বুধবার ১৫ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ চৈত্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসলামী ব্যাংকে আবারও অস্থিরতা

🗓 মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

👁️ ১৯ বার দেখা হয়েছে

🗓 মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

👁️ ১৯ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম :: দেশের অন্যতম বৃহৎ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক এই অস্থিরতার পেছনে নতুন করে উঠে আসছে পরিচালনা পর্ষদের পরিবর্তন ও অভ্যন্তরীণ বিভক্তির বিষয়টি।

এমডিকে দীর্ঘ ছুটিতে পাঠানোর আগে পর্ষদে একটি গুরুত্বপূর্ণ রদবদল হয়েছে—যা বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি পর্ষদ থেকে জামায়াতপন্থি হিসেবে পরিচিত একজন পরিচালককে সরিয়ে দেওয়া হয়। তার স্থলে নতুন সদস্য হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে এমন ব্যক্তিদের, যাদের ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন কেবল ব্যক্তি পর্যায়ের নয়—বরং ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় একটি নতুন ভারসাম্য তৈরি করেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে শীর্ষ ব্যবস্থাপনায়।

বিশেষ করে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক খানকে হঠাৎ করে দেড় মাসের ছুটিতে পাঠানোর ঘটনায় ব্যাংকিং খাতজুড়ে নানা প্রশ্ন ও জল্পনা তৈরি হয়েছে।

পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সোমবার (১৩ এপ্রিল) থেকে ৩১ মে পর্যন্ত তিনি ছুটিতে থাকবেন। যদিও তিনি মূলত ১৫ দিনের ছুটি চেয়েছিলেন, পর্ষদ সেটিকে বাড়িয়ে প্রায় ৪৯ দিনে উন্নীত করেছে।

এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

ছুটি নাকি কৌশলগত সরানো?

পর্ষদ সূত্র বলছে, এমডি ব্যক্তিগত কারণে ছুটির আবেদন করেছিলেন। তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি—এটি স্বেচ্ছা ছুটির চেয়ে ‘বাধ্যতামূলক ছুটি’ বলেই বেশি প্রতীয়মান।

বিশেষ করে, পর্ষদের পক্ষ থেকে মৌখিকভাবে দীর্ঘ সময় ছুটি কাটানোর পরামর্শ দেওয়া—এই সিদ্ধান্তের পেছনে অন্য কোনও উদ্দেশ্য আছে কিনা, সে প্রশ্ন উঠেছে। ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিস্থিতি সাধারণত ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা যায়।

এমডির ছুটি: পর্ষদ পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা?

পর্ষদে এই রদবদলের পরপরই ব্যবস্থাপনা পরিচালককে দেড় মাসের ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত আসে। ফলে দুটি ঘটনাকে একই সূত্রে দেখছেন ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, পর্ষদের ভেতরে নতুন ক্ষমতার সমীকরণ তৈরি হওয়ার পর শীর্ষ ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এমডির দীর্ঘ ছুটি সেই প্রক্রিয়ারই অংশ হতে পারে।

ভেতরে ভীতি ও বিভক্তি

ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ পরিবেশেও স্পষ্ট বিভক্তির চিত্র দেখা যাচ্ছে।

সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত এবং জামায়াতপন্থি হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের মধ্যে বর্তমানে ভীতি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন—পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় তাদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

অপরদিকে, ২০১৭ সালের পর এস আলম গ্রুপের প্রভাবাধীন সময়ে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ভিন্ন মনোভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। তাদের একটি অংশ বর্তমান পরিবর্তনে সন্তুষ্ট বলে জানা গেছে।

‘ভেতরের তথ্য ফাঁস’ নতুন উদ্বেগ

ব্যাংকের ভেতরের তথ্য ফাঁসের ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এখনও প্রায় ৭০০-এর বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন, যারা বিভিন্ন সময় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নথি বাইরে সরবরাহ করছেন। এমনকি একজন সাবেক বা বর্তমান এমডির শিক্ষাগত সনদপত্র পর্যন্ত বাইরে প্রকাশ হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “এ ধরনের তথ্য ফাঁস শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য বড় হুমকি।”

রাজনৈতিক প্রভাবের গুঞ্জন

ব্যাংকটির সাম্প্রতিক পরিবর্তনের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকারের ইঙ্গিতে পরিচালনা পর্ষদে আরও পরিবর্তন আসতে পারে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা হয়নি, তবু ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

ফিরছে কি পুরোনো নিয়ন্ত্রণ?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—ইসলামী ব্যাংকে আবারও কি এস আলম গ্রুপের প্রভাব ফিরে আসছে? পর্ষদে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তি, এমডির ছুটি এবং অভ্যন্তরীণ অবস্থার পরিবর্তন— সব কিছু মিলিয়ে এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা। তবে তারা এটাও বলছেন, পরিস্থিতি এখনও পরিবর্তনশীল এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নির্ধারণে আরও সময় লাগতে পারে।

পটভূমিতে পুরোনো দ্বন্দ্ব ও দখল রাজনীতি

ইসলামী ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরেই মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনায় রয়েছে। ২০১৭ সালে ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলমের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর থেকে ব্যাংকটি নানা বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে। এর মাধ্যমে আগের প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রভাব কমানোর চেষ্টা করা হয়।

তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে আবারও সেই গোষ্ঠীর পুনরাগমনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গ্রাহক ও সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ মনে করছে—ব্যাংকের ভেতরে এখনও পুরোনো প্রভাব বলয় সক্রিয় রয়েছে, যারা ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে চেষ্টা করছে।

পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন ও রাজনৈতিক প্রভাব

সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদেও পরিবর্তন এসেছে। একজন বিতর্কিত পরিচালককে অপসারণ করে নতুন সদস্য যুক্ত করা হয়েছে। ফলে পর্ষদের ভেতরে ক্ষমতার ভারসাম্য নতুনভাবে বিন্যস্ত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় এমডির ছুটি একটি বড় ইঙ্গিত বহন করে— যা ব্যাংকের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

যা বলছেন জামায়াতের আমির

এদিকে ইসলামী ব্যাংকসহ দেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির এবং সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘‘দেশের বৃহত্তম ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের অস্তিত্ব যদি বিপন্ন হয়, তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি বঙ্গোপসাগরে চলে যাবে।’’

ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার দাবি জানিয়ে জামায়াতের আমির বলেন, ‘‘সাবধান করে দিচ্ছি, এই ব্যাংকগুলোকে দলীয়করণ করবেন না।’’ তিনি বলেন, ‘‘দেশের বৃহত্তম ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের অস্তিত্ব যদি বিপন্ন হয়, তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি বঙ্গোপসাগরে চলে যাবে।’’

সোমবার (১৩ এপ্রিল) রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে ‘গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার: সংকটের মুখোমুখি দেশ’ শীর্ষক এক জাতীয় সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত এই সেমিনারে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন সংক্রান্ত রাজনৈতিক সংকট নিয়ে আলোচনা হয়।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘‘বাংলাদেশ ব্যাংক কুক্ষিগত করার পরে এখন দেশের সবচাইতে বড় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকে আবার নতুন করে ‘অভ্যুত্থান’ শুরু হয়েছে। যে ব্যাংক দেশের রেমিট্যান্সের শতকরা ৩২ ভাগ একা আহরণ করে, এই ব্যাংকের যদি অস্তিত্ব বিপন্ন হয়—তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি বঙ্গোপসাগরে চলে যাবে।’’

ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘সাবধান করে দিচ্ছি, এই ব্যাংকগুলোকে দলীয়করণ করবেন না। যদি দলীয়করণ করেন, তবে জনগণ আপনাদের ছেড়ে কথা বলবে না।’

নতুন আইন, নতুন শঙ্কা

পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে সদ্য পাস হওয়া ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬’। এই আইনের মাধ্যমে দুর্বল বা সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের পুরোনো শেয়ারধারীদের নির্দিষ্ট শর্তে পুনরায় মালিকানায় ফেরার সুযোগ রাখা হয়েছে।

এ নিয়ে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, এতে অতীতে অভিযুক্ত গোষ্ঠীগুলোর পুনর্বাসনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এই আইনি পরিবর্তন এবং ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন—দুটিকে একই সূত্রে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান

এমডিকে ছুটিতে পাঠানোর বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি কোনো নির্দেশ দিয়েছে কিনা—সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংকগুলোর নিজস্ব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্র রয়েছে, তবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তাদের অবহিত করার বাধ্যবাধকতা আছে।

একই সঙ্গে গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গ্রাহকদের উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়া

এদিকে, ব্যাংকটির গ্রাহকদের একটি অংশ ইতোমধ্যে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ—ব্যাংকটিকে আবারও একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া গ্রাহকদের কেউ কেউ এমনও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে পরিস্থিতি প্রতিকূল হলে তারা আমানত তুলে নেবেন। ব্যাংকিং খাতে এমন মনস্তাত্ত্বিক চাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আস্থার সংকট তৈরি হলে তা দ্রুত তারল্য সংকটে রূপ নিতে পারে।

সামনে কী

বর্তমান পরিস্থিতি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—এমডির এই দীর্ঘ ছুটি কি সাময়িক, নাকি স্থায়ী পরিবর্তনের পূর্বাভাস, পরিচালনা পর্ষদের ভেতরে নতুন করে ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস হচ্ছে কি, নতুন আইনের সুযোগে পুরোনো গোষ্ঠীর পুনরাগমন ঘটবে কি? ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ পথচলা।

সব মিলিয়ে, এমডির ছুটি একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হলেও এর পেছনে রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক বহুস্তরীয় সমীকরণ কাজ করছে। আর সেই কারণেই ইসলামী ব্যাংকের এই অস্থিরতা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়—পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই বিভাগ এর আরো খবর

নববর্ষে যেভাবে সাজাবেন আপনার ঘর

মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

ইসলামী ব্যাংকে আবারও অস্থিরতা

মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর