শুক্রবার ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১১ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডিসেম্বর ঘিরে রাজনীতিতে উত্তাপ, ফিরবেন কি শেখ হাসিনা?

🗓 শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

👁️ ১১ বার দেখা হয়েছে

🗓 শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

👁️ ১১ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(১১ সেপ্টেম্বর) :: বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ‘ডিসেম্বর’। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, বিরোধী রাজনৈতিক জোটের সরকারবিরোধী আন্দোলনের হুঁশিয়ারি এবং এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য—সব মিলিয়ে বছরের শেষ মাসকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নতুন উত্তেজনা।

শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরবেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য সরকারবিরোধী আন্দোলন জোরদারের ঘোষণা দিয়েছে। জোটটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তাদের দাবিগুলো পূরণ না হলে ডিসেম্বরের মধ্যে সরকার পতনের আন্দোলন সফল করা হবে। ফলে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার সঙ্গে বিরোধীদের আন্দোলনের সময়সূচির কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।

তবে এসব ঘটনাকে কাকতালীয় বলে মনে করছেন না অনেকে। রাজনৈতিক অঙ্গনে কেউ কেউ মনে করছেন, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে নানা ধরনের আলোচনা, অনুমান ও গুজবও ছড়িয়ে পড়ছে। এতে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়ছে।

দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার ও আইনি প্রক্রিয়া

সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে আদালতের রায় ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। কেউ আন্দোলনের নামে অরাজকতা সৃষ্টি করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, কেউ অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাইলে তা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, দেশের আইনে তার নির্দেশনা রয়েছে। জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার হিসেবে প্রত্যেকের নিজেদের সীমার মধ্যে থাকা উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। তার অনুপস্থিতিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতেই ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন শেখ হাসিনা।

ট্রাভেল পাস নিয়ে প্রশ্ন

শেখ হাসিনা কীভাবে দেশে ফিরবেন, তা নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে তার ভ্রমণ নথি নিয়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল করেছিল। ফলে বৈধ বাংলাদেশি পাসপোর্ট ছাড়া দেশে ফিরতে হলে তাকে ট্রাভেল পাস বা জরুরি ভ্রমণ নথির প্রয়োজন হতে পারে।

দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশনের সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, শেখ হাসিনা এখনো ট্রাভেল পাসের জন্য আবেদন করেননি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তার কাছে কোনো বৈধ বাংলাদেশি পাসপোর্ট নেই। তাই আন্তর্জাতিক ফ্লাইট কিংবা সীমান্তপথে বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে ট্রাভেল পাস গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ট্রাভেল পাস সাধারণত সীমিত মেয়াদের একটি ভ্রমণ দলিল, যা মূলত দেশে ফিরে আসার জন্য ব্যবহার করা হয়। এটি পাসপোর্টের পূর্ণ বিকল্প নয় এবং সাধারণত অন্য দেশে ভ্রমণের জন্য ব্যবহার করা যায় না। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকরা সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ দূতাবাস, হাইকমিশন বা কনস্যুলেটের মাধ্যমে এ ধরনের নথির জন্য আবেদন করতে পারেন।

তবে সাজাপ্রাপ্ত বা পলাতক কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে সাধারণ নিয়মে ট্রাভেল পাস দেওয়া কতটা সম্ভব, তা নিয়েও আইনজীবীদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে ট্রাভেল পাস ছাড়া শেখ হাসিনা কীভাবে দেশে ফিরবেন—এ প্রশ্নেরও এখনো স্পষ্ট উত্তর মিলছে না।

ভারত কি শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে?

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে তাকে ফেরত দেওয়ার জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ভারত এখন পর্যন্ত তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়ে কোনো সরাসরি পদক্ষেপ নেয়নি।

ভারত থেকে কোনো ব্যবস্থায় তিনি ফিরবেন, নাকি নিজ উদ্যোগে দেশে প্রবেশের চেষ্টা করবেন—এ বিষয়েও কূটনৈতিক মহলে ধোঁয়াশা রয়েছে। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ভারত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করবে না।

আপিলের সুযোগ নিয়ে দুই মত

শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রয়েছে কি না, তা নিয়েও আইনজীবীদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ২১(৩) ধারা অনুসারে রায় প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল না করায় শেখ হাসিনার আর আপিলের সুযোগ নেই। তিনি দেশে ফিরলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে প্রথমেই গ্রেপ্তার হতে হবে বলেও মন্তব্য করেন।

তবে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরের মতে, শেখ হাসিনা আপিল করার উদ্যোগ নিতে পারেন; তবে সেই আপিল গ্রহণ করা হবে কি না, তা শুনানির সময় আদালত সিদ্ধান্ত নেবে। বিশেষ আইনে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলে আপিলের সুযোগ সীমিত হয়ে যায় বলেও তিনি মত দিয়েছেন।

অন্যদিকে ব্যারিস্টার এম সরোয়ার হোসেনের মতে, নির্ধারিত সময় পার হওয়ার যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে আদালতের কাছে বিলম্ব মার্জনার আবেদন করা যেতে পারে। আদালত সেই আবেদন গ্রহণ করলে আপিলের পথ উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ২১ ধারায় ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের বিধান রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রায় প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হয় এবং নির্ধারিত সময়ের পর বিলম্ব মার্জনার বিষয়ে আইনে পৃথক কোনো বিধান স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। ফলে এ ধরনের পরিস্থিতিতে শেষ সিদ্ধান্ত আদালতের ওপরই নির্ভর করবে।

বিরোধীদের আন্দোলনেও ডিসেম্বরের ডেডলাইন

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক জোটের আন্দোলনের কর্মসূচিও ডিসেম্বরকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

গণভোট বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও সার সংকট নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দলীয়করণ বন্ধসহ ছয় দফা দাবিতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এর অংশ হিসেবে ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ করা হয়েছে। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখেও লংমার্চের কর্মসূচি রয়েছে।

জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ছয় দফা দাবি আদায়ের আন্দোলন শুরু হয়েছে। সরকার দাবি না মানলে ডিসেম্বরের মধ্যে সরকার পতনের আন্দোলন সফল করেই তারা ঘরে ফিরবেন।

এরই মধ্যে ছয় দফাকে এক দফায়—অর্থাৎ সরকার পতনের দাবিতে—রূপান্তরের সিদ্ধান্তের কথাও সামনে এসেছে। একই সময়ে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সাবেক চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেছেন, মানুষের মুখে মুখে উঠেছে যে ডিসেম্বরের মধ্যেই সরকার পড়ে যাবে।

আওয়ামী লীগ-জামায়াত ‘যোগসূত্র’ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

বিরোধীদের আন্দোলনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। অতীতে ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের রাজনৈতিক সমীকরণের প্রসঙ্গ টেনে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিএনপির নেতারা।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি অভিযোগ করেছেন, বিরোধীদের বর্তমান আন্দোলন এবং শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণার মধ্যে যোগসূত্র থাকতে পারে। তিনি অতীতের রাজনৈতিক জোট ও আন্দোলনের উদাহরণ টেনে এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন।

তবে এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তার দাবি, জামায়াত কখনো আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করেনি। ১৯৮৬ সালের আন্দোলনে বিভিন্ন দলের সঙ্গে যোগাযোগ ও রাজনৈতিক কর্মসূচির সমন্বয় থাকলেও সেটিকে জোট বলা যায় না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা প্রসঙ্গে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, তিনি ফিরলে তখন পরিস্থিতি অনুযায়ী দেখা যাবে। তার মতে, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দল ও কর্মীদের ধরে রাখার কৌশল হিসেবেও দেশে ফেরার এমন ঘোষণা দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।

ডিসেম্বরেই কি নতুন রাজনৈতিক মোড়?

সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, তার ভ্রমণ নথি নিয়ে জটিলতা, ভারতীয় অবস্থান, মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর আইনি প্রক্রিয়া এবং বিরোধী রাজনৈতিক জোটের সরকার পতনের আন্দোলনের ঘোষণা—সবকিছু মিলিয়ে ডিসেম্বর বাংলাদেশের রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে শেখ হাসিনা সত্যিই ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরবেন কি না, ফিরলে কীভাবে ফিরবেন, তাকে ঘিরে আইনগত ও নিরাপত্তাগত পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে এবং বিরোধীদের সরকারবিরোধী আন্দোলন কোন পর্যায়ে যাবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত।

ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত প্রশ্ন—ডিসেম্বরে আসলে কী ঘটবে? সময় যত এগোবে, সেই প্রশ্নের উত্তরও তত স্পষ্ট হওয়ার কথা। আর সেই উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কোনো মোড়ের সূচনা করে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

এই বিভাগ এর আরো খবর

আইনজীবী সহকারী পরিষদ, উখিয়া’র আত্মপ্রকাশ

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর