কক্সবাংলা ডটকম(২৭ জুলাই) :: প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাইরে তৃতীয় কোনো দেশে ‘রিটার্ন হাব’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে ইউরোপের পাঁচ দেশ। জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস ও গ্রিস যৌথভাবে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করছে। এর আওতায় আশ্রয়ের আবেদন চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যাত হলে বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আগ পর্যন্ত অস্থায়ীভাবে তৃতীয় কোনো দেশে রাখা হতে পারে।
কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য হোস্ট দেশ হিসেবে কেনিয়া, উগান্ডা, ঘানা, রুয়ান্ডা, বেনিন, মৌরিতানিয়া এবং উজবেকিস্তানের সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা চলছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো দেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি।
বিশেষ করে গ্রিস সাম্প্রতিক সময়ে এ উদ্যোগে সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। দেশটির অভিবাসন মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, চলতি বছরের মধ্যেই পাঁচ দেশ সম্ভাব্য হোস্ট রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে। সেক্ষেত্রে আগামী বছর থেকেই রিটার্ন হাব কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের নতুন নীতির ভিত্তিতে উদ্যোগ
ইউরোপীয় কমিশনের প্রস্তাবিত নতুন ‘রিটার্ন রেগুলেশন’-এর ওপর ভিত্তি করেই পাঁচ দেশের এ উদ্যোগ গড়ে উঠেছে। প্রস্তাবিত আইনি কাঠামোয় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ইইউর বাইরে রিটার্ন হাব স্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, যেসব আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন চূড়ান্তভাবে নাকচ হবে এবং যাদের তাৎক্ষণিকভাবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে না, তাদের অস্থায়ীভাবে এসব কেন্দ্রে রাখা হবে। পরে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রিটার্ন হাব নিয়ে ইউরোপের পাঁচ দেশের এ উদ্যোগ সম্পর্কে বাংলাদেশকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। কারণ বিষয়টি এখনও নীতিগত পর্যায়ে রয়েছে এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এ নিয়ে আলোচনা চলছে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে।
বাংলাদেশিদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এটি বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে নেওয়া কোনো বিশেষ উদ্যোগ নয়; বরং যেসব দেশের নাগরিকদের আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত হবে, তাদের সবার ক্ষেত্রেই এ নীতি প্রযোজ্য হতে পারে। তবে বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও অনুমোদনের হার অত্যন্ত কম।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশিদের প্রথম ধাপের আশ্রয় আবেদন অনুমোদনের হার মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ। রিটার্ন হাবের বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত না হলেও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুততর করার যে নীতিগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে, তা বাস্তবায়নের দিকেই এগোচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশিদের নতুন আশ্রয় আবেদন আগের তুলনায় দ্রুত নিষ্পত্তি হতে পারে।
তার ভাষ্য, নতুন রেগুলেশন অনুযায়ী আশ্রয় আবেদন প্রায় ১২ সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে। যেসব আবেদন অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে, সেগুলোর ক্ষেত্রে দ্রুত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
আশ্রয় আবেদনকারী হিসেবে বাংলাদেশ চতুর্থ বৃহত্তম উৎস দেশ
ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের (EUAA) ‘লেটেস্ট অ্যাসাইলাম ট্রেন্ডস ২০২৫’ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে ইইউতে আশ্রয় আবেদনকারীদের মধ্যে বাংলাদেশ ছিল চতুর্থ বৃহত্তম উৎস দেশ। বাংলাদেশের আগে রয়েছে সিরিয়া, ভেনিজুয়েলা ও আফগানিস্তান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশি নাগরিকদের ৩৬ হাজার ৯০১টি আশ্রয় আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ৩৫ হাজার ২৪৫টি ছিল প্রথমবারের আবেদন। একই সময়ে ৪৩ হাজার ৫২৩টি আবেদনের ওপর প্রথম ধাপের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। তবে বছরের শেষে ৪১ হাজার ৬৯২টি আবেদন বিভিন্ন সদস্য দেশে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল। একই বছরে ১ হাজার ১৭০টি আবেদন প্রত্যাহার করা হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদনের প্রথম ধাপের স্বীকৃতির হার ছিল মাত্র ৩ শতাংশ।
ইইউএএর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির বিষয়টি অনেক বাংলাদেশি তাদের আশ্রয় আবেদনে উল্লেখ করেছেন। যদিও ২০২৫ সালে আবেদন সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে, তবুও বাংলাদেশ এখনও ইইউতে আশ্রয়প্রার্থীদের অন্যতম বড় উৎস দেশ।
এদিকে ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় রুট দিয়ে অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশকারীদের মধ্যেও বাংলাদেশিদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
সরকারের অবস্থান
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানিয়েছেন, রিটার্ন হাব বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
তিনি বলেন, “এ ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা যোগাযোগ আমাদের কাছে আসেনি।”
প্রতিমন্ত্রীর মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের নাগরিকদের রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। দেশে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত রয়েছে। ফলে বিদেশে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার যৌক্তিকতা তিনি দেখেন না।
তিনি আরও বলেন, সরকার সবসময়ই অনিয়মিত অভিবাসন নিরুৎসাহিত করে এবং বৈধ পথে বিদেশ গমনের পক্ষে। কিন্তু অনেকেই অনিয়মিতভাবে ইউরোপে গিয়ে পরে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন, যা দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে।
মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ
রিটার্ন হাব পরিকল্পনা শুরু থেকেই মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েছে। ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের মানবাধিকার কমিশনার সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারকে পাঠানো এক চিঠিতে আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন, ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদ এবং ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ নীতি কঠোরভাবে অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের আশঙ্কা, ইউরোপের বাইরে এ ধরনের কেন্দ্র স্থাপন করা হলে আশ্রয়প্রার্থীদের আইনি সুরক্ষা, কার্যকর বিচারিক প্রতিকার এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে।
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী এ উদ্যোগকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন।
তিনি বলেন, “প্রত্যাবাসন সহজ করার উদ্দেশ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের তৃতীয় দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।”
ড. তাসনিম সিদ্দিকীর মতে, অস্ট্রেলিয়ার অফশোর প্রসেসিং ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে এ ধরনের নীতির ফলে আশ্রয়প্রার্থীদের দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে তারা কার্যকর আইনি সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও বিচারিক প্রতিকার থেকেও বঞ্চিত হন। তাই ইউরোপ যদি একই ধরনের ব্যবস্থা চালু করতে চায়, তাহলে মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
নিবিড় পর্যবেক্ষণের পরামর্শ
সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা মনে করছেন, ইউরোপীয় কমিশনের নতুন রিটার্ন নীতি এবং পাঁচ দেশের রিটার্ন হাব উদ্যোগ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। কারণ এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন নিষ্পত্তি, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এবং সামগ্রিক অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে।
তাদের মতে, ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদনের উচ্চ সংখ্যা এবং স্বীকৃতির নিম্ন হার বিবেচনায় রিটার্ন হাব নীতির যেকোনো পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অভিবাসন-সংক্রান্ত ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।













