শুক্রবার ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১১ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ধান-চাল সংগ্রহে মিলার নির্ভরতা, নানা শর্ত ও প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্যে সরকারি দামের সুবিধা থেকে বঞ্চিত ক্ষুদ্র কৃষক

🗓 শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

👁️ ১৩ বার দেখা হয়েছে

🗓 শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

👁️ ১৩ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(১১ সেপ্টেম্বর) :: দেশে কৃষক পরিবারের সংখ্যা ১ কোটি ৬৮ লাখ ৮১ হাজার ৭৫৭টি। অথচ সরকারি গুদামে ধান বিক্রির জন্য নিবন্ধিত কৃষকের সংখ্যা মাত্র ১০ লাখ ৬৭ হাজার ৬০৩। অর্থাৎ দেশের বিপুলসংখ্যক কৃষক সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থার বাইরে। এর বিপরীতে সরকারি সংগ্রহে চাল সরবরাহের জন্য নিবন্ধিত মিল রয়েছে ৬ হাজার ৩০১টি।

সরকার ধান ও চাল—দুই-ই সংগ্রহ করলেও সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহের বড় অংশই চালকল মালিকদের মাধ্যমে হয়ে থাকে। ফলে সরকার নির্ধারিত দামের সুবিধা সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছানোর বদলে সরবরাহ ব্যবস্থার পরবর্তী স্তরে চলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ধানের আর্দ্রতা, মান, পরিবহন, নিবন্ধন ও অন্যান্য প্রক্রিয়াগত শর্তের কারণে অনেক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক সরকারি গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ পেয়েও শেষ পর্যন্ত স্থানীয় বাজারেই তা বিক্রি করছেন।

সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব, কৃষকের তালিকা ও কোটায় অনিয়ম, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং মিলারদের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসব অভিযোগ ব্যাপকভাবে আলোচনায় এলেও পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলেও বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের অভিযোগ পুরোপুরি দূর হয়নি। চলতি বোরো মৌসুমেও ময়মনসিংহ, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ ও জামালপুরসহ বিভিন্ন জেলায় ধান সংগ্রহে অনিয়মের অভিযোগ করেছেন কৃষকরা।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ধান-চাল সংগ্রহের বর্তমান নীতিতেই বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে। সরকার তুলনামূলকভাবে অল্প ধান কেনে, অথচ চাল সংগ্রহের পরিমাণ অনেক বেশি। চালের বড় অংশই মিলারদের কাছ থেকে নেওয়া হয়। ফলে প্রকৃত কৃষক সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। তাঁর মতে, কৃষকের সুবিধা নিশ্চিত করতে হলে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার পরিমাণ বাড়াতে হবে। মোট উৎপাদনের অন্তত ১০ থেকে ২০ শতাংশ সরকারি ব্যবস্থায় কেনার পরামর্শও দেন তিনি।

বর্তমান ব্যবস্থায় সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে কৃষককে ‘কৃষকের অ্যাপ’ বা খাদ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে মোবাইল নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য দিয়ে নিবন্ধন করতে হয়। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার অনুমোদনের পর ধান বিক্রির আবেদন করা যায়। যাচাই-বাছাই শেষে লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন করা হয় এবং নির্বাচিত কৃষক নির্দিষ্ট কোটায় ধান সরবরাহের সুযোগ পান। ফলে নিবন্ধন ও আবেদন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে ধান সরবরাহ পর্যন্ত একাধিক ধাপ অতিক্রম করতে হয় কৃষককে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও কৃষকবান্ধব করতে ডিজিটাল ব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহার প্রয়োজন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলামের মতে, আর্দ্রতার শর্ত, লালফিতার দৌরাত্ম্য এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবের কারণে কৃষক সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থায় যেতে নিরুৎসাহিত হন। পশ্চিমবঙ্গের ই-প্যাডি কর্মসূচির মতো ডিজিটাল উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য কার্যকর উদাহরণ হতে পারে।

সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থায় কৃষকের প্রান্তিক অবস্থানের চিত্র বিভিন্ন গবেষণাতেও উঠে এসেছে। ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক সরকারি ধান সংগ্রহ ব্যবস্থায় তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকেন। স্থানীয় রাজনৈতিক এলিটদের প্রভাব, কৃষক বাছাইয়ে অনিয়ম, অতিরিক্ত ধান নেওয়া, দুর্নীতি ও অর্থ পরিশোধের জটিলতার অভিযোগও রয়েছে। শিক্ষিত হওয়া, সরকারি সংগ্রহ সম্পর্কে তথ্য জানা, সংগ্রহ কার্ড থাকা এবং সংগ্রহকেন্দ্রের কাছাকাছি বসবাসের মতো বিষয়ও সরকারি কর্মসূচিতে কৃষকের অংশগ্রহণের সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করে।

ধানের আর্দ্রতা নিয়েও বড় সমস্যা রয়েছে। কৃষক সাধারণত ধান কাটার পরপরই বিক্রি করতে চান। অন্যদিকে সরকারি গুদামে ধান সরবরাহের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আর্দ্রতার মাত্রা বজায় রাখার শর্ত রয়েছে। ফলে অনেক কৃষকের ধান মানদণ্ডে না পড়ায় তা ফেরত দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এ সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে শুকিয়ে পরে কৃষকের কার্ড ব্যবহার করে সরকারি গুদামে সরবরাহের চেষ্টা করেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।

খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) গবেষণাতেও সরকারি ধান সংগ্রহের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা উঠে এসেছে। সরকারি সংগ্রহকেন্দ্রে বেসরকারি বাজারের তুলনায় কম সুবিধা, আর্দ্রতা ও চিটা ধানের কঠোর মানদণ্ড, ধান শুকানো ও পরিষ্কারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা, পরিবহন ও সড়ক যোগাযোগের দুর্বলতা, সংগ্রহকেন্দ্রের স্বল্পতা এবং অর্থপ্রাপ্তির জটিলতাকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করা কৃষকদের ১৮ শতাংশ অনিয়মের অভিযোগ করেছেন। অতিরিক্ত ওজন নেওয়া এবং অনানুষ্ঠানিক খরচ দাবির অভিযোগও রয়েছে।

সরকারি সংগ্রহের পরিমাণও মোট উৎপাদনের তুলনায় কম। চলতি বোরো মৌসুমে ২ কোটি ২৬ লাখ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ধান সংগ্রহের লক্ষ্য ছিল পাঁচ লাখ টন। পরে লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে এখন পর্যন্ত ৫ লাখ ৭৮ হাজার ১৪০ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। একই সময়ে সেদ্ধ চাল সংগ্রহ হয়েছে ১২ লাখ ১ হাজার ৫৬৮ টন এবং আতপ চাল ১ লাখ ৫ হাজার ৩১৩ টন।

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ধান সংগ্রহে আর্দ্রতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের নিজস্ব শুকানোর ব্যবস্থা না থাকায় নির্দিষ্ট মান বজায় রাখা প্রয়োজন। তবে কৃষকরা অনেক সময় ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গেই, এমনকি জমিতে মাড়াইয়ের সময়ও বিক্রি করে দেন। এ কারণে সরকারি সংগ্রহে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকলেও অনেক কৃষক সেখানে আসেন না।

কৃষকের সুবিধা বাড়াতে মৌসুমের এক-দুই মাস পর ধান কেনার একটি নীতিগত উদ্যোগ নিয়ে সরকার আলোচনা করছে বলেও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কৃষক ধান শুকিয়ে গোলায় সংরক্ষণ করলে আর্দ্রতা সাধারণত ১৪ শতাংশের ওপরে থাকে না। ওই সময়ে ইউনিয়ন বা বড় বাজার এলাকায় আগাম ঘোষণা দিয়ে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এতে কৃষক যেমন ন্যায্যমূল্যের সুবিধা পাবেন, তেমনি সরকারের সংগ্রহ ব্যবস্থাও আরও কার্যকর হতে পারে।

ইন্টিগ্রেটেড ফুড পলিসি অ্যান্ড রিসার্চ প্রোগ্রামের (আইএফপিআরপি) ২০২০ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মাত্র ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ কৃষক সরকারের কাছে ধান বিক্রির সুযোগ পান। সে সময়ও কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান-চাল কেনার সুপারিশ করা হয়েছিল।

এফপিএমইউর সুপারিশে সরকারি ধান সংগ্রহ আরও কৃষকবান্ধব করতে আর্দ্রতা ও চিটা ধানের গ্রহণযোগ্য সীমা কিছুটা শিথিল করা, বেসরকারি বাজারের মতো সহজ সংগ্রহব্যবস্থা চালু, সংগ্রহকেন্দ্রে ধান শুকানোর যন্ত্র স্থাপন, অস্থায়ী সংগ্রহকেন্দ্র চালু, পরিবহন সুবিধা বা ব্যয় সহায়তা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বাড়ানো এবং কৃষককে দ্রুত অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি সংগ্রহমূল্য নির্ধারণের সুপারিশও রয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী অবশ্য সরকারি ধান-চাল সংগ্রহে স্বচ্ছতার দাবি করেছেন। তাঁর ভাষ্য, চলতি মৌসুমে পাঁচ লাখ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সাড়ে পাঁচ লাখ টনের বেশি ধান সংগ্রহ হয়েছে। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় কৃষক—তিন বস্তা থেকে শুরু করে তিন টন পর্যন্ত ধান বিক্রির সুযোগ পেয়েছেন। পাশাপাশি মিলারদের কাছ থেকে ১২ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হয়েছে এবং অতিরিক্ত আরও দুই লাখ টন চাল সংগ্রহের কার্যক্রম চলছে।

তবে নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—সরকারি সংগ্রহের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি সংগ্রহ ব্যবস্থার কেন্দ্রে প্রকৃত কৃষককে ফিরিয়ে আনা জরুরি। তা না হলে সরকারি নির্ধারিত মূল্য ও খাদ্য সংগ্রহ নীতির সুবিধা উৎপাদনকারী কৃষকের পরিবর্তে মিলার ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছেই বেশি যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

এই বিভাগ এর আরো খবর

আইনজীবী সহকারী পরিষদ, উখিয়া’র আত্মপ্রকাশ

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর