কক্সবাংলা ডটকম(১৫ সেপ্টেম্বর) :: একসময় বাংলাদেশের ইলিশের জন্য ভারতের বাজারে ছিল ব্যাপক আগ্রহ। বিশেষ করে দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ অপেক্ষা করতেন পদ্মা-মেঘনার ইলিশের জন্য। কিন্তু এবার চিত্রটা অনেকটাই উল্টো। বাংলাদেশের বাজারে ইলিশের সরবরাহ কমে যাওয়ায় ভারত থেকেই বিপুল পরিমাণ ইলিশ আমদানি করছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে গুজরাটের ভারুচ থেকে কয়েকশ টন ইলিশ বাংলাদেশে এসেছে। আবার একই সময়ে ভারতের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের পদ্মা-মেঘনার ইলিশ আমদানির অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছেন।
অর্থাৎ একই মাছকে ঘিরে দুই দেশের বাজারে তৈরি হয়েছে ভিন্ন ধরনের চাহিদা। গুজরাটের ইলিশ বাংলাদেশের বাজারে আসছে তুলনামূলক কম দামে এবং বিশেষ করে ডিমের কারণে এর আলাদা চাহিদা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের বাজারে বাংলাদেশের পদ্মা-মেঘনার ইলিশের আবেদন মূলত স্বাদ, আকার, পরিচিতি ও বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে এর দীর্ঘ সম্পর্কের কারণে।
ভারতীয় মাছ ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে গুজরাটের ভারুচ থেকে প্রায় ৫০০ টন ইলিশ বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে আরও ১৫০ থেকে ২০০ টন ইলিশ পাঠানোর অর্ডার রয়েছে। এসব মাছের একটি অংশ গুজরাটের ভারুচ থেকে এবং কিছু মাছ পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া পাইকারি বাজার হয়ে বাংলাদেশে যাচ্ছে।
বেনাপোলে দুই মাসে সাড়ে ৩ লাখ কেজি
বাংলাদেশে ভারতীয় ইলিশ আমদানির পরিমাণের সাম্প্রতিক চিত্র পাওয়া যায় বেনাপোল স্থলবন্দরের তথ্যেও। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস—জুলাই ও আগস্টে—বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৬ কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছে।
বেনাপোল ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি ইলিশ আমদানি হয়। আগস্টে আমদানি কয়েক গুণ বেড়ে ১৯টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আসে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি। দুই মাসে মোট ২২টি প্রতিষ্ঠান এসব ইলিশ আমদানি করেছে।
আমদানি করা মাছের ঘোষিত মূল্য ৬ কোটি ৯২ লাখ ৯৪ হাজার ৫১০ টাকা। এর মধ্যে জুলাইয়ে আমদানি করা ইলিশের মূল্য ছিল ৩৫ লাখ ৪৮ হাজার ৭৯৬ টাকা এবং আগস্টে ৬ কোটি ৫৭ লাখ ৪৫ হাজার ৭১৪ টাকা। অর্থাৎ আগস্টে ইলিশ আমদানির পরিমাণ জুলাইয়ের তুলনায় প্রায় ১১ গুণ বেড়েছে।
ভারতীয় ইলিশের এই প্রবাহ শুধু বেনাপোল বা যশোরের বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই। আমদানিকারকদের মাধ্যমে এসব মাছ দেশের বিভিন্ন বাজারে যাচ্ছে। তবে আমদানি করা ইলিশকে দেশি ইলিশের নামে বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। এ কারণে ভোক্তাদের বিভ্রান্ত না করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাজারে আমদানির উৎস স্পষ্ট করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
কেন গুজরাটের ইলিশের প্রতি আগ্রহ
গুজরাটের ভারুচের ভাদভূত এলাকায় নর্মদা নদী সাগরে মিশেছে। ওই মোহনা অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ে। ভারতীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, গুজরাটের ইলিশে ডিমের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। ভারতের বাজারে এ মাছের চাহিদা বাংলাদেশের তুলনায় কম হলেও বাংলাদেশের কিছু বাজারে ডিমওয়ালা ইলিশের আলাদা চাহিদা রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, গুজরাটের ইলিশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কিছু আমদানিকারকের আগ্রহ মূলত মাছের ডিমকে ঘিরে। কম দামে তুলনামূলক বেশি ডিম পাওয়া গেলে মাছ থেকে ডিম আলাদা করে প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত করা যায়। পরে এসব ডিম বিদেশের বিভিন্ন বাজারে রপ্তানি করা হয় বলে ব্যবসায়ীদের দাবি।
মাছের বাকি অংশও পুরোপুরি ফেলে দেওয়া হচ্ছে না। লবণ দিয়ে সংরক্ষণ, শুকানো কিংবা অন্যান্য উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করা হচ্ছে। ফলে একটি ইলিশ থেকে মাছ ও ডিম—দুই ধরনের পণ্যের বাণিজ্যিক মূল্য তৈরি হচ্ছে।
ইলিশের ডিমের আন্তর্জাতিক বাজার
বাংলাদেশে ইলিশের ডিম নিয়ে বাণিজ্য নতুন নয়। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের চাঁদপুর নদীকেন্দ্রের গবেষণায়ও ইলিশের ডিম সংগ্রহ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের একটি বাণিজ্যিক সরবরাহব্যবস্থার তথ্য পাওয়া যায়।
গবেষণায় দেখা যায়, নিম্নমানের বা তুলনামূলক কম দামের কিছু ইলিশ থেকে ডিম সংগ্রহ করে তা বরফে সংরক্ষণ করে চট্টগ্রামের সি-ফুড প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হতো। পরে এসব ডিম প্রক্রিয়াজাত করে ভারত, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরবসহ ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বাজারে পাঠানোর তথ্য পাওয়া যায়।
২০১৬ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণে ৩ হাজার ২২৫টি প্রক্রিয়াজাত ইলিশের ডিমের বাক্স পরিবহনের তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। প্রতিটি বাক্সে প্রায় আড়াই কেজি ডিম থাকায় ওই কয়েক মাসেই প্রায় আট টন ডিম পরিবহনের হিসাব পাওয়া যায়।
এবার বাংলাদেশের ইলিশ চায় ভারত
অন্যদিকে দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে এবার আবার বাংলাদেশের ইলিশের জন্য সরব হয়েছে ভারতের ব্যবসায়ী মহল। কলকাতাভিত্তিক ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আমদানির অনুমতি চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করেছে।
৯ সেপ্টেম্বর সংগঠনটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আলাদা চিঠি দেয় বলে জানা গেছে। সংগঠনটির দাবি, বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আমদানির সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। ২০১২ সালে নিয়মিত ইলিশ রপ্তানি বন্ধ হওয়ার আগে তারা বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আমদানি করতেন।
একই সময়ে বাংলাদেশের ১৮টি প্রতিষ্ঠানও ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে। আবেদন পাওয়ার পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেশের ইলিশের সরবরাহ ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা সম্পর্কে মতামত জানতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি দিয়েছে। ওই মতামতের ভিত্তিতেই এবার ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হবে কি না এবং দিলে কী পরিমাণ দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে।
অনুমোদন থাকলেও রপ্তানি হচ্ছে কম
ভারতে বাংলাদেশের ইলিশ রপ্তানির ক্ষেত্রে অনুমোদিত পরিমাণ ও বাস্তবে রপ্তানির মধ্যে বড় ব্যবধানের নজির রয়েছে। ২০২৫ সালে ২ হাজার ৪২০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হলেও বাস্তবে রপ্তানি হয়েছিল মাত্র ৫৭৭ টন। এর আগের বছরও অনুমোদিত পরিমাণের তুলনায় বাস্তব রপ্তানি ছিল অনেক কম।
২০২৫ সালের দুর্গাপূজার আগে সরকার প্রথমে ১ হাজার ২০০ টন ইলিশ ভারতে রপ্তানির নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পরে ৩৭টি প্রতিষ্ঠানকে ওই পরিমাণ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয় এবং প্রতি কেজি ইলিশের ন্যূনতম রপ্তানিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১২ দশমিক ৫০ মার্কিন ডলার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনুমোদিত পরিমাণের তুলনায় বাস্তব রপ্তানি ছিল খুবই কম।
ইলিশ রপ্তানি ২০১২ সালে বন্ধ করা হলেও দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে ২০১৯ সাল থেকে বিশেষ অনুমতির মাধ্যমে সীমিত আকারে আবার রপ্তানি হচ্ছে। তবে দেশের বাজারে দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে প্রতিবছর অনুমোদিত পরিমাণের তুলনায় বাস্তবে রপ্তানি কম-বেশি হয়েছে।
একই মাছ, দুই বাজারে দুই চাহিদা
মাছ ব্যবসায়ীদের মতে, গুজরাটের ইলিশ এবং বাংলাদেশের পদ্মা-মেঘনার ইলিশ—দুটির বাজার এক নয়। গুজরাটের ইলিশ বাংলাদেশে আসছে মূলত সরবরাহ ঘাটতি পূরণ, তুলনামূলক কম দাম এবং ডিমের বাণিজ্যিক ব্যবহারের কারণে। আর বাংলাদেশের ইলিশের প্রতি পশ্চিমবঙ্গের ক্রেতাদের আগ্রহ তৈরি হয়েছে স্বাদ, গন্ধ, আকার ও ঐতিহ্যের কারণে।
বিশেষ করে দুর্গাপূজাকে ঘিরে কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি পরিবারগুলোর কাছে বাংলাদেশের ইলিশের চাহিদা বাড়ে। পদ্মা-মেঘনার ইলিশ তাই শুধু একটি খাদ্যপণ্য নয়; পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির কাছে এটি উৎসব ও খাদ্যসংস্কৃতিরও অংশ।
ফলে এবার ইলিশের বাণিজ্যে দেখা দিয়েছে এক অস্বাভাবিক চিত্র—যে বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে ভারতের বাজারে ইলিশ পাঠায়, সেই বাংলাদেশই এখন ভারতের গুজরাট থেকে ইলিশ আমদানি করছে। আবার গুজরাটের ইলিশ বাংলাদেশে বিক্রির পাশাপাশি বাংলাদেশের পদ্মা-মেঘনার ইলিশের জন্যই ভারতের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের দরজায় কড়া নাড়ছেন।
বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু দুই দেশের ইলিশ বাণিজ্যের পরিবর্তন নয়; বরং মাছটির উৎপাদন, স্থানীয় সরবরাহ, মূল্য, ভোক্তার পছন্দ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ইলিশের বহুমাত্রিক চাহিদারও প্রতিফলন।













