মঙ্গলবার ২৬ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৬ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইউনূস আমলে দেশে নির্যাতিত ৪৯৬ সাংবাদিক, নিহত ৪ : বিনা বিচারে মাসের পর মাস কারাগারে

🗓 রবিবার, ০৩ মে ২০২৬

👁️ ৭৮ বার দেখা হয়েছে

🗓 রবিবার, ০৩ মে ২০২৬

👁️ ৭৮ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(৩ মে) :: ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটিয়ে ক্ষমতায় বসেন ইউনূস।

এরপর থেকেই দেশের সংবাদমাধ্যমের ওপর নেমে আসে চরম বিপর্যয়- সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাও মামলা, গ্রেপ্তার, হয়রানি ও নির্যাতনের ধারাবাহিক ঘটনা।

চারজন সাংবাদিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আত্মগোপনে চলে গেছেন আরও অনেকে।

দুর্নীতিবিরোধী বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছে, ইউনূস আমলে সারা দেশে ৪৯৬ জন সাংবাদিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।

এদের মধ্যে ২৬৬ জনকে জুলাই মামলায় হত্যা বা সহিংসতায় জড়িত দাবি করে আসামি করা হয়েছে।

গত বছরের ৪ঠা আগস্ট এ তথ্য প্রকাশ করে সংস্থাটি।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য আরও উদ্বেগজনক।

২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত মাত্র এক বছরে ৩৮৯ জন সাংবাদিক নির্যাতন বা হয়রানির শিকার হয়েছেন।

এই সময়ে চারজন সাংবাদিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ১৯টি মামলা দায়ের হয়েছে।

আসক জানাচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র (বৈছা) আন্দোলনের নেতাকর্মীরাও সাংবাদিক নিপীড়নের ঘটনায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন।

কারাবন্দি পেশাদার সাংবাদিকরা

গ্রেপ্তার হওয়া উল্লেখযোগ্য সাংবাদিকদের মধ্যে রয়েছেন একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক বার্তাপ্রধান শাকিল আহমেদ ও সাবেক প্রধান প্রতিবেদক-উপস্থাপক ফারজানা রুপা।

২০২৪ সালের ২১শে আগস্ট বিমানবন্দর থেকে তাদের আটক করে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ।

পরে বৈছা আন্দোলনে সময় রাজধানীর উত্তরায় হওয়া এক হত্যা মামলা এবং আদাবরে পোশাকশ্রমিক রুবেল হত্যা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

দেড় বছরের বেশি সময় ধরে তারা কারাগারে, এখনো জামিন পাননি।

একই বছরের সেপ্টেম্বরে ‘ময়মনসিংহের ধোবাউড়া সীমান্ত এলাকা থেকে’ (নিরাপত্তা বাহিনীর ভাষ্য) আটক হন দুই প্রখ্যাত সাংবাদিক- একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু ও ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত।

জুলাইয়ের একাধিক হত্যা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তখন থেকে তারা কারাগারে এবং জামিন আবেদন একাধিকবার নাকচ হয়েছে।

গত বছরের ডিসেম্বরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে জাতীয় প্রেস ক্লাব ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক সভাপতি এবং জনতা পার্টি বাংলাদেশের মহাসচিব শওকত মাহমুদ গ্রেপ্তার হন। তিনি এখনও কারাগারে।

এছাড়া বৈছা আন্দোলন চলাকালে দায়ের করা হত্যা মামলায় গত বছরের আগস্টে মাইটিভির চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দীনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।

সাংবাদিকদের আটকের নেপথ্যে অদ্ভূত সব অভিযোগ

এই ধরনের ঢালাও মামলার অসারতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে একাত্তর টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শাহনাজ শারমীনের ঘটনায়।

২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট বিকেল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত তিনি বঙ্গভবনের প্রধান ফটকের সামনে থেকে লাইভ সম্প্রচার করেছেন, যার তথ্যপ্রমাণ রয়েছে এবং তা অন্যান্য টেলিভিশনেও সম্প্রচারিত হয়েছে।

অথচ ওই একই দিন বিকেলে রাজধানীর মিরপুরের ভাষানটেক এলাকায় গুলিতে এক যুবক নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলায় তাকেও আসামি করা হয়েছে।

শাহনাজ শারমীন জানান, তার বিরুদ্ধে করা মামলার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। একই ব্যক্তি একসঙ্গে দুই জায়গায় থাকেন কীভাবে? এখন বিষয়টি দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

পেশাদার সাংবাদিকরাও স্বীকার করছেন যে সাংবাদিকেরা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন এবং কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আইনি পথে প্রতিকারের সুযোগ রয়েছে।

কিন্তু ঢালাওভাবে হত্যা মামলায় নাম যুক্ত করা এবং মাসের পর মাস বিনা বিচারে আটকে রাখা ন্যায়বিচারের ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে বলে তারা মনে করেন।

নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি ও মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, “আমরা যদি আইনের শাসনের কথা বলি, তাহলে বিনা বিচারে কাউকে আটকে রাখা এবং দিনের পর দিন জামিন না দেওয়া সমীচীন নয়।

বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। আমরা নোয়াবের পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি বলেছি। শিগগিরই বিষয়টির সুরাহা হবে বলে আশা রাখছি।”

নতুন নির্বাচিত বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৪ই মার্চ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আনিস আলমগীর জামিন পেয়েছেন।

২০২৫ সালের ১৪ই ডিসেম্বর রাজধানীর ধানমন্ডির একটি ব্যায়ামাগার থেকে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হয় এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ একাধিক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

এছাড়া চট্টগ্রামে ২৮ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে করা অভিযোগের সত্যতা পায়নি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এসব ঘটনা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে কিছুটা আশাবাদের সঞ্চার করেছে।

পুলিশের বক্তব্য

পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, জুলাই সংক্রান্ত মামলাগুলো সংবেদনশীল এবং প্রতিটি মামলা যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে।

তদন্তে কারো বিরুদ্ধে দায় না পাওয়া গেলে তদন্তকারী কর্মকর্তা অব্যাহতির আবেদন করছেন এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

তথাকথিত আন্দোলন সংঘটিত করার সময় যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তুলে ধরা হয়েছিল, তার অসারতা ইতিমধ্যে স্পষ্ট।

মাসের পর মাস কারাবন্দি সাংবাদিক, শত শত মামলার বোঝা আর চার সহকর্মীর হত্যা— এই চিত্র বাংলাদেশে সাংবাদিকতার পেশার জন্য এক গভীর উদ্বেগের বার্তা বহন করছে।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর