কক্সবাংলা ডটকম(১৪ আগস্ট) :: বাংলাদেশিসহ বিদেশি নাগরিকদের জন্য অভিবাসন ও আশ্রয় নীতিতে ক্রমেই কঠোর হচ্ছে কানাডা-ইউরোপ সহ পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ।
অবৈধভাবে অবস্থান, ভুয়া তথ্য-প্রমাণ দিয়ে আশ্রয় আবেদন এবং প্রত্যাখ্যাত আবেদনকারীদের দ্রুত ফেরত পাঠাতে জোরালো পদক্ষেপ নিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো।
এর ফলে কানাডা ও ইউরোপে থাকা বা নতুন করে আশ্রয়প্রত্যাশী হাজারো বাংলাদেশিও বাড়তি ঝুঁকির মুখে পড়েছেন।
কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির (CBSA) তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জুন পর্যন্ত কানাডা থেকে অবিলম্বে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় থাকা বিদেশি নাগরিকদের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষ ১০-এর মধ্যে।
ওই তালিকায় ৯৬৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন। তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান দশম।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০ সালে কানাডা থেকে ৩০৮ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল।
করোনাসহ নানা কারণে পরবর্তী সময়ে এই সংখ্যা ওঠানামা করলেও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ২২৭ জন বাংলাদেশিকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
অর্থাৎ কানাডা থেকে প্রত্যাখ্যাত বা ফেরত পাঠানোর উপযোগী বাংলাদেশি নাগরিকদের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তবে শুধু বাংলাদেশ নয়, কানাডার ফেরত পাঠানোর তালিকায় রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিপুলসংখ্যক নাগরিক।
বর্তমানে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় থাকা প্রায় ৪০ হাজার ৮২৭ জন বিদেশি নাগরিকের মধ্যে প্রায় ৩৬ হাজার ৬২২ জন রাজনৈতিক আশ্রয় বা শরণার্থী মর্যাদার আবেদনকারী।
দেশভিত্তিক তালিকায় ভারতের নাগরিক সবচেয়ে বেশি। এরপর রয়েছে মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, নাইজেরিয়া ও পাকিস্তানের নাগরিকরা।
প্রশ্ন হচ্ছে, কানাডা কেন আশ্রয়প্রার্থীদের বিষয়ে এত কঠোর হচ্ছে?
বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো আশ্রয় ব্যবস্থার ওপর বাড়তে থাকা চাপ এবং ভুয়া বা দুর্বল দাবির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান।
কানাডা দীর্ঘদিন ধরে মানবিক কারণে শরণার্থী গ্রহণ করে এলেও এখন আবেদনকারীদের পরিচয়, দাবির সত্যতা, দেশে ফেরত গেলে সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং দাখিল করা নথিপত্র আরও কঠোরভাবে যাচাই করা হচ্ছে।
কোনো আবেদন মিথ্যা বা প্রতারণামূলক প্রমাণিত হলে আবেদন প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি বহিষ্কারের প্রক্রিয়াও শুরু হতে পারে।
বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশে রাজনৈতিক হয়রানি, মামলা, নিপীড়ন কিংবা নিরাপত্তাঝুঁকির দাবি তুলে অনেকে বিদেশে আশ্রয়ের আবেদন করছেন।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় বা সংশ্লিষ্টতার কারণে দেশে ফেরত গেলে বিপদের আশঙ্কা রয়েছে—এমন দাবিও নতুন কিছু আবেদনে উঠে আসছে।
কিন্তু শুধু রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত আশঙ্কার দাবি করলেই শরণার্থী মর্যাদা পাওয়ার সুযোগ নেই।
আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনের কাঠামো অনুযায়ী আবেদনকারীর দাবির পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য ও যাচাইযোগ্য তথ্য-প্রমাণ থাকা জরুরি।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আবেদনকারীর বক্তব্য, নথি, নিজ দেশের পরিস্থিতি এবং ব্যক্তিগত ঝুঁকি—সবকিছু বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেয়।
এমনকি পর্যটন বা ভিজিটর ভিসায় কানাডায় গিয়ে পরবর্তী সময়ে আশ্রয়ের আবেদন করার প্রবণতাও দেশটির অভিবাসন ব্যবস্থার জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
বিশ্বকাপসহ বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক আয়োজনকে কেন্দ্র করে অনেক বিদেশি নাগরিক কানাডা ও অন্যান্য উন্নত দেশে ভ্রমণ করলেও, ভ্রমণ ভিসাকে স্থায়ীভাবে বসবাসের বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহার করলে তা কর্তৃপক্ষের নজরে আসতে পারে।
কানাডার পাশাপাশি ইউরোপেও আশ্রয়প্রার্থীদের বিষয়ে কঠোরতা বাড়ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশি নাগরিকদের পক্ষ থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নিয়মিত আশ্রয়ের আবেদন করা হচ্ছে।
তবে আবেদন করলেই যে শরণার্থী মর্যাদা মিলবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রেই আবেদন দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত প্রত্যাখ্যাত হয়।
বিশেষ করে যেসব আবেদনকারীর দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই, একই ধরনের সাজানো কাহিনি উপস্থাপন করা হয়েছে, ভুয়া কাগজপত্র দেওয়া হয়েছে কিংবা ভিসার উদ্দেশ্যের সঙ্গে পরবর্তী আশ্রয় আবেদনের অসঙ্গতি রয়েছে—তাদের আবেদন কঠোরভাবে যাচাই করা হচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান এবং অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় বৃদ্ধি।
একজন আবেদনকারীর পরিচয়, পূর্ববর্তী ভিসা, আশ্রয় আবেদন, আঙুলের ছাপ এবং অন্যান্য অভিবাসন-সংক্রান্ত তথ্য বিভিন্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে।
ফলে এক দেশে ব্যর্থ হয়ে অন্য দেশে ভিন্ন পরিচয় বা ভিন্ন তথ্য দিয়ে আবেদন করার সুযোগও আগের তুলনায় কমে এসেছে।
বাংলাদেশিদের জন্য এর অর্থ কী?
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈধ ভিসা নিয়ে বিদেশে যাওয়া এবং বৈধভাবে বসবাসের অনুমতি পাওয়া এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নথিনির্ভর ও যাচাইভিত্তিক।
বিশেষ করে শরণার্থী বা রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করলে নিজের দাবির পক্ষে সুনির্দিষ্ট ও সত্য তথ্য উপস্থাপন করতে হবে।
মিথ্যা তথ্য, জাল নথি কিংবা সাজানো রাজনৈতিক নির্যাতনের গল্প ধরা পড়লে শুধু আবেদন প্রত্যাখ্যান নয়, ভবিষ্যতে ভিসা ও অভিবাসন সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তাই কানাডা বা ইউরোপে স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন দেখছেন এমন বাংলাদেশিদের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট—শর্টকাট, ভুয়া কাগজপত্র কিংবা সাজানো আশ্রয় আবেদন এখন আগের মতো নিরাপদ পথ নয়।
উন্নত দেশগুলোর অভিবাসন ব্যবস্থা যত বেশি তথ্যনির্ভর ও সমন্বিত হচ্ছে, ততই বাড়ছে আবেদন যাচাইয়ের সক্ষমতা।
কানাডা থেকে ফেরত পাঠানোর তালিকায় ৯৬৮ বাংলাদেশি নাগরিকের নাম থাকা সেই কঠোর বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিদেশে যাওয়ার পথই এখন সবচেয়ে নিরাপদ। অন্যথায় স্বপ্নের দেশ স্থায়ী হওয়ার সুযোগ না দিয়ে উল্টো প্রত্যাবাসনের গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।

ইউরোপযাত্রার ভূমধ্যসাগর রুটে বাংলাদেশি যাত্রী সবচেয়ে বেশি
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে অন্তত ১ হাজার ৬৬৮ জন অভিবাসী নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩৫ জন। ইউরোপমুখী মানুষের সংখ্যা কিছুটা কমলেও সমুদ্রপথে প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সবচেয়ে প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় রুট। চলতি বছর এ পথে অন্তত ৮৭২ জন নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন।
উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো, বিশেষ করে লিবিয়া থেকে লাম্পেদুসা হয়ে ইতালিতে পৌঁছানোর এই পথ দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপমুখী অভিবাসীদের অন্যতম প্রধান রুট।
এ পথে যাত্রাকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি নাগরিক।
এনজিও এসওএস মেদিতেরানের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় রুটে যাত্রা করা অভিবাসীদের ২৬ শতাংশই বাংলাদেশি। এরপর রয়েছেন ইরিত্রিয়ার ১৬ শতাংশ, সুদানের ১৩ শতাংশ, পাকিস্তানের ১২ শতাংশ এবং মিশরের ৯ শতাংশ নাগরিক।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে লিবিয়া ও টিউনিশিয়া থেকে যাত্রা করে ২৬ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষ ইউরোপে পৌঁছেছেন। আগের বছরের তুলনায় আগমন কমলেও নিহত ও নিখোঁজের সংখ্যা বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় পাচারকারীরা এখন আরও দীর্ঘ ও বিপজ্জনক পথ ব্যবহার করছে। বিশেষ করে লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলের তব্রুক থেকে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের দিকে যাত্রা বেড়েছে। এই পথ প্রচলিত রুটের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ দীর্ঘ হতে পারে। অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ও অনিরাপদ নৌকা পরিস্থিতিকে আরও প্রাণঘাতী করে তুলছে।
জানুয়ারিতেই প্রায় ৪৬০ জনের মৃত্যু রেকর্ড করেছে আইওএম। তবে বিভিন্ন মানবিক সংস্থার আশঙ্কা, প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা আরও বেশি।
অন্যদিকে, ভূমধ্যসাগরে বেসরকারি উদ্ধারকারী জাহাজগুলোর কার্যক্রমে বিধিনিষেধ এবং লিবিয়ার কোস্টগার্ডের ভূমিকা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে বিভিন্ন মানবিক সংস্থা। তাদের মতে, নিরাপদ ও কার্যকর উদ্ধারব্যবস্থা সীমিত হওয়ার পাশাপাশি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ রুট বেছে নেওয়ায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া অভিবাসীদের জন্য আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।













