কক্সবাংলা ডটকম (১৮ জুন) :: দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপকে আর্থিক সংকট থেকে উত্তরণে ২৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ যৌথভাবে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে দুটি বিদেশি ব্যাংকসহ মোট ৩৬টি ব্যাংক।
এ লক্ষ্যে ব্যাংকগুলোর মধ্যে একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে শিল্পগোষ্ঠীটির কার্যক্রম সচল রাখা এবং ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত প্রভিশনিংয়ের চাপ এড়ানো সম্ভব হয়।
এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে ব্যাংকগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, আপাতত ঋণগুলোকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত না করে পুনর্গঠন করা হবে এবং পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো হবে।
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সিটি গ্রুপের আর্থিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পরিচালনা পর্ষদে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে দুই থেকে তিনজন প্রতিনিধি রাখা হবে। অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, কী পরিমাণ বিক্রি হচ্ছে এবং নগদ প্রবাহ কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে—এসব বিষয়ে সরাসরি নজরদারি থাকবে তাদের।
এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত ‘ওয়াটারফল মেকানিজম’ অনুসরণ করা হবে। এর আওতায় ৩৬টি ব্যাংকের যৌথ মালিকানায় একটি কেন্দ্রীয় এসক্রো অ্যাকাউন্ট খোলা হবে, যেখানে সিটি গ্রুপের সব বিক্রয় আয় জমা হবে। পরে ওই অর্থের একটি অংশ ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠানকে ফেরত দেওয়া হবে এবং বাকি অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করা হবে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)-এর চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিনের উদ্যোগে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানও এ উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন বলে জানা গেছে।
এর আগে চলতি বছরের মে মাসে বৈদেশিক মুদ্রার লোকসান, চলতি মূলধনের সংকট এবং গ্যাস সংযোগের অভাবে ছয়টি প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়ায় সিটি গ্রুপ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নীতিগত সহায়তা চেয়েছিল। এরপর গ্রুপটিকে সচল রাখতে সমাধান খুঁজতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, ডিসেম্বর পর্যন্ত কিংবা প্রয়োজন হলে আরও কিছু সময়ের জন্য ঋণগুলো খেলাপি না করার বিশেষ অনুমোদন বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে চাওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে একটি স্বাধীন মনিটরিং কমিটি গঠন করে পুনর্গঠন বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করারও পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সিটি গ্রুপের নন-কোর বা মূল ব্যবসার বাইরে থাকা সম্পদ বিক্রির বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইকোনমিক জোন), হাই-টেক পার্কসহ আয়হীন বা কম কার্যকর প্রকল্পগুলোর জন্য সম্ভাব্য ক্রেতা খোঁজা হবে।
বাংলাদেশে এই প্রথম কোনো বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে এসক্রো অ্যাকাউন্ট ও সমন্বিত তদারকির মাধ্যমে একযোগে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকাররা।
কেন সংকটে পড়ল সিটি গ্রুপ?
২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ফজলুর রহমানের মৃত্যুর পর ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্বের ঘাটতি তৈরি হয়। একই সময়ে ব্যাংকিং খাতের সংকট, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার বড় ধরনের লোকসান এবং ব্যাংকগুলোর সহায়তা কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান জানিয়েছেন, ২০২২ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি বৈদেশিক মুদ্রা লোকসানের মুখে পড়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর ঋণসীমা সংকুচিত হওয়ায় প্রায় ৯০ কোটি ডলারের আমদানি সক্ষমতা হারিয়েছে তারা।
তিনি বলেন, বিদেশি সরবরাহকারীরা অনেক স্থানীয় ব্যাংকের ইস্যুকৃত এলসি গ্রহণে অনীহা দেখানোয় আমদানি কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হয়েছে এবং বিক্রি এক-তৃতীয়াংশের নিচে নেমে এসেছে।
এ ছাড়া মুন্সীগঞ্জে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে ছয়টি শিল্প প্রকল্প গ্যাস সংযোগের অভাবে চালু করা যাচ্ছে না। এতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ কোটি টাকা ক্ষতির মুখে পড়ছে প্রতিষ্ঠানটি।
মো. হাসান বলেন, শুধু ঋণ পুনর্গঠন করলেই হবে না; কারখানা চালু রাখতে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ, চলতি মূলধনের ব্যবস্থা এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ঋণ পরিশোধও সম্ভব হবে না।
তিনি সতর্ক করে বলেন, বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো সংকটে পড়লে এর প্রভাব শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং দেশের ব্যাংকিং খাত, আন্তর্জাতিক সুনাম, বৈদেশিক অর্থায়ন এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।














