বুধবার ১৩ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অর্থনীতিতে নতুন চাপ

🗓 সোমবার, ০৪ মে ২০২৬

👁️ ৪৯ বার দেখা হয়েছে

🗓 সোমবার, ০৪ মে ২০২৬

👁️ ৪৯ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(৪ মে) :: বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। বাড়তি দামে জ্বালানি আমদানির ফলে আমদানি বিল পরিশোধে অতিরিক্ত ডলারের প্রয়োজন হচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। ডলারের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টাকার মানেও আঘাত করতে শুরু করছে।

এতে আমদানি ব্যয় আরও বেড়ে গিয়ে শিল্পোৎপাদন, পরিবহন ও নিত্যপণ্যের বাজারে প্রভাব ফেলছে। এই চক্রাকারে প্রভাবে মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মূল্যস্ফীতির এই আশঙ্কার সত্যত্য মিলছে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনেও। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি (বছরভিত্তিক মূল্য এবং মজুরি) বেড়ে গড়ে ৮ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৮ দশমিক ৩ শতাংশ।

এ অবস্থায় অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, গত কয়েক বছরে বৈশ্বিক অস্থিরতা- বিশেষ করে মহামারি করোনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ বেশ কয়েকবার ডলার সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। সে সময় বাজার স্থিতিশীল রাখতে রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার বিক্রি করতে হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আবারও একই ধরনের চাপ তৈরি হলে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এদিকে ডলারের বাজার যাতে টালমাটাল হয়ে না পড়ে তার জন্য সতর্ক নজর রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে। বিশেষ করে কোনোভাবেই টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়নের দিকে যেতে চাচ্ছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি বৈশ্বিক তেলবাজারের অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তা হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ আরও বাড়বে। বিশেষ করে আমদানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সামাজিক অস্থিরতাও বেড়ে যাবে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব নীতি, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি- সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় জরুরি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, অর্থনীতির বিপর্যয় রোধে সরকারকে পরিবহন ব্যবস্থার দিকে ভালোভাবে নজর দিতে হবে। সরকার বাস ভাড়া ২-৫ শতাংশ বাড়িয়েছে, ট্রাক ভাড়াও যেন সে হারেই বাড়ানো হয়। গণপরিবহনের চেয়েও ফ্রেইট ট্রান্সপোর্ট বা পণ্যপরিবহনে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ট্রান্সপোর্ট ফি বাড়ায় খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিই মূলত মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে বেশি প্রভাব ফেলবে।

তিনি বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে আমাদের জ্বালানি আমদানি বাবদ ৫০ শতাংশের বেশি ব্যয় বেড়েছে। সাধারণত আমরা ১২-১৩ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য আমদানি করি প্রতি বছর, কিন্তু কয়েক দিন আগে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বর্তমান সংকট যদি চলমান থাকে তা হলে আমাদের অতিরিক্ত প্রায় ৫-৬ বিলিয়ন ডলার বেশি প্রয়োজন হবে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. মঈনুল ইসলাম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিভিন্ন অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা- এই তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা সহজ নয়। ব্যাংকে সুদের হার বাড়ালে মূল্যস্ফীতি কমতে পারে, কিন্তু এতে বিনিয়োগ ও শিল্পোৎপাদন কমে যেতে পারে। আবার ডলার সরবরাহ বাড়ালে বাজার স্থিতিশীল হয়, কিন্তু রিজার্ভ কমে যায়। তাই প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে সুচিন্তিতভাবে।

ডলারের দাম বাড়ছে, টাকার মান কমছে : এক্সচেঞ্জ রেট ইউকের তথ্য মতে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরুর আগে গত জানুয়ারিতে টাকার বিপরীতের ডলারের দর ছিল ১২১.৩৮ টাকা। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর গত মাসের মাঝামাঝি এসে এই দর বেড়ে দাড়ায় ১২৩.৪৬ টাকায়। তবে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য স্থিতিশীল রয়েছে।

এ জন্য এপ্রিলের শেষের দিকে প্রতি ডলার বিক্রি ১২২.৫০ টাকায় নেমে এলেও এখন চড়া দামেই বিক্রি হচ্ছে ডলার। অবশ্য জ্বালানি সংকটের কারণে যেন টাকার মান খুব বেশি কমে না যায়, সে ক্ষেত্রে কড়া নজরদারি রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাজারে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রয়োজনে প্রায় ২০ কোটি ডলার বিক্রি করতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবু কোনোভাবেই টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়নের দিকে যেতে চায় না।

তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রিজার্ভ ব্যবহার করতে হলে তা পরিকল্পিত ও সীমিত আকারে করতে হবে, যেন দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।কিন্তু বাজারের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।

ব্যাংকগুলো সূত্রে জানা গেছে, গত এক মাসে আমদানিকারকদের কাছে ডলার বিক্রির দাম প্রায় ২ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ভবিষ্যতে দাম বাড়ার আশঙ্কা থেকে কিছু ব্যাংক ডলার মজুদ করছে। এতে বাজারে সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জেডসিএর মতে, জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি ব্যয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকেও চাপে ফেলবে। এতে আমদানির ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা ৫ দশমিক ৭ মাস থেকে কমে ৪ দশমিক ৯ মাসে নেমে আসতে পারে। সংস্থাটির মতে, আমদানি ব্যয় বাড়লে টাকার অবমূল্যায়ন হতে পারে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ার পাশাপাশি ঋণের সুদহার বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর চাপ তৈরি হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের করণীয় ও নীতিগত কৌশল : এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক একাধিক নীতিগত উপায়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা। তাদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে হস্তক্ষেপ করে ডলারের অতিরিক্ত ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়, বরং স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য কার্যকর।

দ্বিতীয়ত আমদানি ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা। এতে অপ্রয়োজনীয় বা বিলাসপণ্য আমদানিকরণে নিরুৎসাহিত হলে ডলারের ওপর চাপ কমানো সম্ভব। তৃতীয়ত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি কঠোর করা। এর মধ্যে রয়েছে সুদের হার বাড়ানো এবং বাজারে অর্থ সরবরাহ কমিয়ে চাহিদা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টা করা হয়। চতুর্থত ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় তারল্য সহায়তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত খাতে ঋণ সুবিধা দেওয়া।

মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষ : জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। পরিবহন ব্যয় বাড়ায় খাদ্যপণ্যসহ সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়তে থাকে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রা ব্যয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।

ইতিমধ্যেই পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে খাদ্যপণ্যের দাম বহুলাংশে বেড়ে গেছে। বর্তমানে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রতি কেজি মিনিকেট চালের দাম বেড়ে ৮৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। দেশি মসুর ডাল হয়েছে ১৬০ টাকা, যা আগে ছিল ১৫০ টাকা। এ ছাড়া প্রতি হালি লাল ডিম ৪৮ টাকা থেকে বেড়ে ৫৬ টাকা, সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৯৫ টাকা থেকে বেড়ে ২১০ টাকায়, চিনিতে কেজিপ্রতি ১০ টাকা বেড়ে ১৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

অন্যদিকে কৃষিপণ্য উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে ব্যাপক। বাংলাদেশে প্রায় ৮০ শতাংশ সেচ ব্যবস্থা ডিজেলচালিত হওয়ায় চাষাবাদ ও সেচ খরচ বেড়েছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে ফসল উৎপাদনে ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকরা সংকটে পড়েছেন, যা খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

এমনকি শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে গেছে। বিদ্যুৎ সংকটে কলকারখানা ও তৈরি পোশাক খাতে ব্যবহৃত ডিজেলচালিত জেনারেটরের খরচ বেড়ে গেছে। এতে রফতানি বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে জ্বালানি ও এলপিজি গ্যাসের দাম একযোগে বাড়ায় সীমিত আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে এবং সঞ্চয় প্রবণতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

বর্তমানে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য আগের ১৭২৮ টাকা থেকে ২১২ টাকা বৃদ্ধি করে নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯৪০ টাকা। যদিও ভোক্তারা বলছেন এই মূল্যে কোথায় সিলিন্ডার গ্যাস পাওয়া যাচ্চে না। বরং তাদের আরও ৩০০-৪০০ টাকা বাড়তি দিয়ে ২৩০০-২৪০০ টাকায় সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে।

যা বলছে বাংলাদেশ ব্যাংক : বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, বর্তমানে দেশে ডলার সংকট নেই। তবে জ্বালানি যে সংকট, এটি বৈশ্বিক সংকট। আমরা আশা করি কূটনৈতিকভাবে এর সমাধান করবে সরকার। যেদিন থেকে আমাদের জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে সেদিন থেকে সরকার চেষ্টা করছে জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে স্পট মার্কেট থেকে অধিক মূল্যে জ্বালানি কেনার। কিন্তু এই অধিক মূল্যের বোঝা এতদিন জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়নি।

এখন জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় এটি স্বাভাবিক যে, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং আমরা যে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার চেষ্টা করছিলাম, সেটির লাগাম টেনে ধরা কষ্টকর হবে। যদি জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির দায়ে পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার সচেষ্ট হয় তা হলে সাময়িক মূল্য বৃদ্ধি হলেও দীর্ঘস্থায়ী কোনো প্রভাব ফেলবে না। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কাজগুলোর একটি।

কিন্তু আমাদের মতো দেশে শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না। এর সঙ্গে সরকারের অন্যন্য প্রতিষ্ঠান, বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জড়িত। সবাই যখন একসঙ্গে কাজ করবে, তখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এখনও অস্থিরতা : বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের প্রধান অঞ্চল হিসাবে খ্যাত মধ্যপ্রাচ্য। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি অপারেশন এপিক ফিউরি নামে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সম্মিলিতভাবে ইরানে হামলা শুরু করে। তবে এই হামলা শুধু ইরানের ওপরই সীমাবদ্ধ থাকেনি।

কুয়েত, কাতার, জর্ডান, লেবানন, ইরাক, ইয়েমেন, আরব আমিরাত, সৌদি আরবসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এই হামলা ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিশ্ব জ্বালানির সবচেয়ে বড় অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্য থেকে সারা বিশ্বে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে পড়ে। ফলে বিশ্ববাজারে দ্রুতই বাড়তে থাকে তেলের দাম।

বর্তমানে বিশ্ববাজারে এক ব্যারেল ক্রুড অয়েল বিক্রি হয়েছে ১০৪ ডলারে, যা ইরান যুদ্ধের আগে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ছিল মাত্র ৬২ ডলার। এমন প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা আগাম মজুদ বাড়াতে শুরু করলে তেলের দাম আরও বেড়ে যায়। ফলশ্রুতিতে গত ১৮ এপ্রিল জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি করে নতুন দাম নির্ধারণ করে দেয় সরকার। যদিও দেশে জ¦ালানি পরিস্থিতির এখন বেশ উন্নতি হয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ১ লাখ ৪৩ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা বা প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫২ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকার পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করেছে বাংলাদেশ।

একই সময়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছে ১৩ হাজার ৩৮০ কোটি টাকার। আর এলএনজি ও এলপিজি আমদানিতে আরও ৫৯ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। বাকি ১৭ হাজার ১৪ কোটি টাকা কয়লা আমদানিতে ব্যয় হয়েছে। বর্তমানে স্পট মার্কেট থেকে দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র।

আমদানিনির্ভর বাস্তবতায় বাংলাদেশের ঝুঁকি : বাংলাদেশের জ্বালানি খাত এখনও আমদানিনির্ভর। অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি এবং এলএনজি- সব ক্ষেত্রেই বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ২০২৩ সালে দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার ৪৬ শতাংশই মেটানো হয়েছিল আমদানি থেকে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুতের জ্বালানির ৬৫ শতাংশ ছিল আমদানিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের পরিবর্তন সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জিরো কার্বন অ্যানালিটিকসের (জেডসিএ) এক প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দিয়ে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটের কারণে বাংলাদেশের বার্ষিক জ্বালানি আমদানি ব্যয় ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন (৪৮০ কোটি) ডলার বাড়তে পারে বলে। এই ব্যয় ২০২৫ সালের তুলনায় অন্তত ৪০ শতাংশ বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম বাড়লে প্রথমেই সরকারের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এতে বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়, কারণ অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানিনির্ভর। ফলে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বাড়তে পারে অথবা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়।

ইতিমধ্যেই সরকার জ্বালানি তেলের দাম এক ধাপ বৃদ্ধি করেছে। নতুন দাম অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেলে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, অকটেনে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১২০ টাকা, পেট্রোলে ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিনে ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার ফলে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এই ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপ হিসেবে এসে পড়ে, যা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেয়।

জ্বালানি তেলের বাড়তি দরের কারণে সরকার এরই মধ্যে আন্তঃজেলা বাস ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২.২৩ টাকা বৃদ্ধি করলেও গণমাধ্যমের কাছে যাত্রীরা ‘অতিরিক্ত চার্জ’ হিসেবে প্রতি টিকেটে আরও ১৫০-২০০ টাকা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন।

উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা জানিয়েছেন, অনানুষ্ঠানিক বাজারে ডিজেলের জন্য তাদের প্রতি লিটারে ১২৫-১৩৫ টাকা দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে সেচের খরচ ১৫-২০ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানি সংকটের এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সার্বিক মুদ্রাস্ফীতির চাপ ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জেডসিএ বলছে, জ্বালানি তেল, গ্যাস ও কয়লার বর্ধিত এই দাম যদি এক বছর স্থায়ী হয়, তবে তা বাংলাদেশের ২০২৪ সালের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১.১ শতাংশের সমান আর্থিক ক্ষতির কারণ হবে।

ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন : বৈশ্বিক অস্থিরতায় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ব্যাংক খাতে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে না দেখা গেলেও ভবিষ্যতে ব্যাংক খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে আগাম প্রস্তুতি, নীতিগত সহায়তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই এই সংকট মোকাবিলার প্রধান উপায় বলে তারা মনে করছেন।

পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ আলী বলেন, ইরানের সঙ্গে ইউএস-ইসরাইলের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানির সরবরাহ শৃঙ্খলা যেভাবে ব্যহত হচ্ছে, এটি বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলবে। শুধু বাংলাদেশে নয়, ইউরোপ, চীন, রাশিয়া এমনকি ইউএসএতেও প্রভাব পড়বে। যেসব কোম্পানির ভিত্তি মজবুত তারা হয়তো ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠতে পারবে। কিন্তু যারা কোনোমতে চলছে, তারা ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

টাকা না থাকলে ব্যাংকের ধার শোধ করবে কীভাবে? তবে বর্তমান সংকট ব্যাংক খাতে কেমন প্রভাব ফেলবে তার আসল চিত্র পাওয়া যাবে ছয় মাস বা এক বছর পর। সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে আমদানি হোক বা রফতানি- উভয় ক্ষেত্রেই ব্যাংকে এলসি ডিক্লাইন হচ্ছে।

তবে কোভিড সময়কাল কিংবা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যাংক খাতের ওপর যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তার আলোকে সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন এই ব্যাংকার।

তিনি বলেন, এখন যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে তাতে ভর্তুকি যে খুব বেশি দেওয়া যাবে এমন নয়। তবে ইন্টারেস্ট পেমেন্ট ডেফার্ড করা, ইনস্টলমেন্ট ডেফার্ড করা, গ্রাহককে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে রিলিজ করে দেওয়া, গ্যাস সরবরাহ ঠিক রাখা, উন্নয়নমূলক কাজ অব্যাহত রাখা দরকার। এক কথায় সরকারের স্ট্যাবিলিটি ঠিক রাখা।

তবে যেখানে ইনসেনটিভ বা ভর্তুকি দেওয়া যায়, সেগুলো করতে হবে। ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে কিছু নীতিসহায়তা ডেফার্ড করা যায়, যেন ভালো ব্যবসায়ীরা যারা রি-শিডিউল করেনি, নীতিসহায়তায় যায়নি, তারা এই সংকটের ধাক্কাটা সামলাতে পারে।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর