কক্সবাংলা রিপোর্ট :: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইসেনের এক সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (৫ মে) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সার্বিক পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সীমিত সম্পদ ও ঘনবসতিপূর্ণ বাস্তবতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ মানবিক কারণে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
রোহিঙ্গাদের জীবনমান উন্নয়ন এবং মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে বৈশ্বিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইসেন জানান, সীমিত জায়গায় অতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণে শিবিরগুলোতে বসবাসরত মানুষ নানা সংকটে রয়েছেন।
এতে স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার মান মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় শিবিরের পরিসর বৃদ্ধি করা সহজ নয়।
তাই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হিসেবে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের ওপরই গুরুত্ব দিতে হবে।
এ সময় তিনি আরও বলেন, গাজা সংকট, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মতো বৈশ্বিক ইস্যুর কারণে রোহিঙ্গা সংকট যেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্ব হারিয়ে না ফেলে।
এ বিষয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণে জাতিসংঘ ও ইউএনএইচসিআর-এর আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বৈঠকের একপর্যায়ে ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধি আগামী ২০ মে অনুষ্ঠিতব্য ‘জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান’ (JRP) উপস্থাপনা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানান।

প্রসঙ্গত,বাংলাদেশ-মিয়ানমারের সীমান্ত জেলা কক্সবাজারে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ইতিহাস দীর্ঘদিনের।
১৯৭৭-৭৮ সালে প্রথম দফায় প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে, যার মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার পরবর্তীতে মিয়ানমারে ফিরে যায়।
পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে দ্বিতীয় দফায় ২ লাখ ৫০ হাজার ৮৭৭ জন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে। এদের মধ্যে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৯ জনকে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়।
এরপর ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয়।
তবে সবচেয়ে বড় ঢল নামে ২০১৭ সালে, যখন সহিংসতার মুখে পড়ে প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
সর্বশেষ ২০২৪ সাল থেকে নতুন করে আরও প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে।
বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোট প্রায় ২০ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এর মধ্যে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ। মোট পরিবার সংখ্যা ২ লাখ ৪ হাজার ২৭৪টি।
জনসংখ্যার গঠন বিশ্লেষণে দেখা যায়, আশ্রিতদের মধ্যে ৫২ শতাংশ শিশু, ৪৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ৪ শতাংশ প্রবীণ।
এছাড়া লিঙ্গ ভিত্তিক হিসাবে ৪৯ শতাংশ পুরুষ এবং ৫১ শতাংশ নারী রয়েছে। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০ হাজার রোহিঙ্গা শিশুর জন্ম হচ্ছে, যা এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ এলাকায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ হলেও সেখানে অবস্থানরত রোহিঙ্গার সংখ্যা এর প্রায় দ্বিগুণ, যা স্থানীয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।
এদিকে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সম্প্রতি প্রথম ধাপে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে শনাক্ত করেছিল মিয়ানমার। তাদের ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যে ট্রানজিট সেন্টার প্রস্তুত করাও হয়েছিল।
নতুন করে ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দুটি ট্রানজিট সেন্টার শিগগিরই হস্তান্তর করা হয়েছে। এছাড়াও টেকনাফ ও ঘুমধুমে আরও দুটি ট্রানজিট সেন্টার প্রস্তুত রয়েছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয় জানিয়েছে, প্রত্যাবাসনে সম্মত রোহিঙ্গাদের তালিকা হালনাগাদ করার কাজ চলমান রয়েছে।
উল্লেখ্য, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ সরকার ২০১৮ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে আসছে।
তবে নানা অজুহাতে মিয়ানমার এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও বাস্তবে ফেরত নেয়নি। ফলে দীর্ঘমেয়াদি এই সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।














