মঙ্গলবার ৩০ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লাভ কমায় কমতে পারে চাল উৎপাদন

🗓 মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

👁️ ২১ বার দেখা হয়েছে

🗓 মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

👁️ ২১ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(৩০ জুন) :: আবহাওয়াজনিত অনিশ্চয়তা এবং কৃষকের লাভ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে ধান-চাল উৎপাদন কমতে পারে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)।

সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে চাল উৎপাদন দশমিক ৫ শতাংশ বা দুই লাখ টন কমতে পারে। একই সময়ে ধান, গম, ভুট্টা প্রভৃতি শস্য উৎপাদন কমতে পারে তিন লাখ টন বা দশমিক ৬২ শতাংশ।

চলতি জুনে প্রকাশিত ফুড আউটলুক ও বৈশ্বিক খাদ্যবাজার নিয়ে এফএও প্রকাশিত অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। তবে উৎপাদন কমার পূর্বাভাস থাকলেও শস্য আমদানি কমতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি বোরো মৌসুমে আকস্মিক বন্যায় দুই লাখ টনের বেশি ধান নষ্ট হয়েছে। আগামী অর্থবছরে উৎপাদন কমলে তাৎক্ষণিকভাবে খাদ্যনিরাপত্তায় বড় ঝুঁকি তৈরি না হলেও আমদানিনির্ভরতা বাড়তে পারে। এতে দেশে মূল্যবৃদ্ধি ও বাজার অস্থিতিশীল হতে পারে।

এফএওর সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ মৌসুমে বৈশ্বিক ধান উৎপাদন কমতে পারে। এর প্রধান কারণ সম্ভাব্য এল নিনোর প্রভাবে আবহাওয়াজনিত অনিশ্চয়তা, উৎপাদক পর্যায়ে ধানের দাম কমে যাওয়া এবং উৎপাদন উপকরণের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কৃষকের লাভ কমে যাওয়া। এসব কারণে ২০২৬-২৭ মৌসুমে বিশ্বে চাল উৎপাদন আগের মৌসুমের তুলনায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমতে পারে। সম্ভাব্য এ উৎপাদন কমার বড় অংশই এশিয়ায় হতে পারে।

এফএওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে ৪ কোটি ১৫ লাখ টন চাল উৎপাদন হতে পারে। যদিও এ অর্থবছরের চূড়ান্ত উৎপাদনের হিসাব এখনো প্রকাশিত হয়নি। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে উৎপাদন কমে ৪ কোটি ১৩ লাখ টনে নেমে আসতে পারে। সেক্ষেত্রে চলতি অর্থবছরের তুলনায় উৎপাদন দুই লাখ টন বা দশমিক ৫ শতাংশ কম হবে।

একই সঙ্গে এফএও বলছে, আগামী অর্থবছরে বৈশ্বিক চাল উৎপাদন ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমতে পারে। দেশভিত্তিক হিসাবে ভারতে উৎপাদন কমতে পারে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ব্রাজিলে ১২ দশমিক ৯, যুক্তরাষ্ট্রে ১৫ দশমিক ২, থাইল্যান্ডে ৬ দশমিক ১, জাপানে দশমিক ৮, নাইজেরিয়ায় ৫ দশমিক ৬, কম্বোডিয়ায় ২ দশমিক ৮ ও মিয়ানমারে দশমিক ৯ শতাংশ কমতে পারে। তবে চীনে দশমিক ৩ শতাংশ, পাকিস্তানে ২ দশমিক ৯ ও ভিয়েতনামে দশমিক ২ শতাংশ উৎপাদন বাড়তে পারে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় সার ও তেলের দাম বেড়েছে। দুটো উপকরণই কৃষি উৎপাদনের জন্য খুবই জরুরি। আরেকটি হলো বাংলাদেশে জলবায়ুর অভিঘাত অনেক বেশি। এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, এটাই অবধারিত। উৎপাদন ব্যয় যখন বাড়ে, তখন উপকরণের প্রয়োগ কমে যায় এবং কৃষক উৎপাদন খরচ বাড়বে বলে জমির চাষ কমিয়ে দেন।

এমন পরিস্থিতিতে আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশে উৎপাদন কমার যে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে, সেটি অযৌক্তিক নয়।’ উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যনিরাপত্তায় সংকটের পাশাপাশি আমদানি বাড়বে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘যেহেতু বৈশ্বিকভাবে উৎপাদন কমার কথা বলা হচ্ছে, ফলে দামও বাড়বে। আমদানি পণ্যের দাম বাড়লে দেশের বাজারেও দাম বাড়বে এবং খাদ্যমূল্যস্ফীতি তৈরি হবে।’

তবে এশিয়ায় এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবেলায় কিছুটা সহায়ক অবস্থাও রয়েছে বলে মনে করছে এফএও। সংস্থাটি বলছে, আবহাওয়াজনিত উদ্বেগ থাকলেও গত কয়েক মৌসুমে ভালো বৃষ্টিপাত হওয়ায় এ অঞ্চলের জলাধারগুলোতে পর্যাপ্ত পানি সঞ্চিত রয়েছে। ফলে সম্ভাব্য এল নিনোর কারণে উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকালে প্রয়োজনের তুলনায় কম ও অসম বৃষ্টিপাত হলেও প্রধান মৌসুমের ধানখেত শুষ্ক আবহাওয়া মোকাবেলায় তুলনামূলকভাবে সক্ষম হতে পারে।

ধান উৎপাদনে কৃষকের ব্যয়ের তুলনায় আয় কম বলে মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, বোরো ধান উৎপাদনে কৃষকের মুনাফা ঋণাত্মক। অর্থাৎ তারা উৎপাদনের জন্য যে পরিমাণ ব্যয় করেন, ধান বিক্রি করে তার চেয়ে কম টাকা পান।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে বোরো ধান উৎপাদন ব্যয়ের সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এক কেজি রোপা বোরো (হাইব্রিড) ধান উৎপাদনে কৃষকের ব্যয় হয়েছিল ২৪ টাকা ৩১ পয়সা।

বিপরীতে কৃষক প্রতি কেজি ধান বিক্রি করেছেন গড়ে ২৭ টাকা ৪৯ পয়সায়। অর্থাৎ এক মণ ধান উৎপাদনে যেখানে ব্যয় ৯৭২ টাকা, সেখানে বিক্রি প্রায় ১ হাজার ১০০ টাকা। তবে খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বাস্তবে এ হিসাবের তুলনায় কৃষকের ব্যয় আরো বেশি।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের জেরে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এতে সেচ, পরিবহন, মাড়াই থেকে শুরু করে সবকিছুর খরচ বেড়েছে। ফলে এবার ধান উৎপাদন ব্যয় আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জলবায়ুর অভিঘাতে ভুগছে দেশের কৃষি। এর সঙ্গে উপকরণ ব্যয় বাড়ায় কৃষকের মুনাফা কমেছে। এতে তারা উচ্চ লাভজনক ফলসহ বিভিন্ন ধরনের চাষে ঝুঁকছেন। এখানে নীতিসহায়তা, ভর্তুকি ও উপকরণের মূল্য কমাতে হবে। না হলে কৃষক ধান চাষে নিরুৎসাহিত হবেন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বোরো চাষে কৃষকের ব্যয়ের তুলনায় আয় ঋণাত্মক। এখন কৃষক শুধু খাওয়ার জন্য চাষ করেন না। তারা মুনাফাও খোঁজেন। লাভ না হলে তারা ধান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন, এটাই স্বাভাবিক।’

কৃষকরা ধীরে ধীরে ধান চাষ কমিয়ে অন্যান্য ফসল চাষে ঝুঁকছেন জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘ধান আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য। এটির চাষাবাদ কমে গেলে খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে। সেজন্য উৎপাদন ব্যয় কমাতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে।’

তবে বৈশ্বিকভাবে ধান উৎপাদন কমার পূর্বাভাস থাকলেও বাংলাদেশে কমবে না বলে মনে করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম। তিনি  বলেন, ‘আমাদের প্রধান শস্য ধান। কৃষক ধান চাষ কমাবেন বা ছেড়ে দেবেন বলে আমার মনে হয় না। ধান চাষ অব্যাহত রেখেই অন্যান্য ফসল আবাদ বাড়াতে কৃষকদের উৎসাহিত করছি।

এবারো বোরো মৌসুমে উৎপাদন বেড়েছে। অন্য বছর যেখানে প্রায় ২ কোটি ১৫ লাখ টন উৎপাদন হতো, এবার সেখানে হয়েছে ২ কোটি ২৭ লাখ টন। হাওরে ৪৯ হাজার হেক্টর জমির বোরো নষ্ট হওয়ার পরও উৎপাদন বেড়েছে। অর্থাৎ আমাদের উৎপাদনশীলতা বেড়েছে।’

এই বিভাগ এর আরো খবর

লাভ কমায় কমতে পারে চাল উৎপাদন

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর