কক্সবাংলা ডটকম(১২ মে) :: বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ শুধু খাদ্যাভ্যাসের অংশ নয়, এটি দেশের ঐতিহ্য ও অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। দেশ-বিদেশে ইলিশের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে এর দামও।
ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকার প্রতি বছর বিভিন্ন সময়ে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তবে এসব নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে জেলেদের একাংশ দীর্ঘ সময় কর্মহীন হয়ে পড়ায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
মৎস্য গবেষকরা বলছেন, সরকারের ধারাবাহিক পদক্ষেপের ফলে গত দুই দশকে দেশে ইলিশের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নদী ও সাগরে মা ইলিশ সংরক্ষণ, জাটকা রক্ষা এবং নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ায় ইলিশের আকার ও ওজন আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সাম্প্রতিক দুই বছরে উৎপাদনে কিছুটা ভাটা পড়েছে বলে পরিসংখ্যান উঠে এসেছে।
ইলিশ রক্ষায় প্রধান নিষেধাজ্ঞা
ইলিশের প্রজনন ও বংশবিস্তার নিশ্চিত করতে সরকার বছরে কয়েক দফায় মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা :
প্রতি বছর আশ্বিন মাসের পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে অক্টোবর মাসে সারা দেশে মা ইলিশ ধরা বন্ধ রাখা হয়। ২০২৫ সালে এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ছিল ৪ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত। এই সময়ে মা ইলিশ ডিম ছাড়তে নদী ও মোহনায় আসে। ফলে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় নিরাপদে প্রজননের সুযোগ পায়।
জাটকা সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা :
১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ২৫ সেন্টিমিটারের কম আকারের ইলিশ বা জাটকা আহরণ, বিক্রি ও পরিবহন নিষিদ্ধ থাকে। এতে ছোট মাছ বড় হওয়ার সুযোগ পায়।
সাগরে ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা :
বঙ্গোপসাগরে মাছের নিরাপদ প্রজননের জন্য প্রতি বছর ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়।
এ ছাড়া জাটকা সংরক্ষণে চলতি বছর ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মেঘনা ও পদ্মার নির্দিষ্ট এলাকায় সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল থেকে হাইমচর উপজেলার চরভৈরবী পর্যন্ত প্রায় ৭০ কিলোমিটার এলাকায় এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে।
দুই দশকে বেড়েছে উৎপাদন, তবে সাম্প্রতিক সময়ে নিম্নমুখী
মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, ২০০৩-০৪ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৫৫ হাজার ৮৩৯ মেট্রিক টন। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে ৭১ হাজার মেট্রিক টন এবং সামুদ্রিক জলাশয়ে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৮৩৭ মেট্রিক টন ইলিশ আহরণ হয়।
পরবর্তীতে ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন বাড়তে থাকে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৪২ মেট্রিক টনে। তবে এরপর উৎপাদনের ধারা কিছুটা নিম্নমুখী হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ মেট্রিক টনে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও কমে প্রায় ৫ লাখ মেট্রিক টনে নেমে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী দূষণ, নাব্যতা সংকট, অপরিকল্পিত ড্রেজিং ও বালু উত্তোলনের মতো কারণ ইলিশ উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
গবেষণা ও সরকারি পদক্ষেপ
চাঁদপুর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা গেছে, ২০০৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে জাটকা সংরক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়। ২০০৫ সালে ইলিশের প্রধান প্রজনন এলাকাগুলোকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে মা ইলিশ রক্ষা, অবৈধ জালবিরোধী অভিযান, যৌথ টাস্কফোর্স অভিযান এবং জেলেদের জন্য খাদ্য সহায়তাসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়।
২০১৮ সাল থেকে জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া শুরু হয়। পাশাপাশি অভয়াশ্রম এলাকায় নজরদারি ও গবেষণামূলক কার্যক্রম আরও বাড়ানো হয়েছে।
যা বলছেন গবেষকরা
চাঁদপুর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক ড. আনিছুর রহমান বলেন, সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো ইলিশের জীবনচক্র রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণ কার্যক্রমের কারণে নদী ও সাগরে ইলিশের সংখ্যা বেড়েছে।
তিনি বলেন, “অক্টোবরে মা ইলিশকে নিরাপদে ডিম ছাড়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর জাটকা বড় হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময় মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়। এই জাটকাই ভবিষ্যতের ইলিশ। ফলে এসব পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক।”
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, জাটকা নিধন ও পরিবেশ দূষণ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারের উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে আবারও উৎপাদন বাড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
“সব প্রাকৃতিক মাছই কমছে”
ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্লাহ বলেন, “শুধু ইলিশ নয়, প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত প্রায় সব মাছের পরিমাণই কমছে। এর পেছনে পানির সংকট, নদীর নাব্যতা হ্রাস এবং দূষণ বড় কারণ।”
তিনি জানান, জেলেদের জন্য সরকার ভিজিএফের চাল সহায়তার পাশাপাশি বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রীও দিচ্ছে। এর আওতায় হাজার হাজার জেলেকে সয়াবিন তেল, আটা, আলু, চিনি, লবণ ও মসুর ডাল বিতরণ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশ রক্ষায় সরকারের বর্তমান পদক্ষেপগুলো কার্যকর হলেও উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে নদী রক্ষা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।













