কক্সবাংলা ডটকম :: জ্বালানি তেলের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি এবং নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতির সার্বিক চাপ কমেনি। উল্টো সামনে নতুন অর্থনৈতিক ঝুঁকির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নীতি সুদহার (রেপো রেট) অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে জোর দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
তবে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি এবং উচ্চনীতি সুদের চড়া চাপ সত্ত্বেও সরকার মূল্যস্ফীতির রাশ টানতে পারছে না, কমছে না মূল্যস্ফীতি। যদিও সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমার কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কেনাকাটায় তার সামান্যতম স্বস্তির প্রতিফলন নেই।
বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে গিয়ে হিমশিম খাওয়া সাধারণ মানুষের অভিযোগ–আয় ও ব্যয়ের হিসাব তারা মেলাতে পারছেন না।
কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্রমাগত কঠোর নীতি অনুসরণ করে নীতি সুদ (রেপো রেট) বাড়িয়ে বর্তমানে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশের ঘরে ধরে রেখেছে। তবে বাজারে এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে না।
চড়া নীতি সুদ ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর চড়া সুদের হারের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ তলানিতে ঠেকেছে। ফলে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে নতুন বিনিয়োগ, সংকুচিত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেকারত্ব।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান সম্প্রতি বলেছেন, যথা সময়ের আগে মুদ্রানীতি শিথিল করলে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বাড়তে পারে। যে কারণে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে নামার বিষয়টি বিনিয়োগ-খরা ও ব্যবসার মন্দাভাবকে স্পষ্ট করে। বেসরকারি খাতের ঋণ এবং প্রকৃত অর্থনীতিতে এর সঞ্চালন দুর্বল রয়ে গেছে। এসব ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন উদ্যোগ চলমান আছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য কেবল সুদের হারকে একমাত্র হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার দিন শেষ। এখন প্রয়োজন আরও বিস্তৃত ও সমন্বিত অর্থনৈতিক নীতি। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতির কারণ যখন কেবল ‘অতিরিক্ত চাহিদা’ নয়, তখন শুধুই সুদের হার বাড়িয়ে সংকট সমাধান করা অসম্ভব।
বাজার ব্যবস্থাপনায় চাঁদাবাজি, কৃত্রিম সিন্ডিকেট, ডলারসংকটে পণ্য আমদানির চড়া ব্যয় এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের (সাপ্লাই চেইন) ত্রুটিই মূল্যস্ফীতি জিইয়ে রাখার প্রধান কারণ। বাস্তবভিত্তিক বাজার তদারকি ছাড়া কেবল মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টা উল্টো পুরো অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি মন্দার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, নীতি সুদহার হুট করে কমানো ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এতে মূল্যস্ফীতি আরও উসকে যেতে পারে। আগে ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করার সিদ্ধান্তটি কিছুটা তাড়াহুড়োয় নেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, নীতিমালায় বারবার পরিবর্তন আনলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘পলিসি স্টেটমেন্টের’ গুরুত্ব কমে যায়।
বিশ্ববাজারের অস্থিরতা ও তেলের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতির যে চাপ রয়েছে, তা সামলাতে নীতি সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিকভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন। ড. জাহিদ বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ সুদের হার, অর্থ সরবরাহ ও বিনিময় হার স্থির রাখা–পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করা নয়।
জানতে চাইলে দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পমালিকদের শীর্ষ সংগঠন ‘দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই)’ প্রসাশক ও প্ল্যামি ফ্যাশনসের এমডি ফজলুল হক বলেন, সমস্যাসংকুল দেশে নীতি সুদ অপরিবর্তিত রাখা ছাড়া সরকারের সামনে কোনো বিকল্প ছিল না। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত জটিল। এর মধ্যেই সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের নতুন বেতন স্কেল ঘোষণা করা হয়েছে, অর্থাৎ মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেওয়ার সব উপাদান তৈরি রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ভূ-রাজনৈতিক সংকটে বিশ্ববাজারে জ্বালানি খাতের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। ফলে নীতি সুদহার কমালেও এই মুহূর্তে বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা কম। তাই সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে সরকারের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
