মঙ্গলবার ২৬ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৬ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নেতৃত্বে শেখ হাসিনাই, ‘রিফাইন্ড’ আওয়ামী লীগের গুঞ্জন থামছে না

🗓 মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬

👁️ ১৭ বার দেখা হয়েছে

🗓 মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬

👁️ ১৭ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(২৬ মে) :: আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এখনো নিষিদ্ধ। তবে দলটির রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন নিয়ে আলোচনা থেমে নেই। রাজনৈতিক অঙ্গনে মাঝেমধ্যেই নতুন করে সামনে আসছে ‘আওয়ামী লীগ ইস্যু’।

বিশেষ করে বিকল্প নেতৃত্বে বা ‘রিফাইন্ড’ অবয়বে দলটির ফেরার গুঞ্জন গত কয়েক মাসে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু দলটির ভেতরের বিভিন্ন সূত্র বলছে, আপাতত নেতৃত্বে কোনো পরিবর্তন আসছে না। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বে থাকছেন শেখ হাসিনাই।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণআন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী পদে থাকা অবস্থায় দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তার সঙ্গে দলটির বহু শীর্ষ নেতাও দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। এতে গভীর সংকটে পড়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা দলটি। পরে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে এবং পরবর্তীতে বর্তমান সরকার সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে সেই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে।

এর মধ্যেই বিভিন্ন সময়ে সাবেক পরিবেশমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী, সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, নারায়ণগঞ্জের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ এবং সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে সামনে রেখে একটি ‘পরিশোধিত’ বা ‘রিফাইন্ড’ আওয়ামী লীগ গঠনের আলোচনা রাজনৈতিক মহলে জোরালো হয়। তবে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড এখন স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে— দল পুরনো নেতৃত্ব ও পুরনো কাঠামো নিয়েই এগোবে।

দলটির সাম্প্রতিক তৎপরতা, নেতাদের অডিওবার্তা এবং মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের অবস্থান বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগ বড় ধরনের সাংগঠনিক সংস্কারের পথে না গিয়ে আগের রাজনৈতিক ধারা ও পরিচিত নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করেই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।

৫ আগস্ট-পরবর্তী সংকটে আওয়ামী লীগের ভেতর থেকেই নেতৃত্বে পরিবর্তনের দাবি উঠেছিল। তুলনামূলক তরুণ বা গ্রহণযোগ্য ইমেজের নেতাদের সামনে এনে দল পুনর্গঠনের আলোচনাও ছিল জোরালো।

বিশেষ করে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কারণে সাবের হোসেন চৌধুরীকে ঘিরে আলোচনার সৃষ্টি হয়। তার গ্রেপ্তার, দ্রুত জামিন এবং কয়েকজন বিদেশি কূটনীতিকের সঙ্গে বৈঠকের খবর সেই জল্পনাকে আরও উসকে দেয়।

এছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, সোহেল তাজ কিংবা ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকেও সম্ভাব্য বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে আলোচনা করা হয়। সবশেষ সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর গ্রেপ্তার ও দ্রুত জামিন নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দেখা যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ ধারণার মূল উদ্দেশ্য ছিল জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলির দায় এড়িয়ে অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য একটি রাজনৈতিক অবয়ব তৈরি করা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সমঝোতার পথ খোঁজা।

কিন্তু দলের ভেতরের কঠোর অবস্থান ও শেখ হাসিনাকেন্দ্রিক সাংগঠনিক বাস্তবতায় সেই উদ্যোগ বাস্তব রূপ পায়নি।

দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, এই ফর্মুলা ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণ হলো আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামো এখনো পুরোপুরি শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধু পরিবারের ওপর নির্ভরশীল। তৃণমূলের বড় অংশ মনে করে, শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে নতুন নেতৃত্ব আনা হলে দল ভেঙে পড়বে।

অন্যদিকে, দলটির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া আইনি চাপের কারণেও তারা মনে করছেন, এই মুহূর্তে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের বিশ্বাস, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণই এখন দলের প্রধান ভরসা।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হওয়া শেখ হাসিনার বিভিন্ন অডিওবার্তা এবং নেতাকর্মীদের প্রতি দেওয়া নির্দেশনা থেকেও স্পষ্ট হয়েছে, দলের নিয়ন্ত্রণ এখনো তার হাতেই রয়েছে। আওয়ামী লীগের ভেতরে কোনো বিকল্প নেতৃত্ব বা ‘সেকেন্ড-ইন-কমান্ড’কে কার্যকরভাবে সামনে আনা হচ্ছে না।

দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করলেও নিয়মিতভাবে ভার্চুয়াল ও সরাসরি বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন।

এসব বৈঠকে কখনো সভাপতিত্ব করছেন মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, কখনো জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবার কখনো সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। দেশে সাংগঠনিক তৎপরতা সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছেন আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। তবে একসময় প্রভাবশালী সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে এখন তুলনামূলক কম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও দলীয় সূত্রের দাবি।

সূত্র জানায়, শুরুতে শেখ হাসিনা নিজেকে দলীয় নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিলেও সিনিয়র নেতারা তাতে সম্মত হননি। তাদের বক্তব্য ছিল— “আওয়ামী লীগ মানেই শেখ হাসিনা, আর শেখ হাসিনা মানেই আওয়ামী লীগ।”

বর্তমানে সরাসরি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ সীমিত থাকায় আওয়ামী লীগ স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচনকে রাজনৈতিক পুনঃপ্রবেশের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করছে। অনেক জায়গায় স্বতন্ত্র প্রার্থী বা পরোক্ষ সমর্থনের মাধ্যমে নিজেদের জনভিত্তি ধরে রাখার কৌশলও নেওয়া হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. স ম আলী রেজা মনে করেন, গত ১৫ বছরের শাসনামলে মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি কিংবা জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সহিংসতার মতো বিষয়গুলো নিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো অনুশোচনা বা আত্মসমালোচনা দেখা যায়নি। বরং দলটি এখনো ঘটনাগুলোকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে তুলে ধরার রাজনৈতিক অবস্থানেই রয়েছে।

তার মতে, গণতান্ত্রিক দল হিসেবে জন্ম নেওয়া আওয়ামী লীগ শেষ সময়ে কর্তৃত্ববাদী চরিত্র ধারণ করেছিল। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ফিরে আসতে হলে দলটিকে অতীতের ভুলের দায় স্বীকার, আইনি প্রক্রিয়া মোকাবিলা এবং সাংগঠনিক সংস্কারের পথেই হাঁটতে হবে। অন্যথায় পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির গ্রহণযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর