কক্সবাংলা ডটকম(২৪ জুন) :: দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে একের পর এক পরিচয়হীন, অর্ধগলিত ও রহস্যজনক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—এগুলো কি কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি হত্যার প্রমাণ গোপন করতে অপরাধীরা পরিকল্পিতভাবে নদীকে ‘নিরাপদ ডাম্পিং গ্রাউন্ড’ হিসেবে ব্যবহার করছে?
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এমন কয়েকটি ঘটনা সামনে এসেছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে তুলেছে।
শনিবার (২০ জুন) নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার মেঘনা নদীর একটি শাখা, স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘মরা গাং’ থেকে হাত-পা ও কোমরে বস্তা বাঁধা অবস্থায় এক অজ্ঞাত ব্যক্তির অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতের বয়স আনুমানিক ৩৫ বছর। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ছয় থেকে সাত দিন আগে তাকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
একই দিনে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার নলজুর নদী থেকে উদ্ধার করা হয় এক অজ্ঞাত নারীর ভাসমান মরদেহ। তার মৃত্যুর কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এর আগে, গত ২৯ মে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার ফুলদী নদী থেকে এক তরুণীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে তদন্তে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) জানতে পারে, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে ওই তরুণীকে হত্যা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তিন মাসে ১৪৬ মরদেহ উদ্ধার
নৌ-পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মাত্র তিন মাসেই দেশের বিভিন্ন নদী থেকে ১৪৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১২ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হলেও ৩৪ জনের পরিচয় এখনও অজানা রয়ে গেছে।
শনাক্ত হওয়া ঘটনাগুলোর মধ্যে এ পর্যন্ত আটটি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, গত পাঁচ বছরে দেশের নদ-নদী থেকে নারী ও শিশুসহ মোট ২ হাজার ৬৪টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৩৫টি হত্যা মামলা এবং নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার ঘটনায় ২৫টি মামলা হয়েছে। বাকি ঘটনাগুলো নৌ-দুর্ঘটনা, গোসল করতে গিয়ে ডুবে মৃত্যু, মাছ ধরার সময় দুর্ঘটনা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত কারণে ঘটেছে।
তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো পরিচয় শনাক্তকরণ। পাঁচ বছরে উদ্ধার হওয়া মরদেহের মধ্যে ৬৩৯ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরে এসব মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে।
কেন নদীকে বেছে নিচ্ছে অপরাধীরা?
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, নদীতে মরদেহ ফেলে দেওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য হলো অপরাধের প্রমাণ নষ্ট করা এবং তদন্তকে জটিল করে তোলা।
নৌ-পুলিশ প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন, নদী থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহ সংক্রান্ত হত্যা মামলাগুলোর তদন্তে ব্যক্তিগত বিরোধ, পারিবারিক কলহ, পরকীয়া, মাদক ব্যবসা ও সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্বের বিষয়গুলো সামনে এসেছে। তার দাবি, এসব হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৬৫ শতাংশের রহস্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে নৌ-পুলিশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পানিতে দীর্ঘ সময় থাকার ফলে মরদেহে পচন ধরে, আঙুলের ছাপ নষ্ট হয়ে যায় এবং মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে পড়ে। এতে পরিচয় শনাক্ত করা যেমন কঠিন হয়ে যায়, তেমনি হত্যার ধরন বা গুরুত্বপূর্ণ আলামতও অনেক ক্ষেত্রে মুছে যায়।
‘লাশ আকাশ থেকে পড়ে না’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, অপরাধীরা খুব সচেতনভাবেই নদীকে ব্যবহার করছে। তারা জানে, পরিচয় শনাক্ত করা না গেলে মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
তার মতে, গভীর রাতে বাস, ট্রাক কিংবা অন্যান্য যানবাহনে করে মরদেহ এনে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। নদীর পাড়, সেতু, ফেরিঘাট ও নির্জন এলাকাগুলোতে নজরদারি দুর্বল থাকায় অপরাধীরা সুযোগ পাচ্ছে।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম বলেন, শুধু পারিবারিক বা ব্যক্তিগত বিরোধ নয়, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আধিপত্য বিস্তার এবং অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার লড়াইও অনেক সময় এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে কাজ করে।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে ভাড়াটে খুনি ব্যবহার করে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়, যাতে অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা আড়াল করা যায়।
তদন্তে সবচেয়ে বড় বাধা শনাক্তকরণ
নৌ-পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মৃত ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করা।
অনেক সময় মরদেহ এতটাই বিকৃত হয়ে যায় যে আঙুলের ছাপ, মুখমণ্ডল কিংবা শরীরের আঘাতের চিহ্ন শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। কখনও কখনও শুধু কঙ্কাল উদ্ধার হয়। ফলে ময়নাতদন্তে মৃত্যুর কারণ জানা গেলেও তদন্ত অনেক দূর এগোতে পারে না।
গত পাঁচ বছরে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলাগুলোর মধ্যে ১২১টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। ৫৬টি মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। এখনও ১৩২টি হত্যা মামলা তদন্তাধীন রয়েছে এবং আরও ২৬টি মামলা তদন্ত করছে অন্যান্য সংস্থা।
সমন্বিত নজরদারির তাগিদ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু হত্যাকাণ্ডের পর তদন্ত জোরদার করলেই হবে না; প্রয়োজন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ।
তাদের মতে, যেসব সেতু, ঘাট, ফেরিঘাট ও নির্জন নদীপাড় দিয়ে বেশি মরদেহ ফেলা হচ্ছে, সেগুলো চিহ্নিত করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার ম্যাপিং করতে হবে। পাশাপাশি নদীসংলগ্ন এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা, নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ও রাতের বিশেষ নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
এ ছাড়া পুলিশ, নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা, সন্দেহজনক নৌযান পর্যবেক্ষণ এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের জাতীয় তথ্যভান্ডারের সঙ্গে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ডিএনএ ডাটাবেজের সমন্বয় ঘটানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, “এসব লাশ আকাশ থেকে পড়ে না। কোথাও না কোথাও হত্যা সংঘটিত হচ্ছে, তারপর পরিকল্পিতভাবে নদীতে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। তাই শুধু মরদেহ উদ্ধারের পর নয়, অপরাধ সংঘটনের আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।”
তাদের মতে, নদীকে অপরাধীদের ‘নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ হতে দেওয়া যাবে না। অন্যথায় দেশের নদ-নদীগুলো ধীরে ধীরে অপরাধ গোপনের সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।














