কক্সবাংলা ডটকম(৫ অক্টোবর) :: জাতি গঠনে শিক্ষকদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি এবং শিক্ষকতা পেশার মর্যাদা তুলে ধরতে পালিত হয়েছে ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৬’।
সোমবার (৫ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিশ্ব শিক্ষক দিবসে দেশের ১০১ গুণী শিক্ষককে বিশেষ সম্মাননা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সম্মাননা হিসেবে প্রত্যেক শিক্ষককে দুই লাখ টাকা ও ক্রেস্ট দেওয়া হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষকদের মধ্য থেকে জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি ৯৫ জনকে সম্মাননার জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করে। এর বাইরে প্রধানমন্ত্রী নিজ উদ্যোগে আরও ছয়জন শিক্ষককে এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন।
তবে পরবর্তী সময়ে সম্মাননাপ্রাপ্ত কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য বা তথ্য পাওয়া গেলে তার নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে।
এ বছর প্রাথমিক পর্যায় থেকে ১০ জন, মাধ্যমিক পর্যায় থেকে ২০ জন, কলেজ পর্যায় থেকে ২৫ জন এবং সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকে ২০ জন শিক্ষক সম্মাননা পেয়েছেন। এ ছাড়া চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১০ জন, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনজন, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনজন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারজন শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচিত ছয়জন শিক্ষকও রয়েছেন এ তালিকায়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

মব-হয়রানির ক্ষত এখনো স্পষ্ট
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের আনন্দঘন আয়োজনের মধ্যেও সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষকদের ওপর ঘটে যাওয়া নানা হয়রানি ও লাঞ্ছনার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা গালিগালাজ, শারীরিক নির্যাতন, অপমান ও জোরপূর্বক পদত্যাগের শিকার হন। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও এর বাইরে ছিলেন না।
একপর্যায়ে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের একযোগে পদত্যাগের ঘটনাও ঘটে। কোনো কোনো শিক্ষকের রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষকতার বাইরের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে মবের মাধ্যমে হেনস্তা ও পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনায় শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।
বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের মারধর, জুতার মালা পরানো, অপমান-অপদস্থ করার মতো ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একপর্যায়ে সরকারকে এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে নির্দেশনা জারি করতে হয়। তবে অনেক শিক্ষক এখনো এসব ঘটনার পরিণতি থেকে বের হতে পারেননি।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) আইন শাখার কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, সারা দেশে অন্তত এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা মব-হয়রানির শিকার হয়েছেন। তবে এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা মাউশির কোনো কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ না থাকায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
চাকরিতে পুনর্বহাল ও অধিকার ফিরে পেতে ভুক্তভোগী শিক্ষকদের পক্ষ থেকে সারা দেশে প্রায় তিন শতাধিক মামলা ও রিট করা হয়েছে। অনেক শিক্ষক আদালত থেকে পক্ষে রায় পেলেও তাদের কেউ কেউ এখনো প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে পারছেন না। আবার কেউ চাকরি ফিরে পেলেও বকেয়া বেতন-ভাতা পেতে শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরছেন।
চাকরি ফিরে পেয়েও বেতন-ভাতার অপেক্ষায়
নানামুখী দ্বন্দ্ব ও স্থানীয় রাজনীতির প্রভাবে এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজের অন্তত এক হাজার ২০০ শিক্ষক এখনো নানা জটিলতায় রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। কেউ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন, কেউ শিক্ষা অফিসে ঘুরছেন, আবার কেউ স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের কারণে স্বাভাবিক কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না। মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মাদ্রাসাগুলোতেও এ ধরনের ভুক্তভোগী শিক্ষকের সংখ্যা শতাধিক।
রাজধানীর আনন্দময়ী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজমা বেগমও এমন একজন ভুক্তভোগী। তার অভিযোগ, ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট তাকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যা দিয়ে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। একই দিন কমিটির অনুমতি ছাড়াই একজন সহকারী প্রধান শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং তার বেতন বন্ধ করে দেওয়া হয়।
নাজমা বেগমের দাবি, তদন্তের কাজে বিদ্যালয়ে গেলে তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। পরে অচেতন অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে যায়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে জেলা প্রশাসনের তদন্তে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ায় মাউশি তার বেতন ছাড় করে। কিন্তু বদলি ও বেতনসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় পাসওয়ার্ড এবং অনাপত্তিপত্র (এনওসি) না পাওয়ায় তিনি এখনো জটিলতায় রয়েছেন বলে অভিযোগ করেন।
অন্যদিকে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার নহাটা রানী পতিত পাবনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোহাম্মাদ নুরুল হুদা ও মো. আশরাফুল আলম চাকরি ফিরে পেলেও বকেয়া বেতন-ভাতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জেলা শিক্ষা অফিসে ঘুরছেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ তাদের মাউশির শুনানিতে হাজির হওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। শুনানি শেষে তাদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে শিক্ষা প্রশাসন।
আইনি জটিলতায় আটকে আছেন অনেকে
মাউশির আইন শাখা সূত্র জানায়, মব-হয়রানির ঘটনায় করা রিটগুলোর বেশির ভাগে বর্তমান প্রধান শিক্ষক, ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রধান ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডকে বিবাদী করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিধিমোতাবেক শোকজ বা বিভাগীয় ব্যবস্থা না নিয়ে শিক্ষককে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। ফলে পরবর্তী সময়ে এসব পদত্যাগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
আইন শাখার কর্মকর্তাদের মতে, কিছু ক্ষেত্রে ১৮০ কর্মদিবস অতিক্রান্ত হওয়ার পর বিধি অনুযায়ী শিক্ষকরা পুনর্বহাল হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু আদালত বা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পরও স্থানীয় পর্যায়ে তাদের কাজে যোগদানে বাধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
মাউশির আইন শাখার সহকারী পরিচালক মো. জাকিরুল ইসলাম মণ্ডল বলেন, যারা আইনের আশ্রয় নিয়েছেন, তাদের বিষয়ে আইন শাখা থেকে প্রয়োজনীয় মতামত দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠান থেকেও অভিযোগ এসেছে। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মাউশির পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) মো. নাজমুল হক বলেন, সারা দেশে মবের শিকার হয়ে কতজন শিক্ষক এখনো প্রতিষ্ঠানের বাইরে রয়েছেন, তার নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই। কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ না থাকায় প্রকৃত সংখ্যা সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন সময় বিচ্ছিন্নভাবে অভিযোগ পাওয়ার পর সেগুলোর ভিত্তিতে তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের এক পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে যোগদানের নির্দেশনা দেওয়া হলেও স্থানীয় পর্যায়ে অনেক শিক্ষককে প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে দেওয়া হচ্ছে না। ব্যবস্থাপনা কমিটি ও স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের বাধার কারণে সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
শিক্ষকদের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের তাগিদ
শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষকের রাজনৈতিক মতাদর্শ বা ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন থাকলে তা তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা উচিত। কোনো অবস্থাতেই মবের মাধ্যমে শিক্ষককে অপমান, নির্যাতন বা পদত্যাগে বাধ্য করার সুযোগ নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, শিক্ষকদের মুক্তচিন্তার অধিকারী ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে স্বাধীন হওয়া জরুরি। তারা সমাজের ‘সোশ্যাল আর্কিটেক্ট’। ফলে তাদের ভিন্ন মত ও পথ থাকতেই পারে। কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু মবের মাধ্যমে নির্যাতনের কোনো সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকদের রাজনৈতিক গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। মবের মাধ্যমে শিক্ষকদের ওপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছে, তার সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষত পূরণে দীর্ঘ সময় লাগবে।
এই শিক্ষাবিদ আরও বলেন, শিক্ষক নিয়োগ, পদায়ন ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি শক্তিশালী কাঠামো প্রয়োজন। পিএসসির আদলে এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা গেলে শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অনিয়ম, ঘুষ ও স্বজনপ্রীতি কমানো সম্ভব হবে।
মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করাই হোক অঙ্গীকার
বিশ্ব শিক্ষক দিবস শুধু গুণী শিক্ষকদের সম্মাননা দেওয়ার দিন নয়; একই সঙ্গে দেশের প্রতিটি শিক্ষকের মর্যাদা, নিরাপত্তা, ন্যায্য অধিকার ও পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকারের দিন। এবারের ১০১ জন গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়ার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে শিক্ষকদের উৎসাহিত করবে। তবে একই সঙ্গে যারা সাম্প্রতিক সময়ে মব-হয়রানির শিকার হয়েছেন, তাদের ন্যায়সংগত অধিকার নিশ্চিত করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং আইন ও বিধির মাধ্যমে সব অভিযোগের নিষ্পত্তি করা গেলে বিশ্ব শিক্ষক দিবসের মূল চেতনাই আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে।













