শনিবার ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৪ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঋণ কর্মসূচি ও অর্থনৈতিক সংস্কার মূল্যায়নে ১২ জুলাই ঢাকায় আসছে আইএমএফ

🗓 শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

👁️ ৭৬ বার দেখা হয়েছে

🗓 শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

👁️ ৭৬ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(১১ জুলাই) :: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আগামী ১২ থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত পাঁচ দিনের সফরে বাংলাদেশে অবস্থান করবে।

দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, চলমান সংস্কার কার্যক্রম এবং সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য এ সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিনিধিদল সফরকালে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), পরিকল্পনা কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করবে।

বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা, রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা, বাজেট বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং নতুন ঋণ কর্মসূচির সম্ভাব্য কাঠামো নিয়ে আলোচনা হবে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি নিয়মিত সফর নয়; বরং বাংলাদেশ ও আইএমএফের মধ্যকার ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ একটি মূল্যায়ন মিশন।

কারণ, নতুন সরকার ইতোমধ্যে আইএমএফকে জানিয়েছে যে আগের ঋণ কর্মসূচির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। ফলে নতুন বাস্তবতার আলোকে তিন বছরের একটি নতুন ঋণ কর্মসূচির বিষয়ে আলোচনা শুরু করতে আগ্রহী সরকার।

সংস্কার বাস্তবায়নের অগ্রগতি হবে মূল বিবেচ্য

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা ড. আহসান এইচ মনসুরের মতে, এবারের সফরে আইএমএফের প্রধান আগ্রহ থাকবে সরকার অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নে কতটা আন্তরিক এবং প্রস্তুত, তা সরেজমিনে মূল্যায়ন করা।

তিনি বলেন, আগের কর্মসূচির অধীনে নির্ধারিত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রত্যাশিত গতিতে বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষ করে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, এনবিআর সংস্কার, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার কার্যকর করা, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলোতে দৃশ্যমান অগ্রগতির ঘাটতি ছিল। ফলে নতুন কোনো ঋণ কর্মসূচির আগে এসব বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ দেখতে চাইবে আইএমএফ।

আটকে আছে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ

২০২৩ সালে বাংলাদেশ আইএমএফের কাছ থেকে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি গ্রহণ করে, যা পরে বৃদ্ধি পেয়ে ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। এ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ছাড় হয়েছে। তবে সংস্কার বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে দীর্ঘদিন ধরে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড় স্থগিত রয়েছে।

আইএমএফের পর্যবেক্ষণে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, জ্বালানি মূল্য নির্ধারণে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু, বৈদেশিক মুদ্রার বাজার উদারীকরণ এবং ব্যাংকিং খাতে কাঠামোগত সংস্কার যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হওয়াই এ বিলম্বের অন্যতম কারণ।

নবম জাতীয় পে-স্কেলও আলোচনায়

এবারের সফরের অন্যতম আলোচিত বিষয় হতে পারে সরকারের ঘোষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল। সরকারের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরেই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রয়োজন হবে। পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের পর প্রতিবছর সরকারি ব্যয় এক লাখ ৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি বাড়তে পারে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই বিপুল অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে, সরকার নতুন কর আরোপ করবে নাকি ঋণনির্ভরতা বাড়াবে, বাজেট ঘাটতির ওপর এর প্রভাব কী হবে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি কতটা—এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইতে পারে আইএমএফ।

রাজস্ব সংস্কারে বাড়তি চাপ

দীর্ঘদিন ধরেই আইএমএফ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক দুর্বলতা হিসেবে কম রাজস্ব আহরণের বিষয়টি তুলে ধরছে। বর্তমানে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।

ফলে নতুন কর্মসূচিতে কর অব্যাহতি কমানো, করের আওতা সম্প্রসারণ, ভ্যাট ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, এনবিআরের ডিজিটাল রূপান্তর, কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর ফাঁকি রোধে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

তাদের মতে, নিজস্ব রাজস্ব বৃদ্ধি ছাড়া উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং সরকারি বেতন-ভাতা নির্বাহে সরকারের ঋণনির্ভরতা আরও বাড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

ব্যাংকিং খাতে সুশাসন চায় আইএমএফ

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকের আর্থিক সংকট, পরিচালনা পর্ষদের দুর্বলতা এবং মূলধন ঘাটতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে আইএমএফ।

প্রতিনিধিদল এবার ব্যাংক পুনর্গঠন পরিকল্পনা, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংস্কার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে। নতুন সরকার ইতোমধ্যে ব্যাংক খাত সংস্কারের ঘোষণা দিলেও বাস্তবায়নের অগ্রগতি কতদূর হয়েছে, সেটিই হবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

রিজার্ভ, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ

বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের তুলনায় কিছুটা স্থিতিশীল হলেও অর্থনীতিবিদদের মতে, এর একটি বড় কারণ আমদানি ব্যয়ের নিয়ন্ত্রণ। ভবিষ্যতে শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়লে আমদানি বৃদ্ধি পাবে এবং তখন রিজার্ভের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

এ কারণে আইএমএফ এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো দেখতে চায়, যেখানে রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে রিজার্ভ টেকসইভাবে শক্তিশালী হবে।

এছাড়া উচ্চ বাজেট ঘাটতি, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বাড়তি চাপ, এলডিসি উত্তরণের পর সহজ শর্তের ঋণ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা, বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির চ্যালেঞ্জও আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।

ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নীতির দিকনির্দেশনা

অর্থনীতিবিদদের মতে, ১২-১৬ জুলাইয়ের এই সফর শুধু নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা নয়; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নীতি, রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংস্কারের রূপরেখা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রতিনিধিদলের মূল্যায়ন ইতিবাচক হলে পরবর্তী ধাপে পূর্ণাঙ্গ ঋণ আলোচনা শুরু হবে এবং নতুন ঋণের পরিমাণ, অর্থ ছাড়ের সময়সূচি ও সংস্কারের শর্তাবলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এগোবে। তবে সংস্কারে অগ্রগতি সন্তোষজনক না হলে নতুন কর্মসূচির অনুমোদন বিলম্বিত হতে পারে কিংবা আরও কঠোর শর্ত আরোপ করা হতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে আইএমএফের এই সফর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক আস্থার পুনর্গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এই বিভাগ এর আরো খবর

কৃষিপণ্যে বছরে ক্ষতি ২৯ হাজার কোটি

শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

ডাইনোসরের বিলুপ্ত হয়েছিল যেভাবে

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর