কক্সবাংলা ডটকম :: দেশের ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের সংকট মোকাবিলায় সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। খেলাপি ঋণ আদায়, কঠোর তদারকি, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই এ পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্য।
গত ১৮ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভায় পরিকল্পনাটি অনুমোদিত হয়। জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩১ পর্যন্ত সময়ে এটি বাস্তবায়ন করা হবে। ব্যাংকিং খাতের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি কমাতেই সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে।
গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ। খেলাপি ঋণের এই বড় বোঝা এবং সুশাসনের ঘাটতি ব্যাংকগুলোর মূলধন ও মুনাফার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ফলে ব্যাংকিং খাতে কাঠামোগত সংস্কার এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
সরকার তিনটি ধাপে এ সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রথম বছরে তাৎক্ষণিক ঝুঁকি মোকাবিলা ও ব্যাংকিং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। পরবর্তী দুই বছরে ব্যাংকগুলোর কাঠামোগত পুনর্গঠন সম্পন্ন করা হবে। শেষ দুই বছরে গভীরতর সংস্কারের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতকে আরও দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রথম বছরের প্রধান লক্ষ্য উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যাংকগুলোর ওপর তদারকি জোরদার করা। এ সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অপারেশনাল স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা আরোপ করা হবে। আমানত সুরক্ষা তহবিল কার্যকর করার কাজও শুরু হবে।
পরবর্তী দুই বছরে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ঋণ আদায় প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। বড় ঋণগ্রহীতাদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হবে। পরিচালনা পর্ষদের মেয়াদ ও পারিবারিক প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে নির্দিষ্ট বিধান করা হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর আর্থিক তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতাও নিশ্চিত করা হবে।
সংস্কারের শেষ পর্যায়ে ব্যাংকগুলোর দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখার ব্যবস্থা করা হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল কার্যকর করা হবে। আমানতকারীদের সুরক্ষায় আধুনিক ব্যবস্থা চালুর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে বাজার শৃঙ্খলা আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য রয়েছে।
সংস্কার পরিকল্পনায় ব্যাংকগুলোকে নির্বিচারে নতুন ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে প্রথমে নিজেদের ব্যালেন্স শিট শক্তিশালী করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে ব্যাংকিং খাতের অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদের দুর্বল তদারকি ও পক্ষপাতমূলক ঋণ বিতরণ ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি বাড়িয়েছে। ভবিষ্যতে উৎপাদনশীল শিল্প ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) খাতে ঋণ দেওয়ার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। নিয়ম মেনে ঋণ বিতরণ নিশ্চিত করা গেলে ব্যাংকিং খাতের সংকট ধীরে ধীরে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংস্কার কার্যক্রমের সার্বিক তদারকিতে বাংলাদেশ ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সরকারি ব্যাংকগুলোর নীতিগত পরিবর্তন ও সংস্কার কার্যক্রম সমন্বয় করবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। প্রতি বছর সংস্কারের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে। পাশাপাশি ২০২৮ সালে একটি মধ্যমেয়াদি পর্যালোচনা করা হবে। এর মাধ্যমে সংস্কার বাস্তবায়নের পথে থাকা বাধা ও ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরও বাড়তে পারে বলে সরকার মনে করছে। সে সময় অভ্যন্তরীণ আর্থিক খাতের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে। তাই একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল ব্যাংকিং খাত গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। পরিকল্পনাটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের আর্থিক খাতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়বে। তবে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে পরিকল্পনাকে কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা।













