কক্সবাংলা ডটকম(১৬ আগস্ট) :: দেশে সারের মজুত ধীরে ধীরে কমছে। গুরুত্বপূর্ণ তিন ধরনের নন-ইউরিয়া সার যেমন ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি), ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) ও মিউরেট অব পটাশের (এমওপি) মজুত এরই মধ্যে নিরাপদ সীমার নিচে নেমে গেছে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) সূত্র জানায়, ডিএপির ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। আমন মৌসুমে এসব সারের চাহিদা বাড়ছে। এরই মধ্যে ডিএপি সার সংকটের আশঙ্কায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে গত ২৬ জুলাই কৃষি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে বিএডিসি।
বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষকরা চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন। কোথাও কোথাও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কেজিতে ৫ থেকে ১৩ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতেও নন-ইউরিয়া সার আমদানির জন্য সরকার এখনও ক্রয়-সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করেনি।
পরিপত্র জারির পর এলসি খোলা, জাহাজে সার তোলা এবং দেশে পৌঁছাতে সাধারণত দুই থেকে তিন মাস সময় লাগে। ফলে এখন আমদানির উদ্যোগ নিলেও নতুন সার দেশে পৌঁছাতে অক্টোবর বা নভেম্বর লাগতে পারে। এতে আমনের পরবর্তী পর্যায় এবং শীতকালীন ফসলের মৌসুমে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরির শঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারের ঝুঁকি। বিশ্বের বড় সার রপ্তানিকারক চীন গত মার্চে অভ্যন্তরীণ কৃষকদের জন্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে সার রপ্তানি বন্ধের নির্দেশ দেয়। সেই নিষেধাজ্ঞা এখনও বহাল।
বাংলাদেশ ডিএপি আমদানিতে চীনের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। ফলে চীনের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে বিকল্প উৎস থেকে সার সংগ্রহ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে ইরান ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও সার বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আমদানি করা ইউরিয়া সার নিয়ে উদ্বেগ বেশি। বাংলাদেশ সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ইউরিয়া আমদানি করে। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে ওই অঞ্চল থেকে সার পরিবহন ও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার শঙ্কা রয়েছে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিও হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে ইউরিয়ার দাম বেড়ে বাংলাদেশের সার সরবরাহে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সামান্য পরিবর্তনও বাংলাদেশের সার আমদানিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বিএডিসির চিঠি
ডিএপি সারের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে গত ২৬ জুলাই কৃষি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে বিএডিসি। চিঠিতে বিএডিসি জানিয়েছে, অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সারের ভরা মৌসুমে কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে চুক্তির আওতায় থাকা নিশ্চিত দুই লটের পাশাপাশি আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রতি মাসে অতিরিক্ত দুই লট ডিএপি আমদানি করা জরুরি। তা না হলে সময়মতো চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ করা কঠিন হবে।
বিএডিসি জিটুজি চুক্তির আওতায় সৌদি আরব, মরক্কো ও চীন থেকে ডিএপি আমদানি করে। সৌদি আরবের সঙ্গে ছয় লাখ টন, মরক্কোর সঙ্গে চার লাখ ৫০ হাজার টন এবং চীনের সঙ্গে দুই লাখ ৮০ হাজার টন সরবরাহের চুক্তি রয়েছে। তবে যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালি এবং লোহিত সাগরের পরিস্থিতির কারণে সৌদি আরব থেকে আমদানি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। চীনও সার রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
বিএডিসি চিঠিতে জানিয়েছে, সৌদি আরবের সঙ্গে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাতটি লট ডিএপি আমদানির কথা থাকলেও এসেছে মাত্র একটি। আরেকটি লটের কার্যক্রম শেষ হলেও লোহিত সাগরের পরিস্থিতিতে সেটিও অনিশ্চিত। আগস্টে সৌদি কোম্পানি মা’আদেন সার সরবরাহ করতে পারবে না বলে জানিয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ) আহমেদ ফয়সল ইমাম বলেন, বর্তমান মজুত দিয়ে অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। এরপর নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চাহিদা অনেক বেড়ে যাবে। এ সময়ে মজুত কম থাকায় এখনকার হারে আমদানি করলে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে না।
বিএডিসির কর্মকর্তারা জানান, সৌদি আরবের চুক্তির আওতায় এক লাখ ৬০ হাজার টন ডিএপি ঐচ্ছিকভাবে আমদানির সুযোগ থাকলেও যুদ্ধের কারণে তা অনিশ্চিত। এ অবস্থায় মরক্কোর সঙ্গে থাকা ঐচ্ছিক চুক্তির আওতায় আরও আট লট ডিএপি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তিন সারের মজুত নিরাপদ সীমার নিচে
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ডিএপি, টিএসপি, এমওপির মজুত নিরাপদ মাত্রার নিচে রয়েছে। ডিএপির মজুত আছে তিন লাখ ৯০ হাজার টন, নিরাপদ মজুতের জন্য প্রয়োজন পাঁচ লাখ টন। অর্থাৎ নিরাপদ মাত্রার তুলনায় মজুত কম আছে এক লাখ ১০ হাজার টন।
টিএসপির মজুত রয়েছে তিন লাখ ৫৩ হাজার টন, নিরাপদ মজুতের প্রয়োজন চার লাখ টন। এ ক্ষেত্রেও ঘাটতি ৪৭ হাজার টন। এমওপির মজুত রয়েছে এক লাখ ৯৬ হাজার টন, যেখানে নিরাপদ মাত্রা তিন লাখ টন। অর্থাৎ নিরাপদ মজুতের তুলনায় ঘাটতি এক লাখ চার হাজার টন।
এই তিন ধরনের সারই আমন ধানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমনের জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ ও ধানের প্রাথমিক বৃদ্ধির সময়ে কৃষকরা টিএসপি, ডিএপি, এমওপি ব্যবহার করেন। ফলে এই সময়ে মজুত কমে যাওয়ায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।
তবে নন-ইউরিয়া সারের চেয়ে বর্তমানে ইউরিয়ার পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তিদায়ক। দেশে নিরাপদ ইউরিয়া মজুতের পরিমাণ পাঁচ লাখ টন। বর্তমানে রয়েছে পাঁচ লাখ ৮৫ হাজার টন। অর্থাৎ নিরাপদ সীমার চেয়ে ৮৫ হাজার টন বেশি মজুত রয়েছে।
তবে ইউরিয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আমদানি-নির্ভরতা বড় ঝুঁকি। সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ইউরিয়া আমদানি করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এসব দেশ থেকে সরবরাহ ও জাহাজ চলাচলে সমস্যা হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সরবরাহ পরিস্থিতি সংকটাপন্ন হওয়ায় নভেম্বরে যে সার ব্যবহার করার কথা, তা এখনই ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশের সার সরবরাহ অনিশ্চয়তার একটি পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
তিনি বলেন, টিএসপি, ডিএপি, এমওপিসহ নন-ইউরিয়া সার আমদানির জন্য সরকার এখনও ক্রয়-সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করেনি। পরিপত্র জারির পর এলসি খোলা হবে। এরপর জাহাজে সার দেশে আসতে দুই থেকে তিন মাস সময় লাগে। ফলে আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলে সরবরাহে চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
আমনের মাঠে সংকটের চিত্র
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৭ লাখ ১০ হাজার ৭৬২ হেক্টর। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা এক কোটি ৮০ লাখ ৫৭৬ টন।
সারের মজুত কমে যাওয়ার প্রভাব এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা টের পাচ্ছেন। চলতি আমন মৌসুমে রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী ও রাজশাহীর কৃষকদের টিএসপি এবং ডিএপি সার পেতে হিমশিম খাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অনেক ক্ষেত্রে সরকারি ডিলারের কাছ থেকে নির্ধারিত দামে পর্যাপ্ত সার না পেয়ে কৃষকদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এতে আমন ধানের উৎপাদন খরচ বাড়ছে।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে সারের সংকট ও বাড়তি দামের অভিযোগে গত ১০ আগস্ট মহাসড়ক আটকিয়ে কৃষকরা বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভকারী কৃষকদের অভিযোগ, টিএসপি প্রতি বস্তা দুই হাজার থেকে দুই হাজার ২০০, ডিএপি এক হাজার ৭০০ থেকে এক হাজার ৮০০ এবং ইউরিয়া এক হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত দামে কিনতে হচ্ছে।
আন্দোলনরত কাশীরাম এলাকার কৃষক আইয়ুব আলী বলেন, আমন মৌসুমে সারের বাড়তি দামের কারণে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। সরকার নির্ধারিত দরে পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিত করা না হলে কৃষকরা আরও সংকটে পড়বেন।
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতেও সারের সংকট ও বাড়তি দামের অভিযোগ রয়েছে। উপজেলার পান্টি ইউনিয়নের বড় ভালুকা গ্রামের কৃষক সামছুল আলম পাঁচ বিঘা জমিতে আমন ধানের চাষ করেছেন। কিছুদিন আগে সার কিনতে তিনি ইউনিয়নের বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ডিলারের কাছে যান। কিন্তু সরকার নির্ধারিত দামে ১০ কেজির বেশি সার পাননি। বাধ্য হয়ে তিনি একই ইউনিয়নের বেলতলী এলাকার সাব-ডিলার আব্দুল কুদ্দুসের দোকান থেকে বাড়তি দামে সার কেনেন। সেখানে ইউরিয়া প্রতি কেজি ৩২, ডিএপি ৩৭ ও টিএসপি ৩৮ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। অথচ সরকার নির্ধারিত দাম যথাক্রমে ২৭, ২১ ও ২৭ টাকা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে সারের মোট চাহিদা ৬৭ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ টন। এর মধ্যে ইউরিয়ার চাহিদা ২৬ লাখ ২২ হাজার টন। টিএসপি ৯ লাখ এক হাজার ৫০০ টন, ডিএপি ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ৭০০ টন এবং এমওপি ৯ লাখ ৭০ হাজার টন। এ ছাড়া এনপিকেএস, জিপসাম, জিংক সালফেট, ম্যাগনেসিয়াম সালফেট, বোরন, অ্যামোনিয়াম সালফেটসহ অন্যান্য সারের চাহিদা ৯ লাখ ২১ হাজার ৩০০ টন।
অর্থাৎ বছরজুড়ে দেশের কৃষির জন্য প্রায় ৬৮ লাখ টন সার প্রয়োজন হবে। এর বিপরীতে গতকাল শনিবার পর্যন্ত দেশে মোট সারের মজুত ছিল ১৬ লাখ টনের কিছু বেশি। সামনে আমন ও শীতকালীন ফসলের মৌসুমে চাহিদা বাড়তে থাকলে মজুত আরও দ্রুত কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমন মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার না পেলে ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। এতে উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে। সার সংকট শুধু কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়াবে না। এর প্রভাব পড়তে পারে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায়ও।
এদিকে সার নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি বলেন, সমস্যা শুধু কাতারকে নিয়ে। অন্য কোনো সার সরবরাহকারী দেশের ক্ষেত্রে সমস্যা নেই। সরকার বিকল্প ব্যবস্থাও করেছে। কোনো কোনো জেলায় আগের বছরের তুলনায় বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যারা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।












