সোমবার ২৫ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পুঁজিবাজারে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতায় এখনো অর্থনীতির প্রধান অর্থায়নে উৎস হয়ে উঠেনি

🗓 রবিবার, ০৩ মে ২০২৬

👁️ ৯১ বার দেখা হয়েছে

🗓 রবিবার, ০৩ মে ২০২৬

👁️ ৯১ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(৩ মে) :: দেশের মোট স্থায়ী মূলধন গঠনের (গ্রস ফিক্সড ক্যাপিটাল ফরমেশন—জিএফসিএফ) তুলনায় পুঁজিবাজারের অবদান এখনো অত্যন্ত সীমিত—মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ। সাত দশকের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও দেশের পুঁজিবাজার এখনো অর্থনীতির প্রধান অর্থায়ন উৎস হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি।

বাংলাদেশে পুঁজিবাজারের সূচনা ১৯৫৬ সালে হলেও স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে আনুষ্ঠানিক লেনদেন শুরু হয়। সেই হিসাবে পাঁচ দশকের বেশি সময় পার হলেও শিল্প ও বিনিয়োগে প্রয়োজনীয় মূলধন জোগানে বাজারটির ভূমিকা আশানুরূপ নয়। বরং অর্থায়নের ক্ষেত্রে এখনো ব্যাংক খাতই প্রধান ভরসা হয়ে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে পুঁজিবাজারে মোট ইস্যুকৃত মূলধনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা, যা ডলার হিসাবে প্রায় ৮ দশমিক ৪১ বিলিয়ন।

অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশের মোট স্থায়ী মূলধন গঠনের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩৮ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। এই হিসাবে পুঁজিবাজার থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অংশ খুবই নগণ্য।

জিএফসিএফ বলতে মূলত একটি দেশের উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অবকাঠামো, শিল্পকারখানা, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগের মোট পরিমাণকে বোঝায়। সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগও এতে অন্তর্ভুক্ত থাকে।

বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিতে শিল্পায়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে পুঁজিবাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও বাংলাদেশে চিত্রটি ভিন্ন। এখানে শিল্পখাতে অর্থায়নের বড় অংশই আসে ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে।

সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট ব্যাংক ঋণের প্রায় ৪৩ শতাংশ শিল্পখাতে বিনিয়োগ হয়েছে, যার পরিমাণ ৭ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

অন্যদিকে পুঁজিবাজার থেকে একই খাতে অর্থায়ন তুলনামূলকভাবে অনেক কম—ব্যাংক ঋণের তুলনায় কয়েকগুণ পিছিয়ে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের চাপ পড়ে ব্যাংক খাতের ওপর, যা খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশই শিল্প খাত সংশ্লিষ্ট।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পুঁজিবাজার থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন বাড়ানো গেলে ব্যাংকের ওপর চাপ কমবে এবং কোম্পানিগুলোর তহবিল সংগ্রহ ব্যয়ও হ্রাস পাবে।

আইপিও খরা ও আস্থার সংকট

গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) কার্যত স্থবির। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সর্বশেষ ৯টি কোম্পানি বাজার থেকে ৮৪১ কোটি টাকা সংগ্রহ করলেও এরপর আর কোনো নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি। এত দীর্ঘ সময় ধরে আইপিও না আসার ঘটনা বাজার সংশ্লিষ্টদের কাছে নজিরবিহীন।

বিশ্লেষকদের মতে, বাজারের ধারাবাহিক নিম্নমুখিতা, শেয়ারের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার আশঙ্কা এবং অতীতের অনিয়ম-কারসাজির কারণে উদ্যোক্তারা পুঁজিবাজারমুখী হচ্ছেন না। ফলে ভালো মানের নতুন শেয়ারেরও ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত মোট সিকিউরিটিজের সংখ্যা ৬৪৫টি হলেও এর মধ্যে কোম্পানি মাত্র ৩৬০টি। এদের মধ্যেও বেশ কিছু কোম্পানি উৎপাদন বন্ধ রেখেছে বা আর্থিকভাবে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বৈচিত্র্যের অভাব ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনো মূলত ইকুইটি নির্ভর। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে বন্ড, ডেরিভেটিভস, কমোডিটি এবং অবকাঠামো প্রকল্পভিত্তিক বিভিন্ন আর্থিক পণ্যের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করা হয়।

দেশে সিকিউরিটাইজেশনের মাধ্যমে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়নের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা থাকলেও তা বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ খাতে নীতিগত উদ্যোগ নেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

বিদেশি বিনিয়োগে ধারাবাহিক পতন

পুঁজিবাজারের পরিপক্বতা নির্ধারণে বিদেশি বিনিয়োগ একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কিন্তু গত এক দশকে এ খাতে বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ ঋণাত্মক অবস্থায় পৌঁছেছে, যা বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়।

করণীয় কী

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, পুঁজিবাজারকে কার্যকর করতে হলে নীতিগত সংস্কার, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন কাঠামো থেকে বের হয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মডেলে যেতে হবে, যেখানে বড় প্রকল্পে ব্যাংক ও পুঁজিবাজার উভয়ের অংশগ্রহণ থাকবে।

এছাড়া আইপিও প্রক্রিয়া সহজ করা, কর্পোরেট গভর্ন্যান্স জোরদার করা এবং ভালো কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করতে প্রণোদনা দেওয়া হলে বাজারে আস্থা ফিরতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সব মিলিয়ে, দেশের অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা এখন আর বিকল্প নয়—বরং এটি সময়ের অপরিহার্য দাবি।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর