শুক্রবার ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১১ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লবণের উৎপাদনে বড় ঘাটতি, বাড়ছে দাম : দেড় লাখ টন আমদানির উদ্যোগ

🗓 শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

👁️ ১৫ বার দেখা হয়েছে

🗓 শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

👁️ ১৫ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা রিপোর্ট :: দেশে লবণ উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ২৭ লাখ ১৫ হাজার টন লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।

বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৯ লাখ ৪৪ হাজার ৯২৬ টন। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উৎপাদন কম হয়েছে ৭ লাখ ৭০ হাজার ৭৪ টন।

উৎপাদনের এ ঘাটতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কমে আসা মজুদ ও ভোজ্য লবণের পাশাপাশি শিল্প খাতে বাড়তি চাহিদা। ফলে নতুন মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই দেশে লবণের সরবরাহ নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। এর প্রভাব পড়েছে বাজারেও।

এক বছরের ব্যবধানে পাইকারি পর্যায়ে অপরিশোধিত লবণের দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। পরিস্থিতি সামাল দিতে দেড় লাখ টন লবণ আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে বিসিকের লবণ সেল।

বিসিকের সর্বশেষ উৎপাদন, সরবরাহ, মজুদ ও বাজারদর-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি মণ (৪০ কেজি) অপরিশোধিত লবণের দাম ৩৮০ টাকা।

গত বছরের একই সময়ে এ দাম ছিল ২৫৩ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে প্রতি মণে দাম বেড়েছে ১২৭ টাকা বা প্রায় ৫০ শতাংশ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এরই মধ্যে বাজারে দাম আরও বেড়ে প্রতি মণ ৪০০ টাকায় উঠেছে।

কক্সবাজারের ইসলামপুর লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি শামসুল আলম আজাদ বলেন, ‘দেশে লবণের চাহিদা ও ঘাটতি অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।

এ কারণেই বাজারে দাম বাড়ছে। নতুন মৌসুম শুরুর আগে আমদানি প্রক্রিয়া শেষ না হলে বাজারে আরও চাপ তৈরি হতে পারে।’

লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উৎপাদন কম ৭ লাখ ৭০ হাজার টন

সর্বশেষ মৌসুমে দেশে ২৭ লাখ ১৫ হাজার টন লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৯ লাখ ৪৪ হাজার ৯২৬ টন। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার মাত্র প্রায় ৭২ শতাংশ পূরণ হয়েছে।

এর আগে কয়েক বছর দেশে লবণ উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছিল। ২০২৩-২৪ মৌসুমে রেকর্ড ২৪ লাখ ৩৮ হাজার টন লবণ উৎপাদন হয়েছিল।

পরের মৌসুমে উৎপাদন কমে ২২ লাখ ৫৫ হাজার টনে নামে। সর্বশেষ মৌসুমে তা আরও কমে ১৯ লাখ ৪৪ হাজার টনে নেমেছে। মাত্র দুই মৌসুমের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৫ লাখ টন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, শিল্পকারখানার সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন শিল্পে লবণের ব্যবহার বাড়ায় সামগ্রিক চাহিদার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে।

বৈরী আবহাওয়ায় নষ্ট হয়েছে উৎপাদনের সময়

সংশ্লিষ্টদের মতে, সর্বশেষ মৌসুমে উৎপাদন কমার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল বৈরী আবহাওয়া। ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর লবণ উৎপাদন শুরু হয়ে ২০২৬ সালের ২৫ মে পর্যন্ত চলে। প্রায় ১৯৪ দিনের এ মৌসুমে কুয়াশা, বৃষ্টি ও অন্যান্য প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ দিন মাঠে নামতে পারেননি চাষীরা।

লবণ উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়াই আবহাওয়নির্ভর হওয়ায় কয়েক দিন বৃষ্টি বা মেঘলা আবহাওয়া থাকলেও মাঠে উৎপাদন ব্যাহত হয়। এতে একদিকে উৎপাদনের সময় কমে যায়, অন্যদিকে অনেক মাঠে প্রস্তুত করা লবণও নষ্ট হয়। ফলে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন অর্জন করা সম্ভব হয়নি।

এ ছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোয় লবণ চাষের জমি বৃদ্ধির হারও কমে এসেছে। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, শ্রমিক ও জ্বালানি ব্যয় এবং আবহাওয়ার অনিশ্চয়তাও চাষিদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

মজুদও দ্রুত কমছে

বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বর্তমানে যে মজুদ রয়েছে, সেটিও দ্রুত কমে আসছে। ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে নতুন ও পুরনো মিলিয়ে লবণের মজুদ ছিল ৫ লাখ ৯৬ হাজার ১৮৪ টন। এর মধ্যে ৩৫ হাজার ১৫০ টন ছিল পরিবহনরত। ফলে সরাসরি ব্যবহারযোগ্য মজুদের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫ লাখ ৬১ হাজার টন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন মৌসুমে উৎপাদন শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত এ মজুদ দিয়ে দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করা কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে শিল্প খাতে লবণের চাহিদা অব্যাহত থাকলে মজুদের ওপর চাপ আরও বাড়বে।

আমদানির উদ্যোগ

এ অবস্থায় সম্ভাব্য সরবরাহ ঘাটতি মোকাবেলায় দেড় লাখ টন লবণ আমদানির অনুমোদন চেয়েছে বিসিকের লবণ সেল। এ বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

বিসিকের মহাব্যবস্থাপক ও লবণ সেলের প্রধান সরোয়ার আলম বলেন, ‘দেশের চাহিদা মূলত স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমেই মেটানো হয়। এবার ধারাবাহিকভাবে দাম বাড়ায় আমদানি ছাড়া উপায় নেই। ঘাটতি বেশি হলেও নতুন মৌসুম আসার আগে সীমিত আকারে লবণ আমদানির চেষ্টা করা হচ্ছে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও চাপ তৈরি হতে পারে। তবে আমদানির পাশাপাশি নতুন মৌসুমে উৎপাদন বাড়ানোও জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

বছরে চাহিদা ২২-২৫ লাখ টন

দেশে বছরে আনুমানিক ২২ থেকে ২৫ লাখ টন লবণের চাহিদা রয়েছে। অপরিশোধিত লবণ পরিশোধন ও আয়োডিনযুক্ত করার সময় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি তৈরি হয়। ফলে মাঠ পর্যায়ে উৎপাদিত লবণের পুরোটা সরাসরি বাজারে ভোজ্য লবণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।

দেশে আয়োডিনযুক্ত ভোজ্য লবণের বার্ষিক চাহিদাই ৮ লাখ টনের বেশি। এর বাইরে বিভিন্ন শিল্পে বিপুল পরিমাণ লবণ ব্যবহার হয়। বিশেষ করে টেক্সটাইল, চামড়া, রাসায়নিক ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন শিল্পে লবণের ব্যবহার রয়েছে।

ফলে ভোজ্য লবণের বাজারের পাশাপাশি শিল্প খাতের চাহিদাও দেশের সামগ্রিক লবণ সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।

উৎপাদনের মূল কেন্দ্র কক্সবাজার

বাংলাদেশে লবণ উৎপাদন মূলত কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকায় কেন্দ্রীভূত। সর্বশেষ মৌসুমে ৬৭ হাজার ৭৫৭ একর জমিতে প্রায় ৪০ হাজার ১৫০ জন চাষী লবণ উৎপাদন করেছেন।

কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চল দেশের লবণ উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র হওয়ায় এখানকার আবহাওয়া, চাষের জমি, উৎপাদন খরচ ও বাজারব্যবস্থা সরাসরি জাতীয় লবণ সরবরাহের ওপর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে মৌসুমের শুরু ও শেষের দিকে বৃষ্টি হলে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।

বাড়ছে খুচরা বাজারেও চাপ

উৎপাদন কমে যাওয়া, মজুদ হ্রাস এবং চাহিদা বৃদ্ধির প্রভাবে ইতোমধ্যে বাজারে দাম বাড়তে শুরু করেছে। ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, খোলা ও নন-ব্র্যান্ডেড লবণের দাম কেজিতে সর্বোচ্চ ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, নতুন মৌসুমে উৎপাদন শুরু হওয়ার আগে মজুদ আরও কমে গেলে পাইকারি ও খুচরা উভয় বাজারেই দামের ওপর চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে শিল্প খাতের চাহিদা অব্যাহত থাকলে ভোজ্য লবণের সরবরাহেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত আমদানির অনুমোদন, বিদ্যমান মজুদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং নতুন মৌসুমে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ একসঙ্গে নিতে হবে। তা না হলে উৎপাদন ঘাটতি ও বাড়তি চাহিদার কারণে লবণের বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।

এই বিভাগ এর আরো খবর

আইনজীবী সহকারী পরিষদ, উখিয়া’র আত্মপ্রকাশ

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর