এম.জিয়াবুল হক, চকরিয়া :: রোজার ঈদ তথা পবিত্র ঈদুল ফিতরের টানা ছুটিতে ভ্রমন পিপাসু পর্যটক দর্শনার্থীদের বরণে এবারও নবরূপে সাজিয়ে তোলা হয়েছে কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্ককে।
ইতোমধ্যে ঈদের ছুটিতে দর্শনার্থীদের আগমন ঘিরে নিরবিচ্ছিন্ন ভ্রমন নিশ্চিত করতে পার্কের ভেতরে বাইরের পর্যটন স্পটসমূহকে নান্দনিকরুপে সাজানোর পাশাপাশি টুরিস্ট পুলিশের সহায়তায় সার্বক্ষনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে পার্ক কতৃপক্ষ।
জানা গেছে, দেশের প্রথম পর্যটনস্পট ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের অবস্থান কক্সবাজার শহর থেকে ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে।
শতবর্ষী গর্জন সমৃদ্ধ বনের ভেতরে লোহার বেষ্টনীতে বসবাস করছে বিলুপ্ত প্রায় প্রাণীকূল। প্রাণী হলেও যাতের মমতায় বেড়ে উঠছে মানে পরিচর্যাকারী কেয়ারটেকারদের ডাকে সাড়া দেয় খাঁচায় আবদ্ধ বাঘ-সিংহ।
বেষ্টনীর ভেতরে খেলাধুলা আর হুংকার ছেড়েই সময় পার করা এসব প্রাণী যা দেখে আনন্দ পেয়ে থাকেন পার্ক ভ্রমনে আগত দর্শণার্থীরা। ১৯৯৯ সালে যাত্রা শুরু হয় ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের।
তাঁর আগে ১৯৮০ সালে এই পর্যটনটি ছিল হরিণ প্রজননকেন্দ্র।
ভেতর-বাইরে ৯০০ হেক্টর আয়তন বনের জমি নিয়ে যাত্রা করা দেশের প্রথম সাফারি পার্কে বিপুল পরিমাণ মাদার ট্রিসহ (গর্জন) আছে নানা প্রজাতির বনজ গাছ।

সাফারি পার্ক হিসেবে সরকারি গেজেটভুক্ত হবার আগে থেকেই সবুজের সমারোহে দৃষ্টিনন্দন পার্কটি প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের কাছে বিনোদনের অনুষঙ্গ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
শিক্ষার্থীরা এই পার্ক থেকে প্রকৃতিবিষয়ক জ্ঞান আহরণ করতে পারে।
সপ্তাহের মঙ্গলবার ছাড়া বাকি ছয় দিন ভ্রমন পিপাসু পর্যটক দর্শনার্থীদের উচ্ছ্বাসে, প্রাণীকূলের কোলাহলে মুখরিত হয়ে ওঠে পার্কের সর্বত্র।
সাফারি পার্কের শুরুতে প্রাপ্তবয়স্করা ৫০ টাকা আর ৫ বছরের বড় শিশু-কিশোররা ৩০ টাকার টিকিটে পার্ক দর্শন করতে পেরেছেন এতদিন।
কিন্তু অবকাঠামোগত উন্নয়নের বদৌলতে সাফারি পার্কের দৃশ্যমান সৌন্দর্য বর্ধনের কারণে সরকারের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের মে মাসের নতুন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দর্শনার্থী প্রবেশ ফি বাড়ানো হয়েছে।
বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিজনের প্রবেশ ফি ১০০ টাকা ও শিশু কিশোরদের জন্য ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সাফারি পার্কে ভ্রমনে গিয়ে হাঁটতে অক্ষম দর্শণার্থী চাইলে নির্ধারিত ফি দিয়ে কর্তৃপক্ষের নিজস্ব মিনিবাসে করে পার্ক ঘুরে দেখতে পারেন।
কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, সাফারি পার্কে দেড় ডজন বেষ্টনীতে সংরক্ষিত প্রাণীকূলে কঠোর নিরাপত্তায় পালিত হচ্ছে হাতি, বাঘ, সিংহ, জলহস্তি, গয়াল, আফ্রিকান জেব্রা, ওয়াইল্ডবিস্ট, ভাল্লুক, বন্য শূকর, হনুমান, ময়ূর, স্বাদু ও নোনা পানির কুমির, সাপ, বনগরুসহ দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির প্রাণী।

পার্কজুড়ে আরও রয়েছে চিত্রা, মায়া, সম্বর ও প্যারা হরিণ। আছে জানা-অজানা বিচিত্র ধরনের কয়েকশ’ ধরনের পাখি। ৫২ প্রজাতির ৩৫০ প্রাণী পার্কে দেখা মেলে।
উন্মুক্তভাবে আছে ১২৩ প্রজাতির এক হাজার ৬৫ প্রাণী। এর মধ্যে গুইসাপ, শজারু, বাগডাশ, মার্বেল ক্যাট, গোল্ডেন ক্যাট, ফিশিং ক্যাট, খেঁকশিয়াল, বনরুই উল্লেখযোগ্য।
হেঁটে কিংবা গাড়িতে করে পার্ক ভ্রমণের সময় পথে পথে অসংখ্য বানর, শিয়াল, খরগোশ, হরিণসহ বন্যপ্রাণীর দৌড়ঝাঁপ দেখা যায়। দেখা মেলে কালের সাক্ষী বিশালাকার দুর্লভ ও মূল্যবান বৃক্ষরাজির।
সেসব গাছের ডালপালা ও দেয়ালে দেয়ালে বানরের লাফালাফি নজর কাড়ে সবার। এসময় এসব দৃশ্য মোবাইল ক্যামেরায় ধারণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন দর্শনার্থীরা।
সাফারি পার্কের প্রকল্প পরিচালক এবং বন্যপ্রানী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ চট্টগ্রামের বিভাগীয় বনকর্মকর্তা (ডিএফও) আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াসিন নেওয়াজ চৌধুরী বলেন, বেষ্টনী অনুসারে সাফারির চারপাশে তৈরি হয়েছে নিরাপদ পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ পথ।
গড়া হয়েছে প্রবেশ-বাহিরের জন্য স্বয়ংক্রিয় ফটক, যান চলাচলে উপযুক্ত পাকা সড়কও।
বাঘ-সিংহসহ হিংস্র প্রাণী বনে মুক্ত করে দেওয়া হলে খাঁচাযুক্ত গাড়িতে দর্শনাথীর্রা সংশ্লিষ্ট বেষ্টনীতে ঢুকে বিচরণরত বাঘ-সিংহ অবলোকন করেন।
পুরো সাফারি পার্ক দেখার জন্য তৈরি করা হয়েছে নান্দনিক ও সুউচ্চ পর্যবেক্ষন টাওয়ার। ইচ্ছা করলে পর্যটক দর্শনার্থীরা টাওয়ারে উঠে এক মুহূর্তের মধ্যে পার্কের অপরুপ সৌন্দর্য দর্শন করতে পারবেন।
তিনি বলেন, পার্কের বাইরে পার্কিং লাগোয়া এলাকায় সাজানো ফুল বাগান। পার্কের দক্ষিণে গড়ে তোলা হয়েছে পিকনিক স্পট, শিশু বিনোদন কেন্দ্র। এরই দক্ষিণে পাহাড়ের পাদদেশে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম লেক।

ইতোমধ্যে উন্নয়ন কাজের বদৌলতে নতুনত্ব পেয়েছে পার্কের বেশিরভাগ পর্যটন স্পটসমুহ।
সংস্কার করা হয়েছে পার্কের মাঝখানের শতাধিক ফুট উঁচু ওয়াচ টাওয়ার। বাচ্চাদের বিনোদনের জন্য রয়েছে আলাদা অ্যামিউজিং পার্ক।
ইচ্ছে করলে হাতির পিঠে ঘুরে বেড়াতে পারবেন দর্শনার্থী। সেজন্য দিতে হবে নির্ধারিত ফি।
সাফারি পার্কের সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, পার্কে আবদ্ধ ও উন্মুক্ত প্রাণি এক বেষ্টনী হতে অন্য বেষ্টনী পর্যন্ত সহজে যেতে তৈরি হয়েছে সংযোগ সড়ক।
অতিরোদ পড়া বেষ্টনীগুলো ছায়া ঘেরা পরিবেশে স্থানান্তর করা হয়েছে। তৈরি হয়েছে সুনিপুণ অবকাঠামো। এখন সহজে বিশাল পার্কে ঘোরা যায়।
সাফারি পার্কের রেঞ্জ কর্মকর্তা মনজুর আলম বলেন, প্রতিষ্ঠার দুই যুগে এসে ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক এই অঞ্চলের মানুষের বেড়ানো ও বিনোদনের অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবছর রোজার ঈদ ও কোরবানির ঈদের পাশাপাশি এখানে বার্ষিক পিকনিক করতে আসছে অনেক শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান।
গুরুত্ব বিবেচনা করে সরকারের বিশেষ প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে পার্কের বিভিন্ন পর্যটন স্পটগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এবারের রোজার ঈদে দেশ বিদেশি পর্যটক দর্শনার্থী আগমন নিশ্চিত করতে আমরা সাফারি পার্ককে নতুনভাবে ঢেলে সাজিয়েছি।
ফলে ঈদের টানা ছুটিতে দর্শনার্থীরা সাফারি পার্ক দর্শনে এসে খুব মনোরম পরিবেশে প্রাকৃতিক দৃশ্য গুলো উপভোগ করতে পারবে।
ঈদের ছুটিতে পার্কে এসে দর্শনার্থীরা ভালো কিছু উপভোগ করবে বলে আমরা আশাবাদী।
চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেন বলেন, ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে সেখানে আলাদাভাবে কাজ করছেন টুরিস্ট পুলিশ।
তারপরও রোজার ঈদে পর্যটক দর্শনার্থীদের নিরবচ্ছিন্ন ভ্রমন নিশ্চিত করতে চকরিয়া থানা পুলিশ সবধরনের সহায়তা দেবে।

কীভাবে পৌঁছাবেন ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে?
বিমান সার্ভিস : ঢাকা থেকে কক্সবাজার সরাসরি বিমান সার্ভিস আছে। এই রুটে বাংলাদেশ বিমান ও বিভিন্ন বেসরকারি এয়ারলাইন্স চলাচল করে।
বাস সার্ভিস : ঢাকা কক্সবাজার যাওয়ার পথে ডুলাহাজারা নামক স্থানে সাফারী পার্কে নামা যায়। প্রধান সড়ক হতে মাত্র ৩৫০ গজ পূর্ব পার্শ্বে পার্কের অবস্থান।
ট্রেন সার্ভিস : ট্রেনে ঢাকা থেকে চট্রগ্রাম যেতে পারেন এবং সেখান থেকে বাসে কক্সবাজার যাওয়ার পথে ডুলাহাজারা নেমে অথবা ট্রেনে ঢাকা থেকে সরাসরি কক্সবাজার যেতে পারেন এবং কক্সবাজার থেকে বাসে করে ডুলাহাজারা এসে সাফারী পার্ক পরিদর্শন করতে পারেন। এছাড়া লোকাল ট্রেনে করে চট্রগ্রাম ট্রেন স্টেশন থেকে সরাসরি ডুলাহাজারা রেল স্টেশনে নেমে ইজিবাইক যোগে ৫-১০ মিনিটের মধ্যে সাফারি পার্কে পৌঁছাতে পারবেন।
ডুলাহাজারা থেকে কক্সবাজার শহরের দূরত্ব মাত্র ৪৭ কিলোমিটার। পার্ক পরিদর্শন করে যেকোন বাসে করে মাত্র ৩০-৪০ মিনিটে কক্সবাজার পৌছতে পারেন। সেখানে বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে রাত্রি যাপনের সুযোগ রয়েছে।















