কক্সবাংলা ডটকম(৮ মে) :: দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে স্বস্তি নেই। একের পর এক বাড়ছে চাল, ডিম, ভোজ্যতেল, সবজি, মাছ-মাংস ও এলপিজি গ্যাসের দাম। পাইকারি থেকে খুচরা—সব পর্যায়েই মূল্যবৃদ্ধির চাপ পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।
বিশেষ করে সীমিত আয়ের পরিবারগুলো ক্রমেই দিশেহারা হয়ে পড়ছে। সংসারের ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে অনেকেই খাদ্যতালিকা থেকে পুষ্টিকর খাবার কমিয়ে দিচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে এবং টিসিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত তিন মাসে বেশ কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। কাঁচা পেঁপের দাম কেজিতে ১৫০ থেকে ১৬৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বেগুনের দাম বেড়েছে ৬০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত। কাঁচকলার হালি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৬০ টাকায়। কয়েক মাস স্থিতিশীল থাকার পর ফের বেড়েছে ডিমের দামও। বর্তমানে প্রতিডজন ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায়।
এ ছাড়া সয়াবিন তেল, চিনি ও চালের দামও বেড়েছে। বাজারে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২০০ টাকায়। মাঝারি মানের চালের দাম কেজিপ্রতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ থেকে ৬৮ টাকায়।
সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করেছে রান্নার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি। ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি নির্ধারিত দাম এক হাজার ৯৪০ টাকা হলেও ভোক্তাদের অনেক জায়গায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। তিন মাসের ব্যবধানে এই গ্যাসের দাম প্রায় ৪৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। ডিজেলের দাম বাড়ার পর ট্রাকভাড়া কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে বাজারে। পাশাপাশি বৃষ্টি ও সরবরাহ সংকটের কারণেও সবজির দাম কমছে না।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে, যা মার্চে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, টানা কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৮ থেকে ৯ শতাংশের ঘরে অবস্থান করায় মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। আগে যে পণ্য ১০০ টাকায় কেনা যেত, এখন তার জন্য খরচ করতে হচ্ছে ১০৮ থেকে ১০৯ টাকা। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর চাপ বাড়ছে বহুগুণে।
রাজধানীর বাড্ডার বেসরকারি চাকরিজীবী ইকরামুল হক বলেন, “সংসারের খরচ সামলাতে এখন রুই-কাতলা মাছ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। পাঙ্গাশ আর তেলাপিয়া কিনেই চলতে হচ্ছে। মাস শেষে বেতনের টাকা আর টিকছে না।”
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, জ্বালানি তেল, এলপিজি গ্যাস ও পরিবহনভাড়া বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অনেক ব্যবসায়ী পণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন। কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি খুব কম দেখা যাচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, ভ্যাট ও করের চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই এসে পড়ে। তাই সাধারণ মানুষের স্বস্তির জন্য টিসিবির কার্যক্রম সম্প্রসারণ, খাদ্যপণ্যে কর-শুল্ক কমানো এবং বাজারে সিন্ডিকেট ও মজুদদারি নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে মানুষের দুর্ভোগ কমবে না। বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা, পাইকারি পর্যায়ে একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙা এবং কৃষিপণ্যের সরাসরি বিপণন ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
অর্থনীতিবিদ ও ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু আলোচনা নয়—এখন প্রয়োজন কার্যকর বাজার তদারকি। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবনযাত্রা আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।














