সোমবার ৫ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিদেশিদের হাতে চট্টগ্রাম বন্দর : কনসেশন চুক্তি ঘিরে প্রশ্ন ও বিতর্ক

🗓 সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

👁️ ১৭ বার দেখা হয়েছে

🗓 সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

👁️ ১৭ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(৫ অক্টোবর) :: দেশের শীর্ষস্থানীয় আমদানি-রপ্তানিকারক, শিপিং ব্যবসায়ী ও বন্দর ব্যবহারকারীদের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে ‘কনসেশন চুক্তি’।

সমুদ্রবন্দর ও টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া ঘিরে এর আগে এমন আলোচনা দেখা যায়নি।

আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় অংশ সমুদ্রপথনির্ভর হওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি অপারেটরদের যুক্ত করার বিষয়টি এখন জাতীয় অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৌশলগত স্বার্থের প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।

‘কনসেশন চুক্তি’ বলতে সাধারণত নির্দিষ্ট শর্তে কোনো সরকারি সম্পত্তি বা অবকাঠামো পরিচালনা, উন্নয়ন ও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের অধিকার নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বেসরকারি বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়াকে বোঝায়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে উৎসাহিত করা এবং তাদের স্বার্থ সুরক্ষার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে এ ধরনের চুক্তি করা হয়। তবে চুক্তির শর্ত, মেয়াদ, আর্থিক কাঠামো ও গোপনীয়তা নিয়েই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে।

১৩৮ বছরের বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন

প্রায় ১৩৮ বছরের পুরোনো চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার।

দেশের সমুদ্রপথে সম্পন্ন হওয়া বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯৩ শতাংশ এই বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্থানীয় বেসরকারি অপারেটরদের সমন্বয়ে বন্দরটির কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন—স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর হঠাৎ করে বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালগুলো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কেন দেখা দিল?

প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের আর্থিক সক্ষমতার কারণে। গত বছর বন্দরটি নিট মুনাফা করেছে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি।

ফলে দীর্ঘদিন ধরে বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এক ব্যবসায়ীর ভাষায়, ‘বাংলাদেশ সরকারের হাতে বন্দরের মতো লাভজনক প্রকল্প খুব বেশি নেই। অথচ এখন সেটিই বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। এটি দেশের জন্য টোটালি লস।’

একে একে বিদেশি অপারেটরের হাতে টার্মিনাল

চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কনসেশন চুক্তির আওতায় সৌদি আরবভিত্তিক রেডসি গেটওয়ে টার্মিনালকে ২২ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়।

অন্যদিকে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ১৫ বছরের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয় বর্তমান বিএনপি সরকার। এর পাশেই রয়েছে চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি), যেটিও একই ধরনের পরিণতির দিকে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে বছরে প্রায় ৩৪ লাখ কনটেইনার ওঠানামার যে কার্যক্রম, তার বড় অংশই ভবিষ্যতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থ (জেসিবি) নিয়েও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।

তিন সরকারের আমলে একই ধারার অভিযোগ

সংশ্লিষ্টদের মতে, পিসিটি কনসেশন চুক্তির মাধ্যমে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে। এনসিটি নিয়েও ওই সময় চুক্তির প্রস্তুতি অনেকটাই এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেটি আরও এগিয়ে চূড়ান্ত রূপ পায়।

এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কয়েকজন পরবর্তী সময়েও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দায়িত্বে বহাল থেকে কাজ করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে গত আড়াই বছরে তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থার সময়েও বন্দরের টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার একই প্রবণতা অব্যাহত থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং শেখ হাসিনার আত্মীয় শেখ হাফিজুর রহমানও এ ধরনের কনসেশন চুক্তির বিষয়ে সক্রিয় ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে।

চুক্তির গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ

বন্দর ব্যবহারকারীদের একটি অংশ মনে করছে, কনসেশন চুক্তির অন্তরালে কার কী স্বার্থ রয়েছে, কে কীভাবে লাভবান হচ্ছেন—এসব বিষয় আরও স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন। তবে সংশ্লিষ্ট অনেকেই প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে চাইছেন না।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘কী হচ্ছে, আল্লাহই জানে। ২০১৩ সালের পর থেকে সরকারগুলোর মধ্যে কোনো দয়া-মায়া আছে বলে মনে হয় না।’

অন্যদিকে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিপিং ব্যবসায়ী কন্টিনেন্টাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান ইকবাল চৌধুরী আবীর চট্টগ্রাম বন্দরকে সিঙ্গাপুরের আদলে গড়ে তোলার পরিকল্পনার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামকে সিঙ্গাপুর বানানোর যে স্বপ্নের কথা বলা হচ্ছে, সেটি আদৌ কি সম্ভব? পাশের দেশ মালয়েশিয়া এত চেষ্টা করেও সিঙ্গাপুর হতে পারেনি। বিশ্বজুড়ে সিঙ্গাপুর একটাই।’

তার মতে, একটি মাঝারি আকারের মাদার ভেসেলে ১৫ থেকে ২০ হাজার কনটেইনার ধারণক্ষমতা থাকলেও চট্টগ্রাম বন্দরে এ ধরনের জাহাজ নিয়মিত ভেড়ানোর মতো কনটেইনার ভলিউম নেই। পুরো মাসে চট্টগ্রাম থেকে বিদেশে কনটেইনার যায় প্রায় ৬০ হাজার।

‘দেশীয় সক্ষমতা যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়া হয়নি’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শীর্ষস্থানীয় বন্দর ব্যবহারকারী বলেন, সরকারকে স্বপ্ন দেখিয়ে বা ভুল বুঝিয়ে তৃতীয় কোনো পক্ষ সুবিধা নিচ্ছে কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।

তার ভাষ্য, এতদিন দেশীয় অপারেটর ও বিনিয়োগকারীরা বন্দর পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তাদের সক্ষমতা ও অবদানের বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে সরাসরি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া কতটা যৌক্তিক, সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তার মতে, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র হলে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেশীয় কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা যাচাই করা যেত। আর বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে বে টার্মিনালের মতো গ্রিনফিল্ড প্রকল্প হতে পারত সবচেয়ে বড় সুযোগ। সেটি না করে দেশের অর্থায়নে নির্মিত এবং হাজার কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রপাতিতে সজ্জিত বিদ্যমান টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।

বিদেশিদের পক্ষে যুক্তিও আছে

তবে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের পক্ষে যুক্তিও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের একাংশ মনে করছেন, আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা, আধুনিক প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা এবং দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে বিদেশি অপারেটর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তাদের মতে, বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করতে বিদেশি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার প্রয়োজন রয়েছে।

বিশেষ করে বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে বড় অঙ্কের বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ হিসেবে বিষয়টিকে দেখছেন তারা।

বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি ও কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম রহমান বলেন, ‘সার্ভিস বাড়ান। জাহাজ অবস্থানের সময় কমান। বন্দরের দক্ষতা নিশ্চিত করেন। বাড়তি মাশুল যে নেবেন, সেটি আন্তর্জাতিক মানের বন্দরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। দেশি না বিদেশি—কোন অপারেটর বন্দর পরিচালনা করবে, তখন সেটি আমাদের বিবেচনায় আসবে না।’

তিনি আরও বলেন, শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরে প্রায় ৪৮ ঘণ্টায় পণ্য খালাস করে জাহাজ ছেড়ে যায়। অথচ বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরে একই কাজে প্রায় চার দিন সময় লাগে।

১৩টি দেশীয় প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ কী?

চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে শুরু থেকেই ১৩টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক দরে এনসিটি ও সিসিটি পরিচালনার প্রস্তাব সরকারকে দিয়েছিল। উন্মুক্ত দরপত্রে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণের আগ্রহও প্রকাশ করেছিল তারা।

কিন্তু এসব প্রস্তাবে সরকার কতটা গুরুত্ব দিয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিযোগিতার সুযোগ না দিয়ে সরাসরি কনসেশন চুক্তির মাধ্যমে বিদেশি অপারেটরদের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

প্রবৃদ্ধি কমছে, প্রয়োজন বড় বিনিয়োগ

চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার ওঠানামার বর্তমান প্রবৃদ্ধি প্রায় সাড়ে ৪ শতাংশ। অথচ ২০১২-১৩ সালের দিকে পণ্য ওঠানামার প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১২ শতাংশ। এনসিটির মতো বড় উন্নয়নকাজও সর্বশেষ ২০০৭ সালের দিকে সম্পন্ন হয়েছে।

ফলে বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে নতুন অবকাঠামো, আধুনিক প্রযুক্তি, দ্রুত পণ্য খালাস এবং জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম কমানোর উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

তবে এ উন্নয়ন কোন মডেলে হবে—দেশীয় অপারেটরদের মাধ্যমে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি কনসেশন চুক্তির আওতায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

বিদেশি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা যেমন অস্বীকার করা যাচ্ছে না, তেমনি দেশের অন্যতম লাভজনক ও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার আগে চুক্তির শর্ত, আর্থিক সুবিধা, জাতীয় স্বার্থ, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিও জোরালো হচ্ছে।

এই বিভাগ এর আরো খবর

ঐশ্বরিয়াকে ঘিরে হঠাৎ উন্মাদনা

রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর