কক্সবাংলা ডটকম(২২ জুন) :: দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সঙ্গে নতুন করে ঋণ আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছে সরকার।
আগামী জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে প্রায় ৪ বিলিয়ন (৪০০ কোটি) মার্কিন ডলারের একটি নতুন ঋণ প্যাকেজ নিয়ে আনুষ্ঠানিক দরকষাকষি শুরু হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২২ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আইএমএফের সঙ্গে সম্পাদিত চলমান ঋণ কর্মসূচি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বকেয়া কিস্তি ছাড় ও বিভিন্ন সংস্কার শর্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘদিন ধরে অগ্রগতি স্থবির হয়ে পড়ায় বিদ্যমান কর্মসূচিটি কার্যত অকার্যকর হয়ে গেছে।
এ পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকার পুরোনো চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে তিন বছর মেয়াদি একটি নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় অর্থনৈতিক সংস্কার ও নীতিগত অগ্রাধিকারের নতুন কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।
এ লক্ষ্যে আইএমএফের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আগামী ১২ থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত ঢাকা সফর করবে।
আইএমএফের বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল সরকারের নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক সংস্কার এজেন্ডা এবং অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবে।
ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় নতুন কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং তিন বছর মেয়াদি সংস্কার পরিকল্পনার একটি খসড়া তালিকা প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আগের কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত বেশ কয়েকটি সংস্কার শর্ত বর্তমান বাস্তবতায় সরকারের পক্ষে দ্রুত বাস্তবায়ন করা কঠিন।
তবে নতুন কর্মসূচিতে আইএমএফ এসব গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার পুরোপুরি বাদ দেবে না; বরং বাস্তবায়নের সময়সীমা বাড়িয়ে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়নের সুযোগ দিতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংস্কার, ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত পরিবর্তন এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারকে আরও নমনীয় করার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
চলতি মাসের শুরুতে দেওয়া এক বিবৃতিতে আইএমএফের মিশন প্রধান ইভো ক্রজনার বলেন, বাংলাদেশের নতুন সরকারের সংস্কার এজেন্ডা ও নীতিগত অগ্রাধিকার বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণে কাজ করছে সংস্থাটি।
তিনি আরও জানান, সম্ভাব্য নতুন চুক্তি বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট), একটি বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার কর্মসূচি এবং আইএমএফের নিজস্ব নীতিমালা ও নির্বাহী বোর্ডের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করবে।
আইএমএফও স্বীকার করেছে যে, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ঋণ অনুমোদনের সময়কার তুলনায় বর্তমানে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। ফলে সরকারকে এখন আরও জটিল অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, নিম্ন রাজস্ব আহরণ, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং আর্থিক খাতের কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধানে একটি টেকসই ও নবায়নকৃত সংস্কার কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করছে আইএমএফ।
প্রসঙ্গত, কোভিড-১৯ পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ এবং রিজার্ভের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন সরকার আইএমএফের কাছে ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা চায়, যা পরে ৮০০ মিলিয়ন ডলার বাড়িয়ে মোট ৫.৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসের মধ্যে সাতটি কিস্তিতে ঋণের অর্থ ছাড় হওয়ার কথা ছিল। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রায় ৩.৫৯৫ বিলিয়ন ডলার গ্রহণ করেছে।
তবে পরিবর্তিত বাস্তবতায় বকেয়া কিস্তির ওপর নির্ভর না করে, নতুন অংশীদারত্ব ও সংস্কারভিত্তিক কর্মসূচির মাধ্যমে অর্থনীতির বিদ্যমান সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পথ খুঁজছে বর্তমান সরকার।