মজুরি বৃদ্ধি বনাম জীবনযাত্রার ব্যয়
গত ২১ সেপ্টেম্বর প্রতিটি জ্বালানির দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এদিকে চড়া সুদের হার ও কাঁচামাল আমদানির বাড়তি খরচে শিল্প উদ্যোক্তারা দিশেহারা। বিশেষ করে কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) খাতের ব্যবসায়ীরা ঋণের কিস্তি ও কর্মীদের বেতন মেটাতে না পেরে কারখানা বন্ধের উপক্রম তৈরি হয়েছে। তাই নীতি সুদ বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের তেলের দাম, ডলারসংকট বা পরিবহন ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।
কর্মসংস্থানে বড় ধাক্কা
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ তলানিতে নামায় নতুন চাকরির সুযোগ থমকে গেছে। পোশাক খাতসহ মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকতে কর্মী ছাঁটাই করছে কিংবা নতুন নিয়োগ বন্ধ রেখেছে। ফলে একদিকে চড়া জীবনযাত্রার ব্যয়, অন্যদিকে কাজ হারানোর ভয় ও বেকারত্ব–সব মিলিয়ে গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট ঘনীভূত হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের অসন্তোষ ও বিনিয়োগ স্থবিরতা
মূল্যস্ফীতি দমনের নামে ব্যাংকঋণের সুদের হার না কমানোর কারণে বিপাকে পড়েছেন দেশের শিল্পোদ্যোক্তারা। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনগুলোর নেতাদের মতে, নতুন বিনিয়োগ পুরোপুরি থমকে আছে। বিশেষ করে কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) খাতের ব্যবসায়ীরা কিস্তি পরিশোধ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছেন, যা অনেক কারখানা বন্ধের উপক্রম তৈরি করেছে।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাছির হোসেন বলেন, মূল্যস্ফীতি দমনে দীর্ঘদিন ধরে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি বহাল রাখা হলেও তা কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। বরং এর প্রভাবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড কমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে এসেছে। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় তেলের দাম ও জাহাজ ভাড়া বাড়ায় মূলত বাংলাদেশে ‘আমদানীকৃত মূল্যস্ফীতি’ তৈরি হয়েছে।
সঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুৎসংকট ও অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। উচ্চসুদের কারণে নতুন বিনিয়োগ থমকে গেছে, যা কর্মসংস্থান সংকুচিত করে বড় ধরনের সামাজিক সংকট তৈরি করছে। ফলে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।
বেকারত্ব বৃদ্ধির শঙ্কা ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব
ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্দা ও উৎপাদন হ্রাসের সরাসরি ধাক্কা এসে পড়ছে কর্মসংস্থান খাতে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে রেকর্ড তলানিতে নামার কারণে নতুন চাকরির সুযোগ এক প্রকার বন্ধ বললেই চলে। উপরন্তু, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অনেক পোশাক খাতসহ মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে কর্মী ছাঁটাই করছে এবং নতুন নিয়োগ স্থগিত রাখছে। ফলে বাজারে একপক্ষে জীবনযাত্রার চড়া ব্যয়, অন্যদিকে কাজ হারানোর ভয় এবং বেকারদের কর্মসংস্থান না হওয়া–সব মিলিয়ে এক গভীর অর্থনৈতিক-সামাজিক সংকট তৈরি করছে।
সংকট নিরসনে সুপারিশ
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বিশিষ্টজনেরা বেশ কিছু সুপারিশ করেছেন। এগুলো হলো– কেবল মুদ্রানীতি দিয়ে পণ্যমূল্য কমানো অসম্ভব। নিত্যপণ্যের বাজার থেকে কৃত্রিম সিন্ডিকেট ও পরিবহন খাতের অবৈধ চাঁদাবাজি কঠোর হস্তে বন্ধ করতে হবে। আমদানিনির্ভর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর সাময়িক শুল্ক ছাড় দিতে হবে এবং বন্দর থেকে দ্রুত পণ্য খালাসের ব্যবস্থা করে সরবরাহে স্বস্তি ফেরাতে হবে।
সার্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কার্যকারিতা পুনর্বিবেচনা করতে হবে। সুদের হার সমন্বয়ের মাধ্যমে শিল্প ও উৎপাদন খাতের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন তারা।













