বৃহস্পতিবার ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০ চৈত্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘ব্যাংক ব্যর্থতা ব্যবস্থাপনা’ দৃশ্যমান!

🗓 রবিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬

👁️ ১২৭ বার দেখা হয়েছে

🗓 রবিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬

👁️ ১২৭ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম :: দেশের ব্যাংকিং খাত এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে সংস্কারের পাশাপাশি সংকট সমানভাবে দৃশ্যমান। দীর্ঘদিন ধরে বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও দুর্বল তদারকির ফলে খাতটির ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।

এই বাস্তবতায় শুরু হওয়া সংস্কার উদ্যোগ এখন কতটা টেকসই হবে–সরকার পরিবর্তনের পর সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান অবশ্য আশ্বস্ত করেছেন, আগের সংস্কার উদ্যোগগুলো অব্যাহত থাকবে। কিন্তু ঘোষণার বাইরে গিয়ে এসব সংস্কার কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে, সেটিই এখন মূল বিবেচ্য।

সংস্কারের সূচনা ও কাঠামো

সাম্প্রতিক সংস্কার উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫’। যা গত বছরের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার জারি করেছিল। এই অধ্যাদেশের আওতায় পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করে নতুন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে।

একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ কমাতে টাস্কফোর্স, অর্থ পাচার রোধ ও পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে পৃথক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক-সমর্থিত অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউর (একিউআর) ভিত্তিতে নেওয়া এই পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে এই প্রথম আনুষ্ঠানিক ‘ব্যাংক ব্যর্থতা ব্যবস্থাপনা’ কাঠামোর সূচনা করেছে।

আগে কোনো ব্যাংক দুর্বল হলে সেটি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হতো; এখন লক্ষ্য হচ্ছে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংককে ‘রিজলভ’ করা।

তবে এই মডেলের মধ্যে ঝুঁকি আছে। খারাপ সম্পদ এক জায়গায় জমা হওয়া, ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ বেসরকারি বিনিয়োগকারীর অনিশ্চয়তা–সব মিলিয়ে এটি সফল না হলে বড় ধরনের ‘সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক’ তৈরি হতে পারে।

যদিও জানা গেছে, ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ সংশোধন করে জাতীয় সংসদে বিল উত্থাপনের জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে সরকার।

সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার কাজ করে আজ রবিবারের মধ্যে সংশোধনী প্রস্তাব সরকারকে দিতে বলা হয়েছে।

অধ্যাদেশ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পাঁচ ব্যাংক একীভূত অবস্থাতেই থাকছে বলে জানা গেছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আরও কয়েকটি ব্যাংক একীভূত বা অবসায়ন করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, আদৌ তা হবে কি না, আইন পাস হওয়ার পর সেটি বোঝা যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

চাপের মুখে সামষ্টিক অর্থনীতি

ব্যাংক খাতের সংস্কার এমন একসময়ে শুরু হয়েছে, যখন সামষ্টিক অর্থনীতিও চাপে আছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও আস্থাহীনতার সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা।

সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও বাজারে তার প্রতিফলন নেই। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি দীর্ঘদিন ধরে ভোগ্যপণ্যের কমাতে বাধ্য হচ্ছে। অনেকেই সঞ্চয় ভেঙে জীবনযাপন করছেন। এই পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়েছে। পরিণতিতে দেখা যাচ্ছে, প্রবৃদ্ধিতে তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে।

দ্রুতগতিতে নীতি-কৌশলের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদি মন্দার ঝুঁকিতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, ইতোমধ্যে প্রায় তিন বছর ধরে অভ্যন্তরীণ চাহিদার ধীরগতি বা মন্দাভাবের মধ্যে আছে বাংলাদেশ। এর শুরু ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে, যখন সামষ্টিক অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জে পড়ে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে মূল্যস্ফীতি কাগজে-কলমে ১৪ থেকে নেমে সাড়ে ৯ শতাংশের কাছাকাছি এলেও বাজারে তার প্রতিফলন নেই। এর বড় কারণ বিবিএসের ভিত্তি বছর। ভিত্তি বছর ২০২২ বা ২৩ ধরলে মূল্যস্ফীতি এখনো ১৪ শতাংশই থাকত। মূল্যস্ফীতির এই হার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত এবং দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের জন্য দুর্বিষহ।

২০২২ সাল থেকেই তারা জীবনযাত্রার মান বা ভোগের ক্ষেত্রে আপস করতে বাধ্য হচ্ছেন, অনেকে সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদায়ী গভর্নর আশা করেছিলেন, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামবে, কিন্তু তা আবার ৯ শতাংশের ওপরে উঠে গেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমাতে না পারলে অভ্যন্তরীণ চাহিদার মন্থরগতি থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়।

খেলাপি ঋণ ও আস্থার সংকট

ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখন খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের হার ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, মামলাধীন ঋণ যুক্ত করলে প্রকৃত হার ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বিগত সরকারের সময়ে তথ্য প্রকাশের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও সুশাসন আনার প্রচেষ্টার বদৌলতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র ধীরে ধীরে প্রকাশিত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া মন্দার কারণে অনিচ্ছাকৃত খেলাপিও যোগ হবে।

আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা বাস্তবায়নের কারণেও এটি বেড়েছে। ব্যাংকিং খাতের অর্ধেক সম্পদ আটকে থাকলে দেশের প্রবৃদ্ধিতে অর্থায়ন সম্ভব নয়।

সংস্কার বনাম প্রবৃদ্ধি: নীতিগত দ্বন্দ্ব

সংস্কারের ফলে ব্যাংকগুলো এখন ঝুঁকি নিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে। এসএমই ঋণ কমে গেছে, নতুন শিল্প স্থাপনে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে।

ফলে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব সামনে এসেছে– কড়াকড়ি বাড়ানো হলে অর্থনীতি মন্থর হয়, শিথিলতা আনা হলে আবার সংকট বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে।

তদারকি ব্যবস্থার রূপান্তর

সংস্কারের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি (আরবিএস) চালু করেছে। আগের নিয়মভিত্তিক তদারকির পরিবর্তে এখন ব্যাংকের সম্ভাব্য ঝুঁকি, ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ দুর্বলতা বিশ্লেষণ করা হবে।

পদ্ধতি হিসেবে এটি আন্তর্জাতিক মানের হলেও তার বাস্তবায়ন সহজ নয়। দক্ষ জনবল, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্য উপাত্ত ছাড়া এই ব্যবস্থা কার্যকর করা কঠিন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ঘাটতি পূরণ না হলে বিষয়টি কেবল নীতিপত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ডিজিটাল উদ্যোগ

ব্যাংকিং সেবার পরিসর বিস্তৃত করতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেমন- স্কুল ব্যাংকিং, নারী উদ্যোক্তা-কেন্দ্রিক এজেন্ট ব্যাংকিং, ডিজিটাল ন্যানো ঋণ ও বাংলা কিউআরভিত্তিক লেনদেন। এসব উদ্যোগ নগদ নির্ভরতা কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে গ্রামাঞ্চলে ডিজিটাল দক্ষতার সীমাবদ্ধতা, সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি ও নগদ অর্থ লেনদেনের ওপর আস্থার কারণে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের গতি কমে যেতে পারে।

বহির্বিশ্বের ঝুঁকি

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তেলের দাম বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে সম্ভাব্য ধাক্কা ব্যাংক খাতের সংস্কারকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

এ কারণে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রেখে সংস্কার এগিয়ে নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাদের মতে, নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যবসায়ীরা এখন নতুন করে বিনিয়োগ বাড়ানোর চিন্তা করছেন।

কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটে সেই উদ্যোগে কিছুটা ভাটা তৈরি হয়েছে। ফলে বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটিয়ে কর্মসংস্থান বাড়ানো সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

রাজনৈতিক অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ

সংস্কারের সাফল্য শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক প্রশ্নে এসে দাঁড়ায়। অতীতে রাজনৈতিক প্রভাবই ব্যাংক খাতের দুর্বলতার বড় কারণ ছিল। এখন প্রশ্ন হলো–বাংলাদেশ ব্যাংক কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে।

সংস্কার কার্যকর করতে হলে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশকে দ্রুত আইনে পরিণত করা, নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। আইএমএফও এ বিষয়ে স্পষ্ট রূপরেখা চেয়েছে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে যে সংস্কার শুরু হয়েছে, তা বিলম্বিত হলেও অনিবার্য। তবে এই পথ সহজ নয়। সংস্কার মাঝপথে থেমে গেলে সংকট আরও গভীর হতে পারে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ মুহূর্তে ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা; তা না হলে পুরো অর্থনীতিতে স্থবিরতা নেমে আসতে পারে।

ব্যাংকিং খাতের ওপর আস্থা বাড়াতে হলে আমানতকারীদের যেসব সংকট রয়েছে, তা দ্রুত মীমাংসা করতে হবে।

আরও কয়েকটি ব্যাংক খারাপ অবস্থায় আছে। সেগুলোর বিষয়েও সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বেশকিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে; তা দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করে আমানতকারীদের পাওনা বুঝিয়ে দিতে হবে।

সার্বিক বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ব্যাংক রেজল্যুশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫ এবং ডিপোজিট প্রটেকশন অর্ডিন্যান্সের ভিত্তিতে ব্যাংক খাতের মূল সংস্কারগুলো শুরু হয়েছে।

ফলে সংস্কার চালিয়ে নিতে বা অব্যাহত রাখতে হলে যে অধ্যাদেশের ভিত্তিতে ব্যাংক একীভূতকরণসহ অন্য কাজগুলো হয়েছে, ব্যাংক রেজল্যুশন ভিত্তিতে ওই অর্ডিন্যান্সগুলো তো সংসদে পাস করতে হবে। এটাই সংস্কার উদ্যোগ চালিয়ে নেওয়ার প্রথম কাজ।

ওই অধ্যাদেশগুলো যেভাবে আছে যদি সেইভাবে পাস না হয় মানে কোনো ধরনের পরিবর্তন বা কাটছাঁট করা হয় তাহলে তো ওই আইনের সঙ্গে নতুন যে আইন হবে এবং যেই পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছে তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। তখন তো সংস্কারটা আটকে যাবে।

ওইটা হলো প্রথম কাজ। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডিন্যান্স পাস হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তারা সেটা করে যাননি। ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের জন্য এটা খুবই দরকার ছিল। এখন নতুন সরকার এই বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নিবে কি না, সেটাই দেখার বিষয়। আগামী ১২ এপ্রিল আইএমএফের বৈঠকেও এই বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে সরকারকে।

ব্যাংক খাতের সংস্কার বাস্তবায়নের স্পষ্ট রূপরেখা চেয়েছে আইএমএফ। সরকার যদি আইএমএফের কাছে বাড়তি ঋণসুবিধা দাবি করে, তাহলে অতিদ্রুত সংস্কার কার্যক্রমের দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে হবে।

সেই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা যেন সংস্কার কার্যক্রমে তথা অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বাধা তৈরি করতে না পারে এবং অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে না পারে, সেই বিষয়ে সরকারকে তাৎক্ষণিক কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। সেই সঙ্গে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়াটি জটিল হলেও চালিয়ে যেতে হবে।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর