বৃহস্পতিবার ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০ চৈত্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্মার্টফোনের প্রভাবে শিশু-কিশোরদের মায়োপিয়া বাড়ছে : বিরূপ প্রতিক্রিয়া মানসিক বিকাশেও

🗓 শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬

👁️ ১৩৮ বার দেখা হয়েছে

🗓 শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬

👁️ ১৩৮ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(৪ এপ্রিল) :: ঢাকার একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী লাবিবা ইসলাম মৌনি। দূরের বস্তু স্পষ্ট দেখতে না পাওয়ায় পঞ্চম শ্রেণী থেকেই নিয়মিত চশমা ব্যবহার করে সে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় মায়োপিয়া।

এর প্রভাবে কাছের জিনিস দেখতে অসুবিধা না হলেও দূরের জিনিস আবছা লাগে। লাবিবার মা সিরাজুম মনি জানান, মায়োপিয়া ছাড়াও প্রায়ই মাথাব্যথার সমস্যা হয় লাবিবার। চিকিৎসকরা পরামর্শ দিয়েছেন দৈনিক স্মার্টফোন, ল্যাপটপের মতো ডিভাইসগুলোর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে এবং স্ক্রিন টাইম দেড় থেকে ২ ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধা রাখতে।

তিনি বলেন, ‘মৌনি দৈনিক অন্তত ৪-৫ ঘণ্টা স্মার্টফোন বা ল্যাপটপে সোশ্যাল মিডিয়া ব্রাউজিং, গেম খেলা, ওয়েব সিরিজ দেখে পার করে। বিষয়টি শারীরিকভাবে যেমন বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে, তেমনি তার পড়ালেখায়ও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। চেষ্টা করেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না।

লাবিবার মতো একই সমস্যার শিকার শিশু-কিশোরদের বড় অংশ। চিকিৎসাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্মার্টফোনসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস যেমন আমাদের জীবনযাত্রাকে সহজ করে তুলেছে, তেমনি এর অতিরিক্ত ব্যবহার শিশু-কিশোরদের বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকিতেও ফেলছে এবং মানসিক বিকাশকেও বাধাগ্রস্ত করছে।

সম্প্রতি মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ওপর স্মার্টফোনের প্রভাববিষয়ক তথ্য উঠে এসেছে ‘এক্সপ্লোরিং স্মার্টফোন ইউজ অ্যামাং সেকেন্ডারি স্কুল স্টুডেন্টস ইন আ রুরাল স্কুল ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে। ওই গবেষণায় চাঁদপুরের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণীর ৫৯ শিক্ষার্থীর তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল।

তাদের মধ্যে প্রায় ৬৩ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছিল তারা পড়ালেখা বা কাজে মনোযোগের অভাব অনুভব করে। প্রায় ৪২ শতাংশ প্রায়ই মাথাব্যথার কথা জানায়। ৩৩ শতাংশ শিশু-কিশোর দৃষ্টিশক্তির সমস্যার কথা জানিয়েছিল। এছাড়া ৩৩ শতাংশ জানায়, তাদের ফলাফল খারাপ হচ্ছে এবং ২২ শতাংশ প্রায়ই পিঠে ব্যথা অনুভব করে।

‘বাংলাদেশের কিছু এলাকায় স্কুলের শিশুদের দৃষ্টিত্রুটি পরিস্থিতি’ শিরোনামে ২০২১ সালে একটি গবেষণা করেছিল ইস্পাহানি ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতাল। ঢাকা, বরিশাল, জামালপুর ও নওগাঁর বিভিন্ন স্কুলের ৩২ হাজার ৭৪৮টি শিশুর চোখ পরীক্ষা করে ইস্পাহানি ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতাল জানিয়েছিল দেশের স্কুলশিক্ষার্থীদের প্রতি ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ১৪ জনের দৃষ্টিত্রুটি রয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, চার জেলার মধ্যে রাজধানী ঢাকার শিশুদের দৃষ্টিত্রুটির হার সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৪০ শতাংশ।

চিকিৎসকরা বলছেন, বই বা কোনো কিছু পড়ার ক্ষেত্রে সাধারণত চোখ থেকে গড়ে ৪০ সেন্টিমিটার দূরত্ব থাকে। কিন্তু স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে এ দূরত্ব ৩০ সেন্টিমিটার এবং কখনো কখনো ১৮-২০ সেন্টিমিটারেও নেমে আসে। এছাড়া ছোট কক্ষে দীর্ঘ সময় কাটানো, বাইরে কম ছোটাছুটির কারণে শিশু-কিশোররা ধীরে ১৫-২০ ফুটের দূরের জিনিস দেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

শিশু-কিশোরদের এই ঘরে থাকার প্রবণতার কথা বলছেন অভিভাবকরাও। গোপালগঞ্জের বাসিন্দা শিল্পী আখতার বলেন, ‘আমার একজন সন্তানের বয়স সাত বছর, আরেকজনের তিন বছর। দুজনই ঘরের বাইরে খেলার তুলনায় সারা দিন স্মার্টফোনে বিভিন্ন ভিডিও দেখতেই পছন্দ করে। চেষ্টা করেও স্মার্টফোন আসক্তি দূর করতে পারছি না।’

জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘মায়োপিয়ার দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। বাবা-মায়ের মায়োপিয়া থাকলে সন্তানের ঝুঁকি বেশি থাকে। আর দ্বিতীয়টি পরিবেশগত। দীর্ঘ সময় ধরে পড়াশোনা বা মোবাইল ও কম্পিউটার ব্যবহার চোখে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে, যা মায়োপিয়া বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষ করে কাছ থেকে দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিন দেখা, বিরতি ছাড়া ব্যবহার এবং ঘরের ভেতরে বেশি সময় কাটানোর কারণে এ সমস্যা বাড়তে পারে। তবে শুধু স্ক্রিন টাইমই একমাত্র কারণ নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক কারণ।’

শিশু-কিশোরদের মায়োপিয়া প্রতিরোধে অভিভাবকদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘শিশুদের প্রতিদিন অন্তত দেড় থেকে ২ ঘণ্টা খোলা জায়গায় খেলাধুলা করানো এবং বয়স অনুযায়ী স্ক্রিন টাইম সীমিত রাখা প্রয়োজন। প্রতি ২০ মিনিট পর ২০ সেকেন্ডের জন্য অন্তত ২০ ফুট দূরে তাকানো উচিত।

বই বা স্ক্রিন চোখ থেকে অন্তত ৩০-৪০ সেন্টিমিটার দূরে রাখা দরকার। অল্প আলো বা অতিরিক্ত উজ্জ্বল আলোর পরিবর্তে উপযুক্ত আলোতে পড়াশোনা করা এবং বছরে অন্তত একবার চক্ষু বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে চোখ পরীক্ষা করানো উচিত।’

মায়োপিয়া বা স্বাস্থ্যগত সমস্যা ছাড়াও শিশুদের মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রেও মায়োপিয়া বিরূপ প্রভাব ফেলছে। রাজধানী ঢাকার বাসিন্দা হাবিবা মৌ বলেন, ‘আমার সন্তানের বয়স আট বছর। আমি কর্মজীবী হওয়ায় সন্তানকে দ্রুত খাবার খাওয়াতে, শান্তভাবে বসিয়ে রাখতে দিনের বড় সময় ট্যাবে বিভিন্ন কার্টুন দেখাতাম।

কিন্তু তার বয়স যখন দুই বছর তখন খেয়াল করলাম সে অন্য বাচ্চাদের মতো কথা বলছে না। তিন বছর বয়স পর্যন্তও সে বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক কথা বলতে পারছিল না। চিকিৎসকরা পরামর্শ দিয়েছিলেন তার সঙ্গে বেশি বেশি কথা বলার। সে প্রায় সাড়ে চার বছর বয়সে মোটামুটি কথা বলতে শিখেছিল।’

ঢাকার মিরপুর ক্যান্টনমেন্টে অবস্থিত ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের ১৫৩ জন অভিভাবকের মধ্যে ২০২২ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত একটি ক্রস-সেকশনাল জরিপ পরিচালিত হয়েছিল। জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে ‘শিশুদের ওপর দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহারের প্রভাব: বিকাশগত ও আচরণগত উদ্বেগ’ শিরোনামে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ৪৪ শতাংশ অভিভাবক জানিয়েছেন তারা সন্তানদের মধ্যে আচরণগত সমস্যা লক্ষ করেছেন।

১৭ শতাংশ অভিভাবক জানিয়েছেন তাদের সন্তানরা তুলনামূলক দেরিতে কথা বলেছেন। ১৩ শতাংশ জানিয়েছেন সন্তানরা আক্রমণাত্মক আচরণ করছেন, ৯ শতাংশ জানিয়েছেন তাদের সন্তানরা সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে তুলনামূলক দুর্বল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ তানভীর রহমান বলেন, ‘গবেষণায় দেখা গেছে অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার শিশুর আচরণগত ও মানসিক বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।

বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে নিমগ্ন থাকা শিশুদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ, মনোযোগ ধরে রাখা, ভাষা বিকাশ এবং সামাজিক প্রতিক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষ করে অতিরিক্ত গেমিং বা অবাধ স্ক্রিন টাইম শিশুদের খিটখিটে মেজাজ, অস্থিরতা ও মনোযোগের ঘাটতি বাড়িয়ে দিতে পারে। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি উদ্বেগের বিষয়। কারণ শৈশব ও কৈশোর হচ্ছে ব্যক্তিত্ব, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক দক্ষতা গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়।’

স্মার্টফোন শিশুদের সামাজিক জগৎকে একই সঙ্গে প্রসারিত ও সীমাবদ্ধ করছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘একদিকে এটি যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে সশরীরে খেলা, আলাপ, বন্ধুত্ব গড়ে তোলা এবং বাস্তব সামাজিক দক্ষতা অনুশীলনের ক্ষেত্র সংকুচিত করছে।

ফলে অনেক শিশু ভার্চুয়াল জগতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে, কিন্তু বাস্তব জীবনের সম্পর্ক, সহমর্মিতা ও আন্তর্ব্যক্তিক যোগাযোগে দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে সাইবার বুলিংয়ের ঝুঁকিও যুক্ত হয়েছে, যা শিশুদের আত্মসম্মান, মানসিক নিরাপত্তাবোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সুস্থতার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।’ তার মতে, সমস্যাটি যন্ত্রে নয়, বরং ব্যবহার-পদ্ধতিতে।

অভিভাবক, শিক্ষক ও নীতিনির্ধারকদের এখন প্রযুক্তিকে নিষিদ্ধ করার ভাষা থেকে সরে এসে নিয়ন্ত্রিত, বয়সোপযোগী ও তদারকিভিত্তিক ব্যবহারের দিকে জোর দিতে হবে।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর