বৃহস্পতিবার ১৪ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ও উচ্চ জন্মহারে কক্সবাজারে মানবিক বিপর্যয়ের শঙ্কা 

🗓 বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

👁️ ১৮ বার দেখা হয়েছে

🗓 বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

👁️ ১৮ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা রিপোর্ট :: বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী জেলা কক্সবাজারে নতুন অনুপ্রবেশ ও উচ্চ জন্মহারের কারণে রোহিঙ্গা সংকট দিন দিন আরও জটিল আকার ধারণ করছে।

প্রায় ২৮ লাখ জনসংখ্যার এই জেলায় এখন অতিরিক্ত প্রায় ২০ লাখ রোহিঙ্গার চাপ সামলাতে হচ্ছে। মাত্র ২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাসের ফলে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চল বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী এলাকাগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।

 উখিয়া ও টেকনাফ এলাকায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ হলেও সেখানে অবস্থানরত রোহিঙ্গার সংখ্যা তার প্রায় দ্বিগুণ। অতিরিক্ত এই জনসংখ্যার চাপ স্থানীয় অর্থনীতি, সামাজিক ভারসাম্য, আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নতুন করে আগতদের অধিকাংশই নারী ও শিশু হওয়ায় মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতার মাত্রাও বাড়ছে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিবন্ধিত শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৮৬৪ জনে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৭৯ হাজার বেশি।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর সর্বশেষ মাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত নতুন করে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৬৯ জন রোহিঙ্গা নিবন্ধিত হয়েছেন। শুধু এপ্রিল মাসেই আরও ২ হাজার ৭৮০ জন নতুনভাবে নিবন্ধনের আওতায় এসেছেন।

তথ্য অনুযায়ী, ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ১৯৯০ সাল থেকে বাস্তুচ্যুত মোট ১০ লাখ ৪৪ হাজার ৩৫৪ জন রোহিঙ্গাকে নিবন্ধন করেছে ইউএনএইচসিআর। তবে বিভিন্ন সূত্র বলছে, ক্যাম্পের ভেতরে ও বাইরে মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ২০ লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারে অবস্থান করছেন। এর মধ্যে ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ এবং মোট পরিবার সংখ্যা ২ লাখ ৪ হাজার ২৭৪টি।

জনসংখ্যাগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৫২ শতাংশ শিশু, ৪৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ৪ শতাংশ প্রবীণ। লিঙ্গভিত্তিক হিসাবে ৪৯ শতাংশ পুরুষ ও ৫১ শতাংশ নারী। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০ শিশু জন্ম নিচ্ছে। বছরে প্রায় ৩০ হাজার শিশুর জন্ম হওয়ায় সংকট আরও জটিল হয়ে উঠছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা সংকট, পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, রক্ষণশীল সামাজিক কাঠামো এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণে অনীহা— এসব কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জন্মহার অস্বাভাবিকভাবে বেশি। ফলে সরকারের “দুটির বেশি সন্তান নয়, একটি হলে ভালো” নীতির কার্যকর প্রয়োগ সেখানে সম্ভব হচ্ছে না।

ক্রমবর্ধমান এই জনসংখ্যার ভরণ-পোষণ, খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে চরম চাপে পড়েছে সরকার ও মানবিক সহায়তাকারী সংস্থাগুলো। বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো যৌথভাবে ২০২৫-২৬ সালের জেআরপি (জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান) বাস্তবায়নে ৯৩ কোটি ৪৫ লাখ মার্কিন ডলার সহায়তা চেয়েছে। এই পরিকল্পনার আওতায় প্রায় ১৫ লাখ মানুষের চাহিদা পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে মাত্র ২১ দশমিক ৭ শতাংশ অর্থায়ন নিশ্চিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন না পেলে স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে, জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার শিশুর শিক্ষা কার্যক্রম ঝুঁকিতে পড়বে। এর মধ্যে ৬৩ হাজার নতুন আগমনকারী শিশুও রয়েছে।

গত ১১ মে কক্সবাজার প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে এনজিও ও প্রতিনিধিদের মোর্চা (সিসিএনএফ)-এর কো-চেয়ারম্যান রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা ও প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করতে দ্রুত একটি শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিশন’ গঠন জরুরি। তিনি অভিযোগ করেন, প্রত্যাবাসন নিয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই এবং স্থানীয় জনগণও এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো রোডম্যাপ জানতে পারছে না।

তিনি আরও বলেন, উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল থাকায় প্রতিনিয়ত নতুন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটছে। একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, ক্যাম্পে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে এবং এটি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে দীর্ঘমেয়াদে বাধাগ্রস্ত করবে।

সিসিএনএফ নেতারা জানান, রোহিঙ্গা সংকটের কারণে ইতোমধ্যে কক্সবাজারের প্রায় ৮ হাজার একর বনভূমি ধ্বংস হয়েছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। বন ও পাহাড় উজাড়ের কারণে বন্য হাতিসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর বিচরণও সীমিত হয়ে পড়েছে।

প্রসঙ্গত, কক্সবাজারে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ১৯৭৭-৭৮ সালে প্রথম দফায় প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এরপর ১৯৯১ সালে দ্বিতীয় দফায় আসে আরও প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা। ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত নতুন করে প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয়।

তবে সবচেয়ে বড় ঢল নামে ২০১৭ সালে, যখন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার মুখে পড়ে প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, ২০২৪ সাল থেকে রাখাইনে নতুন করে সহিংসতা ও নিপীড়নের কারণে আরও প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করেছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে প্রথম ধাপে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে শনাক্ত করেছে মিয়ানমার। তাদের ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যে নতুন করে নির্মিত দুটি ট্রানজিট সেন্টার প্রস্তুত করা হয়েছে। টেকনাফ ও ঘুমধুম এলাকায় আরও দুটি ট্রানজিট সেন্টারও প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়।

বাংলাদেশ সরকার ২০১৮ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নিলেও নানা অজুহাতে মিয়ানমার এখন পর্যন্ত বাস্তবে একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত নেয়নি। ফলে দীর্ঘমেয়াদি এই সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনো অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর