশাপাশি মিলার ও চালকল মালিকদের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক চাল সংগ্রহের উদ্যোগও সফল হয়েছে। ফলে একদিকে কৃষকরা লাভবান হয়েছেন, অন্যদিকে সরকারি মজুদও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে সরকারি গুদামে রেকর্ড পরিমাণ খাদ্যশস্য মজুদ থাকলেও খুচরা বাজারে চালের দাম এখনো সাধারণ ভোক্তাদের নাগালের মধ্যে আসেনি। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি মজুদের বড় অংশ সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচি, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং জরুরি পরিস্থিতির জন্য সংরক্ষিত থাকায় তা সরাসরি বাজারে প্রভাব ফেলতে পারছে না। ফলে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে এখনো বেসরকারি মিলার, ব্যবসায়ী ও করপোরেট গ্রুপগুলোর ভূমিকা বেশি।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত জুন মাসে দেশের বাজারে চালের দাম কেজিপ্রতি গড়ে ২ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। মোটা চালের দাম ৪৮-৫২ টাকা থেকে বেড়ে ৫০-৫৪ টাকায় পৌঁছেছে। মাঝারি মানের চাল ৫২-৬৪ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছে এবং সরু চালের দাম বেড়ে কেজিপ্রতি ৬৫ থেকে ৭৮ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ফলে উৎপাদন ও মজুদ বাড়লেও বাজারে মূল্য স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

চট্টগ্রামের পাহাড়তলী চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন বলেন, দেশে উৎপাদন ভালো হয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য আমদানির প্রয়োজনও পড়ছে না। তারপরও চালের দাম বাড়ছে, যা অস্বাভাবিক। তিনি বাজারে আরও কার্যকর তদারকি ও নজরদারির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গত এক দশকে খাদ্য সংরক্ষণ অবকাঠামো সম্প্রসারণে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে সরকার। আধুনিক স্টিল সাইলো, নতুন লোকাল সাপ্লাই ডিপো (এলএসডি) এবং উন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থার ফলে বর্তমানে দেশের সরকারি খাদ্যশস্য ধারণক্ষমতা প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে এই ধারণক্ষমতা ৩৭ লাখ টনে উন্নীত করা হবে।

খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমান মজুদ স্ট্যান্ডার্ড ধারণক্ষমতার কিছুটা বেশি হলেও অতিরিক্ত খোপ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে নিরাপদভাবে খাদ্যশস্য রাখা হচ্ছে। এর আগে ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ ২২ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুদের রেকর্ড ছিল। চলতি বছরের রেকর্ড মজুদ সেই সীমা অতিক্রম করেছে।

সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতিতেও সরকারি খাদ্যশস্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা কার্যকর ছিল বলে জানিয়েছে খাদ্য বিভাগ। দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি নিচু এলাকায় অবস্থিত খাদ্যগুদাম চত্বরে পানি প্রবেশ করলেও মূল গুদামগুলো সুরক্ষিত ছিল। আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে কোথাও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাদ্যশস্য নষ্ট হয়নি। চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক জি এম ফারুক হোসেন পাটোয়ারী বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় খাদ্য অধিদপ্তরের প্রস্তুতি থাকায় সরকারি মজুদ নিরাপদ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান খাদ্য মজুদ শুধু খাদ্য নিরাপত্তাই নিশ্চিত করছে না, বরং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পর্যাপ্ত মজুদ থাকায় সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে খাদ্যশস্য আমদানি করতে হচ্ছে না। একই সঙ্গে ওএমএস, ভিজিডি, ভিজিএফ, কাবিখাসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচি আরও বিস্তৃতভাবে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) কর্মসূচির জন্য ১ লাখ ৩৫ হাজার টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ভবিষ্যতে এই খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও বর্তমান রেকর্ড মজুদ থেকে তা নির্বিঘ্নে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। ফলে দুর্যোগ মোকাবিলা, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য সহায়তা এবং বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারের সক্ষমতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর