কক্সবাংলা ডটকম(২০ এপ্রিল) :: ইরান যুদ্ধের জেরে জ্বালানি তেলের দাম বিশেষ করে ডিজেলের দাম একলাফে লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানোর পর পণ্যমূল্য, ব্যবসা-বাণিজ্য আর জীবনযাত্রায় এর প্রভাব কতটা পড়তে পারে তা নিয়ে শঙ্কা জেগেছে জনমনে।
জ্বালানির দাম বাড়ায় নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে । দাম বৃদ্ধির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তার সরাসরি ও পরোক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতিতে। জ্বালানির দাম বাড়লে প্রথমেই পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। এরপর শিল্প উৎপাদন, কৃষি সেচ এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যয় বাড়ে।
পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করে। ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বাড়ে। মোটাদাগে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি। এ ছাড়া মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়।
বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ তাদের আয় স্থির থাকলেও ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকে। ইতিমধ্যেই জ্বালানি সংকট কৃষি, শিল্প, যানবাহনসহ বিদ্যুৎ খাতেও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এ উদ্বেগ কাটাতে পণ্য ও সেবার মূল্য যাতে হুটহাট বেড়ে না যায় সেদিকে সরকারকে কঠোর নজর দেওয়ার তাগিদ এসেছে।
ব্যবসায়ী ও জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় পণ্য উৎপাদন ও পরিবহনের খরচ বাড়বে। সেই সঙ্গে গণপরিবহণের ব্যয়ও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে তা উসকে দিতে পারে মূল্যস্ফীতির পারদও, যা বেশ কয়েক বছর ধরে কাবু করে রেখেছে অর্থনীতিকে; ভুগছে সীমিত আয়ের মানুষও।
যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের বিবেচনায় সরকারের দাম বাড়ানোর এ পদক্ষেপের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন না বিশ্লেষকরা।
তবে তাদের তরফে এর প্রভাব কী হতে পারে তা নিয়ে বিপরীতমুখী বক্তব্য এসেছে।
একজন বিশ্লেষক বলছেন, ডিজেলের দাম বাড়ানোর কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়বে, যা সরাসরি পণ্যমূল্য বাড়াবে। আরেকজন বলছেন, যুদ্ধের আগেই নানা বিষয়ের দোহাই দিয়ে বেশ কিছু পণ্যের দাম আগেই বেড়ে গেছে। এখন আবার নতুন করে দাম বাড়ানোর কারণ দেখছেন না তিনি।
আরেকজন বিশ্লেষক দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকার ‘নিরুপায়’ ছিল মন্তব্য করে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার উসিলায় যতটুকু বেড়েছে সেটির তুলনায় ‘অযৌক্তিকভাবে’ যাতে সেবা বা পণ্যের মূল্য না বাড়ে সেজন্য সরকারকে কঠোর তদারকির তাগিদ দিয়েছেন।
আর ভোক্তাদের তরফে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) মনে করছে, ফিলিং স্টেশনে ক্রেতাদের দীর্ঘ অপেক্ষার পরও তেল না পাওয়ার এই সময়ে জ্বালানির তেলের দামবৃদ্ধি মজুতদারদের ‘উৎসাহিত’ করবে। সংগঠনটি একবারে অনেক দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ‘আত্মঘাতী’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
অপরদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল পৃথক বিবৃতিতে সরকারি এ সিদ্ধান্তে গভীর ‘উদ্বেগ’ প্রকাশ করে অবিলম্বে তা ‘পুনর্বিবেচনার’ আহ্বান জানিয়েছে। এসব দলের নেতাদের কেউ আবার জ্বালানির ‘বিকল্প সন্ধানের’ পরামর্শ দিয়েছেন।
এদিকে যানবাহনের ভাড়া বাড়াতে সরকারের সঙ্গে বসেছেন পরিবহন মালিকরা।
মাসুম বিল্লাহ নামে বেসরকারি একজন চাকুরিজীবী এ নিয়ে ফেইসবুকে ‘একি আজব কারখানা!’ ক্যাপশনে পোস্ট দিয়ে লিখেছেন, “ডিজেলের দামতো ২০২২ সালে ১১৪ টাকায় উঠেছিল, অকটেনের দাম ছিল ১৩৫ টাকা। এবার যেটা ১১৫ এবং ১৪০ টাকা।
“তখন যে জিনিসপত্রের দাম এবং পরিবহন ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল, তা কি কোনোকালে কমেছিল?”
শনিবার রাতে চার ধরনের তেলের দাম প্রতি লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেয় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ; যা মধ্যরাত থেকেই কার্যকর হয়েছে।
সরকারের নতুন দর অনুযায়ী, লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ডিজেলের দাম ধরা হয়েছে ১১৫ টাকা। অকটেনে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০, পেট্রোলে লিটারে ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ এবং কেরোসিনে লিটারপ্রতি ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজার চড়তে থাকার কারণে এবার এক লাফে তা ১০ শতাংশের বেশি বাড়ানো হল।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এর আগে জেট ফুয়েলের দর বাড়ানো হয় কয়েক দফায়। দাম বেড়েছে ফার্নেস অয়েলেরও।
‘এখন আবার দাম বাড়লে পরিবার চলবে?’
মিরপুরের এক বাসায় নিরাপত্তা কর্মী হিসেবে ১১ বছর কাজ করছেন আব্দুল জলিল। পরিবারের দুই কন্যা ও স্ত্রীর সংসার সামলাতে বরিশালের এ বাসিন্দা ৭ হাজার টাকা বেতনে শুরু করেছিলেন এ কাজ। এখন বেতন পান ১২ হাজার টাকা। অথচ মূল্যস্ফীতি হয়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে।
এ টাকায় পরিবারের সদস্যদের দুমুঠো ডালভাতের জোগান দিতে হিমশিম খাওয়ার গল্প বলার মধ্যে নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর খবরে দুশ্চিন্তা বেড়েছে তার।
কথায় কথায় জলিল বললেন, “এত টাকা বাড়ল তেলের দাম, তাও তো মানুষ পায় না। দাম আরও বাইড়া যাইব। তহন সবকিছুর দাম বাড়ব। এই বেতনে সংসার কেমনে চলবে?”
শুনবেন কত বেতন পাই?- এমন প্রশ্ন রেখে নিজেই উত্তর দেন, ১২ হাজার টাকা। এ টাকায় তো চলে না। এখন আবার দাম বাড়লে পরিবার চলবে?
“এহন ঘরে খাওনের মানুষ কম। তাও চিন্তায় আছি। বড় মাইয়াটারে নভেম্বরে তুইলা দিছি (বিয়ে দিয়েছেন)। ছোট মাইয়া এসএসসি পরীক্ষা দিব। কিছু যে কিনা দিমু পারি না।
“এর মধ্যে সব কিছুর দাম বাড়লে কই যামু? ঢাকায়তো খরচ বেশি। ভাবছি চইলা যামু (চাকরি ছেড়ে)। ঈদের বোনাস যে ট্যাকা দেয় নিয়া বাড়ি যাইয়া গরু কিনা পালমু। বাকি টাকা কিস্তিতে নিমু। এই টাকায় তো আর সবাই মিলে খাইতে পারমু না।”
এতটা দুর্দশাগ্রস্ত না হলেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় চিন্তায় পড়েছেন ফল ব্যবসায়ী মনির হোসেন। বিক্রিবাট্টা কমলে সংসার চালাতে দায়দেনায় পড়ার আশঙ্কা তার।
“এখন দাম তো নিয়ন্ত্রণে। তাইই ক্রেতা আসে না। আইলেই দাম শুনে ভাবে, দাম বাইড়া গেছে।
“দাম বাড়া তো শুরুই হয় নাই। বিক্রি কমলে কী করুম, কেমনে চলুম, ঘর চালামু কেমনে জানি না।”
সরকারের কী হিসাব নিকাষ
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সার্বিক প্রভাব জীবনযাত্রায় ফেলবে বলে মনে করছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুও।
আগের রাতে দাম বাড়ানোর পর রোববার দিনের বেলা সচিবালয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “দাম বাড়া মানেই বিরূপ প্রভাব পড়া।
এই যুদ্ধে শুধু বাংলাদেশ না, সারা পৃথিবীর প্রতি প্রভাব পড়েছে। আমাদের ওপরও সেই প্রভাব আছে।”
দাম বাড়ানোর বিষয়ে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, আমদানি খরচ বেশি হওয়ায় সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে।
“এটা করতে বাধ্য হয়েছি আমরা। কারণ এটা বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে কিনতে হয় এবং আমরা যেন সহনীয় লেভেলে থাকতে পারি, সেই ব্যবস্থা করেছি।”
তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধ লাগার পর যে দরে আমদানি করে মজুদ বাড়ানো হয়েছে, নতুন দর সেটির নিচে রেখেই সমন্বয় করা হয়েছে।
চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এমন এক সময়ে বাড়ানো হয়েছে যখন সরকার ভর্তুকি কমাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্তপূরণের চাপের মধ্যে রয়েছে। সংস্থাটির ঋণের পরবর্তী কিস্তি পেতে দেন দরবার চালাচ্ছে সরকার। অর্থায়নকারী সংস্থাটি জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাজারভিত্তিক করার শর্ত দিয়ে রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে আইএমএফ-বিশ্ব ব্যাংকের বসন্তকালীন সভায় অংশ নেওয়ার পর দেশে ফিরে রোববার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, “তেলের মজুদ কিন্তু আমরা ঠিক রাখছি। আমরা যদি সরবরাহ ঠিকমতো রাখি, এই যে সাময়িক যতটুকু বেড়েছে, এটার সাথে সাথে আরো অনেকগুলো ইস্যু আছে।
“তেলের দাম একা তো মূল্যস্ফীতি বাড়ায় না। এটা একটা মূল কথা। খালি তেলের দামের জন্য কি মূল্যস্ফীতি বাড়বে? এর সঙ্গে তো সব খাত সম্পৃক্ত।”
মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব পড়বে?
দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি গত মার্চে কমে হয়েছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। একমাস আগেও যা ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ মূল্যস্ফীতির হার দিয়ে বোঝায়, গত বছর মার্চ মাসে যে পণ্য বা সেবা ১০০ টাকায় মিলেছে, তা চলতি বছরের মার্চে পেতে খরচ করতে হয়েছে ১০৮ টাকা ৭১ পয়সা।
জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ানোর ফলে নিত্যপণ্যের মূল্য বাড়লে তা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম।
পাশাপাশি জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন খাতে ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে’ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার শঙ্কাও তার। এ বিষয়ে সরকারকে নজর রাখার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “সেটাকে (পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া বৃদ্ধি) সরকারকে আরও কঠোরভাবে এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে যাতে যতটুকু বাড়ার কথা, তার বাইরে যেন বেশি না বাড়ায়।
“কারণ অকটেন, পেট্রোলে যতটা না, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে মুল্যস্ফীতিতে তার একটা বড় প্রভাব আসে। আর এই দাম বৃদ্ধিতে আমার মনে হয় না চাহিদা কমবে, তবে মজুদ কমতে পারে। পরিবহনের ব্যয় বাড়লে সব কিছুরই দাম বাড়বে।”
তবে তেলের দাম নতুন করে বাড়ানোর ফলে মূল্যস্ফীতিতে তেমন কোনো ‘পার্থক্য হবে না’ বলে মনে করছেন বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।
তার মতে, সরকারের ভর্তুকির সুফল কৃষকরা তেমন পাচ্ছেন না। বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার পরও ধনীদের জন্য গাড়ির অকটেনের দাম কম রেখে সরকারের ভর্তুকি চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা নেই।
জাহিদ হোসেন বলেন, “আমার তো মনে হয়, তেমন কোনো ডিফারেন্স হবে না। কারণ প্রভাব যা পড়ার সেটাতো আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে এরইমধ্যে আমাদের বাজারে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে পড়ছে।”
তেলে সংগ্রহে কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ায় প্রভাবও মূল্যস্ফীতিতে পড়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আপনি জ্বালানির আসল মার্কেটটা দেখেন যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পেট্রোল পাম্পে যে লম্বা লাইন, এই লম্বা লাইনে আপনি টাকায় মূল্য না দিলেও সময়ের মূল্য তো পাঁচ-ছয় ঘণ্টা, দশ ঘণ্টা দিচ্ছেন। ওটা তো আর মূল্যস্ফীতিতে আসছে না। কিন্তু আপনার ভোগান্তি তো ওখানে আছেই।
“তারপরে সরকারের কাছ থেকে কম দামে কিনে কালোবাজারে যে বেশি দামে বিক্রি করছে এই ডিজেলটা, আমি পত্রিকায় দেখলাম কৃষকরা ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা দিয়ে ডিজেল কিনছে। তাও পাচ্ছে না। তো ওই ১২৫ বা ১৩০ টাকা কী আমার এই মূল্যস্ফীতির হিসেবে ঢুকছে? কিন্তু কৃষক তো ঠিকই দিচ্ছে মূল্যস্ফীতিটা। সরকারি হিসাবে আসছে না।”
তিনি বলেন, “তাহলে কে পাচ্ছে? যারা কালোবাজারে ব্যবসা করছে। পাম্প থেকে রেটে ডিজেল কিনে যেখানে দাম বেশি সেখানে বিক্রি করছে। ওরাই তো এই ভর্তুকিটা নিয়ে যাচ্ছে।”
বিশ্ব বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার তুলনায় দেশে যতটুকু বাড়ানো হয়েছে তা এখনও ‘যথেষ্ট না’ মন্তব্য করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, “আপনার রাজস্ব আয় নাই, ভর্তুকি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি অর্থায়নের সংকটে বাস্তবায়ন করতে পারছেন না।
“সেখানে আপনি আমরা যারা অকটেন ব্যবহার করি, গাড়িওয়ালারা, জেনারেটর ব্যবহারকারীরা–এই উচ্চ মধ্যবিত্ত বা ধনীদের ভর্তুকি দিয়ে তেল সরবরাহ করবেন, এটাতো সুসময়েও যৌক্তিক না। অসময়ের কথা বাদই দিলাম।”
তবে সরবরাহ সংকটের মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার তাতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে কি না তা ‘সময়ের ওপর’ ছেড়ে দেওয়ার কথা বলছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু।
মূল্যস্ফীতির বিষয়টিকে চাহিদা ও সরবরাহনির্ভর বিষয় হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, “বাড়তে পারে, আবার নাও বাড়তে পারে। এটা সময়ের ওপর নির্ভর করে।”
ব্যবসায়-বাণিজ্যে কী প্রভাব
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “তেলের দাম বাড়ার প্রভাবটা সার্বজনীন। রপ্তানি পোশাকেরও খরচ এতে বাড়বে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যেহেতু আমাদের প্রতিষ্ঠানে ডিজেল লাগে, আবার পণ্য পরিবহনেও জ্বালানির একটা ভূমিকা আছে, সব মিলিয়ে প্রভাব পড়বে।”
ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের এই উদ্যোক্তা বলেন, ”তবে, সান্ত্বনার ব্যাপার হচ্ছে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম বেড়েছে। শুধু আমাদের এখানে তো না। সেক্ষেত্রে পুরো পোশাক রপ্তানির চেইনেই এর প্রভাব পড়বে। এখন মূল বিষয় হচ্ছে কোন দেশ এটা কত ভালোভাবে ট্যাকল করতে পারে। আমাদের দেশ কীভাবে সামলাবে, সেটাই দেখার বিষয়।”
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, “সরকার যেহেতু তেলের দাম বাড়িয়েছে, সব কিছুতেই এটার প্রভাব পড়বে। আমাদের কোল্ড স্টোরেজগুলোতে যে জেনারেটর চলে, সেখানে ডিজেল লাগে, কাজেই সেখানে প্রভাব পড়বে। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, পণ্য পরিবহনে খরচ বাড়বে।“
বিদ্যুতের দাম বাড়ানো নিয়ে গুঞ্জনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “সরকার যদি বিদ্যুতের দাম বাড়ায়, সেটার প্রভাব অবশ্যই স্বাভাবিকভাবেই অন্য সব কিছুতে পড়বে। দ্রব্যমূল্য বাড়বে। ভোক্তাদের ওপর সেটার প্রভাব এসে পড়বে।
চাহিদা অনুযায়ী তেল ও গ্যাস না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “জ্বালানি নিয়ে যা হচ্ছে, এটা ‘গুড গভর্ন্যান্স’ না। এটা সুশাসন না। আমাদের পাশ্ববর্তী ভারত এমনকি পাকিস্তানেও জ্বালানির সমস্যা নেই। তাহলে আমাদের কেন সমস্যা হবে?
“আমাদের পরিশোধিত জ্বালানি কেন নাই, কেন মজুদ কম সেটা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়। আমি মনে করি বেসরকারিভাবে জ্বালানি মজুদ, পরিশোধনাগার গড়ে তুলতে হবে। এ বিষয়ে দ্রুত সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই সুযোগ দিতে হবে। আর একটা জিনিস আমাদের রাজস্ব আদায়ের হার বাড়াতে হবে। এটা অন্তত ১৫ শতাংশে নিতে হবে সরকারকে। এসব সমস্যা সমাধানে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।”
তেলের দাম বাড়ার ফলে পণ্যমূল্য আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন পাইকারি ও খুচরা বাজারের ব্যবসায়ীরাও।
কারওয়ান বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী মো. নুরুজ্জামান বলেন, “আমি চাল পাইকারি বিক্রি করি। এখন চালের যে হাস্কিং মিলগুলো, সেগুলোর অধিকাংশই ডিজেল নির্ভর। দাম বাড়ার কারণে এদের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। ফলে চালের দাম বাড়বে বস্তায়, সেটা আসবে ক্রেতাদের ঘাড়ে। এভাবে প্রায় সব কিছুর সঙ্গেই তেলের দাম বাড়ার যোগসাজশ আছে।”
সাত তলা কাঁচাবাজারের মুদি মালামাল বিক্রেতা ফারুক হোসেন বলছিলেন, “আমরা যে মালামাল আনি, তাতে যে পিকআপ ভাড়া লাগে, সেটা বাড়বে। তখন আমাদের মালামালের দাম বাড়াতে হবে। মোট কথা, তেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব পড়বেই।”
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান সংকটের এ সময়ে জ্বালানির দাম বাড়ানোকে ‘আত্মঘাতী’ সিদ্ধান্ত হিসেবে তুলে ধরে বলেন, “এতে খোলাবাজারে মজুতদাররা উৎসাহিত হবে। সব খাতের ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহন, উৎপাদনে এটার একটা প্রভাব অবশ্যই পড়বে। শেষ পর্যন্ত জিনিসপত্রের দাম বাড়বে, যা ভোক্তাকে বহন করতে হবে। আসলে সব কিছুর সঙ্গেই জ্বালানির দামের প্রভাব রয়েছে।”
পাকিস্তানের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “পাকিস্তানে আমরা যেটা দেখলাম, সরকার জ্বালানির দাম কমিয়ে জ্বালানি ব্যবস্থাপনাকে একটা পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। কিন্তু, আমাদের এখানে জ্বালানির উল্টো দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে করে সংকট সামাল দিতে গিয়ে জ্বালানির দাম আবারও বাড়াতে হতে পারে।”
দরকার ‘কঠোর মনিটরিং’
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকার ‘নিরুপায়’ ছিল মন্তব্য করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “কারণ এই বাড়তি ব্যয় কন্টিনিউয়াসলি ম্যানেজ করাটাও একটা চ্যালেঞ্জ। সেই কারণে এই মূল্য সমন্বয়ের একটা যৌক্তিকতা হয়ত আছে। কারণ সরকার তো মূল্যবৃদ্ধির (বৈশ্বিক বাজারে) পরেও দাম না বাড়িয়ে এতদিন পর্যন্ত ছিল এবং নিজস্ব অর্থ দিয়ে সেটা হয়ত ম্যানেজ করার চেষ্টা করেছে।
“তবে আমাদের প্রত্যাশা ছিল যে গণপরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কৃষির সঙ্গে সরাসরি ব্যবহৃত হওয়ায় ‘ডিজেলকে দাম বৃদ্ধির আওতামুক্ত রাখা হবে। হয়ত পেট্রোল-অকটেনের দাম বাড়বে। কিন্তু ডিজেল যুক্ত হবার কারণে এর সামগ্রিক অভিঘাতটি, অর্থনৈতিক অভিঘাতটি অনেক বেড়ে গেল।”
এর ব্যাখ্যায় এ গবেষক বলেন, “ডিজেল যেহেতু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অনেকভাবে ব্যবহার হয়। কৃষি উৎপাদনে, পরিবহনে, শিল্প-কারখানায়, বিদ্যুৎ উৎপাদনে এবং বিভিন্ন ধরনের সেবা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালে। সুতরাং এর ফলে প্রত্যেকটি জায়গায় এর প্রতিক্রিয়া পড়বে এবং মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা ঘটবে।”
তবে যে হারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে তার তুলনায় ‘অযৌক্তিকভাবে’ সংশ্লিষ্ট সেবা বা পণ্যের মূল্য যেন বেড়ে না যায়, সেজন্য সরকারকে ‘কঠোর তদারকির’ পরামর্শ দেন তিনি।
এজন্য সকল ক্ষেত্রে পণ্যের ও সেবার মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে সরকারকে সম্পৃক্ত থাকারও পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “যদি এগুলো সরকার কঠোরভাবে মনিটর না করে, তাহলে দেখা যাবে যে, যে মাত্রায় মূল্যস্ফীতিজনিত অভিঘাত হওয়ার কথা, তার থেকে আরও বেশি মাত্রায় ভোক্তা পর্যায়ে এর অভিঘাত পড়তে পারে।”
এবার এলপিজি’র দাম বাড়লো ২১২ টাকা
দেশের বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বাড়িয়েছে সরকার। ভোক্তা পর্যায়ে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৯৪০ টাকা।
এতে এলপিজি’র ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ২১২ টাকা বাড়লো। এই নিয়ে এক মাসে দুইবার এলপিজি’র সিলিন্ডারের দাম বাড়ানো হয়েছে।
গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে দাম বাড়ানোর বিষয়টি জানিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন দর রোববার সন্ধ্যা থেকেই কার্যকর হবে।
এর আগে সবশেষ গত ২রা এপ্রিল চলতি মাসের জন্য ভোক্তা পর্যায়ে এলপিজি’র দাম সমন্বয় করা হয়েছিল।
ওইদিন ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ হাজার ৭২৮ টাকা। অর্থাৎ, এলপিজি’র ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ২১২ টাকা বাড়লো।














