কক্সবাংলা ডটকম :: প্রয়াত কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী আশা ভোঁসলে। রবিবার মুম্বইয়ে ৯২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। গায়িকার পুত্র আনন্দ ভোঁসলে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। তাঁর প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে গোটা দেশে। বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি।
শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় শনিবার মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল তাঁকে। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। গায়িকার মৃত্যুতে শোকজ্ঞাপন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়।
১৯৩৩ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন গায়িকা। ভারতীয় সঙ্গীতের উজ্জ্বল নক্ষত্র তিনি। কয়েক দশক জুড়ে তাঁর কণ্ঠে অসংখ্য জনপ্রিয় গান শ্রোতাদের মন জয় করেছে। হিন্দি, বাংলা-সহ একাধিক ভাষায় গান গেয়েছেন তিনি।
দীর্ঘ কয়েক দশকের কেরিয়ারে হিন্দি, বাংলা-সহ একাধিক ভাষায় হাজার হাজার গান গেয়েছেন তিনি। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত থেকে আধুনিক, গজল থেকে ক্যাবারে—প্রতিটি ধারাতেই নিজের স্বতন্ত্র ছাপ রেখেছেন তিনি। তাঁর গাওয়া অসংখ্য গান আজও সমান জনপ্রিয়। সময়ের সীমানা পেরিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মুগ্ধ করে চলেছে।
তাঁর কণ্ঠে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য কালজয়ী গান, যা ভারতীয় সিনেমা ও সঙ্গীতের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে রয়েছে। আশা ভোঁসলের গাওয়া গান মানেই এক অনন্য বৈচিত্র্য। একদিকে যেমন ‘পিয়া তু আব তো আজা’, ‘দম মারো দম’, ‘ইয়ে মেরা দিল’–এর মতো উচ্ছ্বাসে ভরা ক্যাবারে ও ওয়েস্টার্ন ধারার গান। আবার ‘ইন আঁখোঁ কি মস্তি’, ‘মেরা কুছ সামান’, ‘দিল চীজ ক্যা হ্যায়’–এর মতো গভীর আবেগময় গজল ও আধুনিক সুরে তিনি শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন।
বাংলা গানেও তাঁর অবদান সমান উজ্জ্বল। ‘চোখে চোখে কথা বলো’, ‘মনে পড়ে রুবি রায়’–এর মতো গান আজও জনপ্রিয়। ১৯৫০-এর দশক থেকে শুরু করে নতুন সহস্রাব্দ পর্যন্ত একাধিক প্রজন্মের অভিনেত্রীর কণ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। হেলেনের নাচের গান হোক বা রেখার পর্দার আবেগ, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর কণ্ঠ আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। সুরকারদের সঙ্গে তাঁর সৃষ্টিশীল জুটিও আলাদা একটা অধ্যায়।
বিশেষত আর ডি বর্মণের সঙ্গে তাঁর কাজ ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতকে নতুন দিশা দেখিয়েছে। সংখ্যার বিচারে হাজার হাজার গান গাইলেও প্রতিটি গানে তাঁর স্বর, ভঙ্গি ও অনুভূতির স্বকীয়তা তাঁকে চিরকালীন করে রেখেছে। আশা ভোঁসলে এমন এক শিল্পী, যিনি সময়ের সঙ্গে নিজেকে বারবার নতুন করে গড়ে তুলেছেন। আটের দশকে যখন বলিউডে ডিস্কো ও ওয়েস্টার্ন সুরের ঢেউ, তখনও তিনি সেই ধারাতেও স্বচ্ছন্দ।
আবার অন্যদিকে গজল, ভজন বা আধুনিক মেলোডিতেও সমান দক্ষ। শুধু সিনেমার গানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, অ্যালবাম, লাইভ পারফরম্যান্স, এমনকি আন্তর্জাতিক মঞ্চেও নিজের কণ্ঠের জাদু ছড়িয়েছেন। তাঁর গাওয়া বহু গান আজও রিমিক্স হয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছচ্ছে।
বিভিন্ন খ্যাতনামা সুরকারের সঙ্গে কাজ করে তিনি একের পর এক হিট গান উপহার দিয়েছেন— ও.পি নায়ার (O. P. Nayyar) আর.ডি বর্মণ (R. D. Burman) মহম্মদ জহুর হাশমি খৈয়াম- এর মতো সুরকারদের সঙ্গে তাঁর যুগলবন্দি ভারতীয় সঙ্গীতকে দিয়েছে একাধিক স্মরণীয় সৃষ্টি। প্রতিটি সুরকারের ভিন্ন ভিন্ন ধাঁচের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার এই বিরল ক্ষমতাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
সময়ের স্রোতে বহু শিল্পী এসেছেন-গিয়েছেন, কিন্তু আশা ভোঁসলের কণ্ঠ যেন কখনও পুরোনো হয়নি। তাঁর গান শুধুই বিনোদন নয়—তা আবেগ, স্মৃতি এবং সংস্কৃতির এক অমূল্য ভাণ্ডার। তাই তাঁর প্রয়াণের পরেও তাঁর সুর বেঁচে থাকবে প্রতিটি শ্রোতার মনে, প্রতিটি প্রজন্মের প্লেলিস্টে।
দীর্ঘ ও গৌরবময় কেরিয়ারে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে অসংখ্য সম্মানে ভূষিত হয়েছেন আশা ভোঁসলে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তিনি পেয়েছেন দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাগরিক সম্মান পদ্ম বিভূষণ। তার আগে পেয়েছিলেন পদ্ম বিভূষণ। সঙ্গীতে অসামান্য কৃতিত্বের জন্য বহুবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (Best Female Playback Singer) জিতেছেন তিনি। পাশাপাশি ফিল্মফেয়ার পুরস্কারেও একাধিকবার সম্মানিত হন । পরবর্তীকালে তাঁকে জীবনকৃতি সম্মানে (লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট) সম্মানিত করা হয়।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তাঁর সাফল্য সমান উজ্জ্বল—গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনয়ন পাওয়া ভারতীয় শিল্পীদের মধ্যে তিনি অন্যতম। এছাড়া দাদা সাহেব ফালকে-এর র মতো ভারতীয় সিনেমার সর্বোচ্চ সম্মানেও ভূষিত হয়েছেন তিনি। যা তাঁর সমগ্র কেরিয়ারের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি।
মহারাষ্ট্র সরকার-সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংস্থা ও আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকেও তিনি পেয়েছেন অগণিত সম্মাননা। এত সম্মান ও পুরস্কারের মধ্যেও তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিলশ্রোতাদের অকৃত্রিম ভালোবাসা। আর সেই ভালোবাসার সুরেই যেন চোখ বন্ধ করলেই ভেসে আসে তাঁর অমর গান, “পিয়া তু আব তো আজা…”—যা চিরকাল মনে করিয়ে দেবে তাঁর অমলিন কণ্ঠের জাদু।














