কক্সবাংলা ডটকম(৩ আগস্ট) :: দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে ঢাকার জাতীয় শহীদ মিনারে সমবেত হয়েছিল লাখো মানুষ। সেই সমাবেশে তৎকালীন অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেন।
দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের ব্যাপক সাড়া ও লাগাতার আন্দোলনের মুখে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে, ৫ আগস্ট, ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ত্যাগ করেন দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এই গণ-অভ্যুত্থান শুধু একটি সরকারের পতন নয়; বরং তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন দেখার মুহূর্ত ছিল।
বৈষম্যহীন সমাজ, আইনের শাসন, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন ও সুশাসনের প্রত্যাশা নিয়ে লাখো মানুষ রাজপথে নেমেছিল। কিন্তু অভ্যুত্থানের দুই বছর পর প্রশ্ন উঠছে—সরকার পরিবর্তনের পাশাপাশি রাষ্ট্র কি সত্যিই বদলাতে পেরেছে?
তরুণদের আন্দোলন: পরিবর্তনের সূচনা, নাকি অসমাপ্ত যাত্রা?
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে তরুণদের নেতৃত্বে সংঘটিত অনেক গণ-আন্দোলন সরকার পরিবর্তনে সফল হলেও রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থানও সেই বাস্তবতা থেকে পুরোপুরি আলাদা নয়।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এরিকা চেনোওয়েথের গবেষণা বলছে, ১৯৬০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বিশ্বে অহিংস গণআন্দোলনের সাফল্যের হার ছিল ৪০ শতাংশেরও বেশি। কিন্তু ২০১০ সালের পর সেই হার নেমে এসেছে ৩৪ শতাংশের নিচে।
তাঁর মতে, বর্তমানের অধিকাংশ আন্দোলন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর এবং নেতৃত্বহীন (Leaderless) হওয়ায় সেগুলো দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে না।
১৯৮০-এর দশকে পোল্যান্ডের ‘সলিডারিটি’ আন্দোলন বা দক্ষিণ কোরিয়ার গণতন্ত্র আন্দোলন দীর্ঘ সময় ধরে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠিত হয়েছিল। কিন্তু আধুনিক যুগের অনেক আন্দোলনে সেই প্রাতিষ্ঠানিক গভীরতার ঘাটতি স্পষ্ট।
আবু সাঈদের মৃত্যু থেকে গণ-অভ্যুত্থান
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই ভিডিও দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত সরকারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
শিক্ষার্থীদের পাশে শিক্ষক, অভিভাবক, শ্রমজীবী মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ দাঁড়িয়ে পড়েন। আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন জেনারেশন জেড বা জেন-জি তরুণরা।
রাষ্ট্র সংস্কারের পথে বাধা
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। সরকারে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণ প্রতিনিধিদেরও অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধার, অর্থনীতি স্থিতিশীল করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের মতো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় নতুন প্রশাসন।
রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত ঐকমত্য কমিশন শেষ পর্যন্ত একটি সর্বজনগ্রাহ্য সংস্কার কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও প্রশাসনিক অদক্ষতা দূর করাও সম্ভব হয়নি বলে সমালোচনা রয়েছে।
ফ্রান্সভিত্তিক জিওপলিটিকস স্ট্র্যাটেজি ল্যাবের প্রধান ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন মনে করেন, তরুণদের সততা ও ত্যাগে ঘাটতি না থাকলেও অভিজ্ঞতার অভাব তাদের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তার ভাষায়, আন্দোলনের পর সঠিক মেন্টর নির্বাচন এবং অভিজ্ঞ নেতৃত্বের পরামর্শ গ্রহণে ব্যর্থতার সুযোগ নিয়েছে বিভিন্ন সুবিধাবাদী গোষ্ঠী, যারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে তরুণদের আবেগকে ব্যবহার করেছে।
রাজনৈতিক ঐকমত্যের সংকট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তানজীমউদ্দিন খান মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোতে ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক কাঠামো এতটাই শক্তিশালী যে শুধু সরকার পরিবর্তন করলেই রাষ্ট্র বদলে যায় না।
তার মতে, তরুণদের নেতৃত্বে হওয়া অভ্যুত্থানের অন্যতম সীমাবদ্ধতা হলো—এ ধরনের আন্দোলনের পেছনে সাধারণত সুসংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি থাকে না। ফলে আন্দোলনের শক্তিকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংস্কারে রূপ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
একই ধরনের মত দিয়েছেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান ভূঞা। তিনি বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভেদ তৈরি হওয়ায় রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
পরিবর্তনের দাবি ও পাল্টা যুক্তি
অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের বড় অংশ পরবর্তীতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠন করে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়। দলটির নেতারা মনে করেন, কাঙ্ক্ষিত সব সংস্কার বাস্তবায়িত না হলেও পরিবর্তনের যাত্রা শুরু হয়েছে।
এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দীন মোহাম্মদের দাবি, জনগণ ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে, মানবাধিকার ও জবাবদিহিতার প্রশ্নে নতুন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে বাংলাদেশ যুক্ত হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
তবে তিনি স্বীকার করেন, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধিতার কারণে সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে এখনও বড় বাধা রয়ে গেছে।
অন্যদিকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও ডাকসুর জিএস এসএম ফরহাদ মনে করেন, গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম লক্ষ্য ছিল এমন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি বা দল ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারে। কিন্তু বিচার বিভাগ, দুদক, পিএসসি ও ব্যাংকিং খাতসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব কমেনি।
ছাত্রদলের দৃষ্টিভঙ্গি
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরের মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশে এখন একটি নির্বাচিত সরকার ও কার্যকর সংসদ রয়েছে। যদিও জুলাই সনদের সব লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়নি, তবে ধাপে ধাপে সেই সংস্কারও বাস্তবায়িত হবে বলে তিনি আশাবাদী।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কী বলে?
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা একেবারে ব্যতিক্রম নয়। ২০১১ সালের আরব বসন্তের আন্দোলনগুলোও ব্যাপক জনসমর্থন ও তরুণদের নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশ দেশেই সেগুলো স্থায়ী গণতান্ত্রিক রূপান্তর আনতে পারেনি। এমনকি আরব বসন্তের সবচেয়ে সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত তিউনিসিয়াও পরবর্তীতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কর্তৃত্ববাদের দিকে ফিরে যায়।
তবে থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা ভিন্ন। থাইল্যান্ডে আন্দোলনকারী তরুণরা পরবর্তীতে রাজনৈতিক দল গঠন করে নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছে। একইভাবে শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালের গণআন্দোলনের ধারাবাহিকতায় নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ক্ষমতায় এসে বিভিন্ন সংস্কার বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
অপূর্ণ স্বপ্ন, নাকি দীর্ঘ পথচলার শুরু?
জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ মনে করেন, জুলাই অভ্যুত্থানের প্রধান লক্ষ্য ছিল স্বৈরাচারী শাসনের অবসান; রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক প্রস্তুতি তখন ছিল না। ফলে সরকার পরিবর্তন সম্ভব হলেও রাষ্ট্র পরিবর্তনের কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
তার মতে, প্রকৃত সংস্কার আনতে হলে দেশের সর্বস্তরে শক্তিশালী সংগঠন, জনসম্পৃক্ততা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রয়োজন। কেবল সরকার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক রূপান্তর নিশ্চিত করতে পারলেই জুলাই অভ্যুত্থানের স্বপ্ন পূর্ণতা পাবে।
দুই বছর পর তাই প্রশ্নটি এখনও প্রাসঙ্গিক—জুলাই অভ্যুত্থান কি কেবল একটি সরকারের পতনের ইতিহাস, নাকি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দীর্ঘ যাত্রার প্রথম অধ্যায়?














