রবিবার ২৬ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৬ চৈত্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি : বেড়েছে পরিবহন ব্যয়, কৃষি ও ভোগ্যপণ্যের দাম

🗓 বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬

👁️ ৩২ বার দেখা হয়েছে

🗓 বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬

👁️ ৩২ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম :: চলমান জ্বালানি সংকটের কারণে আগেই বেড়েছিল পণ্যবাহী যানবাহনের ভাড়া। এর মধ্যে গত ১৮ এপ্রিল জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করে সরকার। দাম বৃদ্ধির পর ভাড়া বেড়েছে আরেক দফা।

সরকার ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়ালেও মাঠ পর্যায় থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। জ্বালানি সংকটের প্রভাবে পরিবহন ভাড়া বাড়ার পাশাপাশি পণ্যবাহী যানবাহনের স্বল্পতাও রয়েছে।

এর প্রভাবে খাদ্যশস্য, শাকসবজি, কাঁচামাল, মৌসুমি ফল, প্রক্রিয়াজাত খাবারসহ সব ধরনের কৃষিপণ্য পরিবহনে ব্যয় বেড়েছে। শুধু কৃষিপণ্য নয়, ভাড়া বৃদ্ধির প্রভাবে আমদানি-রফতানিসহ দেশের শিল্প খাতের পণ্য পরিবহনও এখন আগের চেয়ে ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।

ব্যবসায়ী ও খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে পরিবহন ভাড়া অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ঘটবে, যা সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়ে দেবে।

ফলে একদিকে যেমন কৃষক ও উৎপাদকরা পণ্য বাজারজাতে লোকসানের মুখে পড়বেন, অন্যদিকে আমদানি-রফতানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হ্রাস পাবে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের সরবরাহ শিকল ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।

পরিবহন খরচ বৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিভিন্ন পণ্যের দামে। বাজার পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে প্রতি কেজি মিনিকেট ৮২-৮৫ টাকা ও নাজিরশাইল ৮৮-৯৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগের চেয়ে ৪-৬ টাকা বেশি।

একইভাবে ডালের দাম কেজিতে ১০ টাকা এবং ডিমের দাম প্রতি পিসে ২ থেকে আড়াই টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ভোজ্যতেল ও চিনির বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়ার পাশাপাশি বেগুন ও শিমের মতো নিত্যপণ্যের দাম দ্রুত বেড়ে ১০০-১২০ টাকা কেজি দরে ঠেকেছে। বিভিন্ন প্রকার মাছের দাম কেজিতে বেড়েছে ৪০-৫০ টাকা।

এছাড়া মসলার বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে; যেখানে এলাচের দাম কেজিতে এক থেকে আড়াই হাজার টাকা এবং জিরার দাম প্রায় ২০০ টাকা বেড়েছে। অতিরিক্ত পরিবহন খরচের কারণেই প্রতিটি পণ্যের দাম এভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

উত্তরবঙ্গের নওগাঁ জেলা বাংলাদেশের চাল সরবরাহের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। নিজস্ব উৎপাদনের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো থেকেও এখানে প্রচুর চালের সমাগম ঘটে। সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চালের সবচেয়ে বড় জোগান এ জেলা থেকেই যায়। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর নওগাঁ থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে চাল পরিবহন করা ট্রাকের ভাড়া ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার।

তিনি বলেন, ‘তেলের দাম বাড়ার আগে নওগাঁ থেকে ঢাকা পর্যন্ত ট্রাকের ভাড়া ছিল ১৭-১৮ হাজার টাকা। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পর এখন ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে। ফরহাদ হোসেনের আশঙ্কা, তেলের সংকট না কাটলে পরিবহন ভাড়া আরো বাড়বে এবং এর বিরূপ প্রভাব দেশের ভোক্তাদের ওপর পড়বে।’

দেশের কৃষিপণ্য সরবরাহের আরেকটি বড় কেন্দ্র দক্ষিণবঙ্গের জেলা যশোর। এ অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য দেশজুড়ে সরবরাহ করা হয়; কৃষিপণ্য ছাড়াও বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি করা কৃষি ও ভোগ্যপণ্য সরবরাহ হয় এ জেলা থেকে। তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে যশোর থেকে বেড়েছে ট্রাকের ভাড়া। শুধু যশোর নয়, বগুড়া ও বৃহত্তর ময়মনসিংহসহ দেশের প্রধান কৃষিপণ্য সরবরাহ কেন্দ্রগুলো থেকেই পণ্যবাহী যানবাহনের ভাড়া বেড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

পরিবহনের এ বাড়তি ব্যয় কৃষিপণ্য বাজারজাতের খরচ বাড়িয়ে দেবে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব বহুমাত্রিক; যা যানবাহন ও কৃষি খাত থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।

তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি বাজারে এর অপ্রতুলতা থাকায় কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ যেমন বাড়বে, তেমনি বিপণন ও বাজারজাত পর্যায়েও ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বেনাপোল স্থলবন্দরে ট্রাক ভাড়া গন্তব্যভেদে ৭-৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। যশোর-ঢাকা রুটে ট্রাক ভাড়া ২২-২৩ হাজার থেকে ৩০-৩২ হাজার টাকায় উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে যশোর থেকে চট্টগ্রাম রুটে ট্রাক ভাড়া ৩০-৩৫ হাজার থেকে ৪০-৪৫ হাজার টাকায় উন্নীত হয়েছে।

ভাড়া বৃদ্ধি সম্পর্কে জানতে চাইলে বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আজিম উদ্দিন গাজি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে ডিজেল, পেট্রল-অকটেনের দাম বেড়েছে। আবার পাম্পে চাহিদার অর্ধেক তেল পাওয়া যাচ্ছে। তেলের দাম ও সংকটের কারণে আমরা ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হয়েছি।’

অন্যদিকে ট্রাক মালিকরা অযৌক্তিক হারে ভাড়া বৃদ্ধি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‌ডিজেলের দাম বেড়েছে ১৫ শতাংশ। ভাড়া কীভাবে ৩৫ শতাংশ বাড়ে? সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বাড়তে পারে। পরিবহন সব খরচ তো জ্বালানি না। অন্য খরচ তো আগের মতোই আছে। ক্যাব এ সিদ্ধান্তে চরম আপত্তি জানিয়েছে কিন্তু বিআরটিএ শোনেনি। কোন যুক্তিতে এত বাড়ছে? এটি ভোক্তার সঙ্গে প্রতারণা।’

দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি ভোগ্যপণ্যের বাজার ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ। খাতুনগঞ্জ থেকে চাল, ডাল, তেল ও চিনিসহ আমদানীকৃত খাদ্যপণ্য সারা দেশে সরবরাহ করা হয়। দেশের বাজারদর নিয়ন্ত্রণে এ কেন্দ্রটি ভূমিকা পালন করে। জ্বালানি তেলের দাম ও সংকটের প্রভাবে খাতুনগঞ্জ থেকে ঢাকা ও বিভিন্ন স্থলবন্দরের ট্রাক ভাড়া ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সেলিম জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে আগে থেকেই ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া বাড়তি ছিল। বর্তমানে জ্বালানির দাম আরো বৃদ্ধি পাওয়ায় ট্রিপপ্রতি ভাড়া অতিরিক্ত দেড়-দুই হাজার টাকা বেড়েছে।

স্বাভাবিক সময়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ট্রাক ভাড়া ১৮-২০ হাজার টাকা থাকলেও তা বেড়ে বর্তমানে ২৮-৩০ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। একইভাবে বিভিন্ন স্থলবন্দর থেকে চট্টগ্রাম রুটে ভাড়া ২৭-২৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৩১-৩২ হাজার টাকা হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে পণ্য পরিবহন খরচ আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর দিনাজপুরের হিলি দিয়ে চাল, গম, ডাল ও ভুসিসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য আমদানির প্রবাহ স্বাভাবিক থাকলেও অভ্যন্তরীণ সরবরাহে ব্যবসায়ীরা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। পরিবহন ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারে আমদানীকৃত এসব পণ্যের দামও বাড়ছে।

হিলি স্থলবন্দরে জ্বালানি তেলের সংকট ও দাম বাড়ার কারণে ট্রাক ভাড়া উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। হিলি থেকে ঢাকা রুটে আগে যে ভাড়া ছিল ১৮-১৯ হাজার টাকা, তা বর্তমানে ২১-২২ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। একইভাবে চট্টগ্রাম রুটে ভাড়া ২৭ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৩১-৩২ হাজার টাকা হয়েছে। গন্তব্যভেদে ভাড়ার এ বৃদ্ধি এবং যানবাহনের স্বল্পতা বন্দর দিয়ে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে বড় সমস্যার সৃষ্টি করছে।

স্থলবন্দরের আমদানিকারক সোহেল রানা জানান, ট্রাকের অভাবে হিলি বন্দরে পণ্য খালাস ব্যাহত হওয়ায় তাদের বাড়তি মাশুল গুনতে হচ্ছে। জ্বালানি সংকটে ট্রাক ভাড়া ৩ থেকে ৭ হাজার টাকা বাড়লেও পর্যাপ্ত যানবাহন পাওয়া যাচ্ছে না, যার ফলে পরিবহন খরচ বেড়ে খুচরা বাজারে দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তেলের দাম বাড়ার কারণে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ও পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করলেও বিষয়টি খাদ্যমূল্যের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

দ্রব্যমূল্যসংক্রান্ত টাস্কফোর্সবিষয়ক সভা শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে খাদ্যমূল্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে না। তারপরও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সহায়তার জন্য সরকারের অনেক সামাজিক কর্মসূচি আছে, টিসিবি আছে, দুই ঈদে আলাদা করে ট্রাক সেল করা হয়। এছাড়া ফ্যামিলি কার্ড আছে, সেটিও আস্তে আস্তে বিস্তার হবে।’

মূল্যস্ফীতি নিয়ে চিন্তিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘তদারকির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। প্রয়োজন হলে তদারকি আরো বাড়ানো হবে।’

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর