কক্সবাংলা ডটকম(৯ আগস্ট) :: সরবরাহ কমে যাওয়ায় ভরা মৌসুমের দুই মাস শেষ হতে চললেও দেশের বাজারে ইলিশের দেখা মিলছে না বললেই চলে। যেটুকু মাছ বাজারে আসছে, তার বড় অংশই আকারে ছোট। বড় ও মাঝারি আকারের ইলিশের সরবরাহ তুলনামূলক কম থাকায় দামও রয়েছে সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে। ফলে বর্ষার ভরা মৌসুমেও অনেক পরিবারের পাতে উঠছে না বাঙালির ঐতিহ্যবাহী এই মাছ।
মৎস্য বিভাগের তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদীর নাব্যতা সংকট, দূষণ, প্রজননক্ষেত্রের পরিবেশের পরিবর্তন, অবাধে জাটকা ও মা ইলিশ আহরণ, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার এবং সমুদ্রে অতিরিক্ত মাছ শিকার—সব মিলিয়ে ইলিশের স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও যুক্ত হয়েছে। ফলে শুধু মোট উৎপাদন নয়, অনেক এলাকায় ইলিশের গড় আকারও কমে আসার অভিযোগ রয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যানেও উৎপাদন বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার চিত্র পাওয়া যায়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন ছিল ৫ দশমিক ৩৩ লাখ মেট্রিক টন। ২০১৯-২০ সালে তা বেড়ে ৫ দশমিক ৫০ লাখ, ২০২০-২১ সালে ৫ দশমিক ৬৫ লাখ, ২০২১-২২ সালে ৫ দশমিক ৬৭ লাখ এবং ২০২২-২৩ সালে ৫ দশমিক ৭১ লাখ মেট্রিক টনে পৌঁছায়। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন কমে ৫ দশমিক ২৯ লাখ মেট্রিক টনে নেমে আসে—যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ কম।
অর্থাৎ কয়েক বছর টানা বৃদ্ধির পর ইলিশ উৎপাদনে যে নিম্নমুখী প্রবণতা শুরু হয়েছে, সেটি এখন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ইলিশ আহরণ নিয়ে আলাদা পর্যালোচনা সভাও করেছে।
ইলিশের সংকট শুধু পরিমাণে সীমাবদ্ধ নেই; দৈহিক আকার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ইলিশ গবেষকদের মতে, একসময় বাজারে ৪০০ থেকে ৪৫০ গ্রাম ওজনের ইলিশ তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেলেও এখন অনেক ক্ষেত্রে ৩০০ থেকে ৩৫০ গ্রামের মাছের আধিক্য দেখা যাচ্ছে। পর্যাপ্ত সময় বড় হওয়ার আগেই মাছ ধরা পড়লে বড় ইলিশের প্রাপ্যতা কমে যাওয়াই স্বাভাবিক।
ইলিশের জীবনচক্রও এ সংকটের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। নদী ও মোহনায় জন্ম নেওয়া পোনা বা জাটকা পরবর্তী সময়ে সাগরে চলে যায়। সেখানে বেড়ে ওঠার পর পূর্ণবয়স্ক ইলিশ আবার নদীর মিঠাপানিতে ফিরে এসে প্রজনন করে। এই স্বাভাবিক চলাচলের পথে অতিরিক্ত মাছ ধরা, নিষিদ্ধ জাল, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, দূষণ ও নানা ধরনের অবকাঠামোগত হস্তক্ষেপ মাছের বিচরণ ও প্রজননকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইলিশ সংরক্ষণে দেশের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা চালু রয়েছে। আগের ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য ছিল মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণ, অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা এবং জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি। ওই প্রকল্পের আওতায় ৩০ হাজার জেলে পরিবারের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং ১০ হাজার জেলে পরিবারকে বৈধ জাল দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত।
তবে সংরক্ষণ কার্যক্রম থাকলেও মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার, জাটকা আহরণ, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা এবং সমুদ্রের নিষিদ্ধ সময়ে মাছ শিকারের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে ওঠে। ফলে অভয়াশ্রম ও নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও ইলিশ সংরক্ষণে বড় ধরনের সরকারি সহায়তা কর্মসূচি রাখা হয়েছে। প্রধান প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকা ৬ লাখ ২০ হাজার ১৪০টি জেলে পরিবারকে ভিজিএফের আওতায় আনার তথ্য দিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর। জেলেদের বিকল্প সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে নিষেধাজ্ঞার সময় অবৈধভাবে মাছ ধরার প্রবণতা কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে ইলিশের প্রজনন রক্ষায় প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়। ২০২৫ সালে এ নিষেধাজ্ঞা ৪ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত কার্যকর ছিল। এ সময়ে ইলিশ আহরণের পাশাপাশি পরিবহন, ক্রয়-বিক্রয় ও মজুদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা ছিল।
এ ছাড়া জাটকা সংরক্ষণে ২০২৬ সালের ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের ছয় জেলার পাঁচটি ইলিশ অভয়াশ্রমে দুই মাস সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়। নিষেধাজ্ঞা শেষে ৩০ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে জেলেদের আবার মাছ ধরার সুযোগ দেওয়া হয়।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের মৎস্য খাতে ইলিশের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের তথ্যে বলা হয়েছে, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান প্রায় ১১ শতাংশ। ইলিশ আহরণে সরাসরি প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আরও ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ যুক্ত।
তবে বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীদের একাধিক ধাপে হাতবদল, পরিবহন ব্যয়, বরফ ও জ্বালানি খরচ, দাদন এবং সংরক্ষণ ব্যয়ও ইলিশের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন ব্যবসায়ীরা। আহরণস্থল থেকে পাইকারি মোকাম, আড়ত, পরিবহন ও খুচরা বাজার—প্রতিটি পর্যায়ে মূল্য যোগ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ক্রেতাকে অনেক বেশি দাম দিতে হচ্ছে।
খুচরা ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বলছেন, সরবরাহ সংকটের সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যবসায়ী ইলিশ মজুদ করে পরে বেশি দামে বিক্রি করেন। আবার বাজারে দীর্ঘদিন হিমায়িত করে রাখা ইলিশও নতুন মাছের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। ফলে ভোক্তাদের একদিকে বেশি দাম দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে মাছটি কতদিন সংরক্ষণ করা হয়েছে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
খুলনার ময়লাপোতা সান্ধ্যবাজারে ইলিশ কিনতে আসা ব্যাংক কর্মকর্তা শাহরিয়ার হোসেন বলেন, ‘৩ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে এক কেজি ইলিশ কেনার সামর্থ্য আমার নেই। বাঙালির প্রিয় ইলিশ এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।’
স্কুলশিক্ষক সৌমেন অধিকারী বলেন, ‘মৌসুমেও যদি ইলিশের দাম এত বেশি থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ কীভাবে এই মাছ কিনবে? বাজারে সরবরাহ ও দামের ওপর কার্যকর নজরদারি দরকার।’
বর্তমানে বাজারে আকারভেদে ইলিশের দামও ব্যাপক। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রামের ছোট ইলিশ ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, এক কেজি ওজনের ইলিশ প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং দেড় কেজি ওজনের ইলিশ ৪ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। তবে বাজার ও মাছের মানভেদে এ দামে পার্থক্য রয়েছে।
ইলিশের সরবরাহ কমার চিত্র সরকারি মাছ অবতরণ কেন্দ্রগুলোতেও দেখা যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন অবতরণকেন্দ্রে জেলেদের নৌকা ও মাছের পরিমাণ কমে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে পাইকারি বাজারে। খুলনা, বরগুনার পাথরঘাটা, চাঁদপুরসহ বড় মোকামগুলো ইলিশের সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হওয়ায় এসব জায়গার পরিস্থিতি সার্বিক বাজারে দ্রুত প্রভাব ফেলে।
অন্যদিকে সমুদ্রে মাছ ধরার ওপরও বিভিন্ন সময় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়। সামুদ্রিক মাছের প্রজনন ও মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণের জন্য ২০২৫ সালে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় ৫৮ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছিল। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ হলেও জেলেদের জীবিকা ও বাজার সরবরাহের সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তবায়ন করাও জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশের উৎপাদন ও আকার ফেরাতে শুধু মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, ইলিশের বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্র রক্ষা, নিষিদ্ধ জাল বন্ধ, জাটকা ও মা ইলিশ আহরণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, সমুদ্রে টেকসই মাছ ধরার ব্যবস্থা এবং জেলেদের জন্য কার্যকর বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।
তাদের মতে, অভয়াশ্রমগুলোকে কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে জেলেদের তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ, নিষেধাজ্ঞার সময় যথাযথ খাদ্যসহায়তা, অবৈধ জাল ও অতিরিক্ত মাছ ধরার বিরুদ্ধে অভিযান এবং নদী ও মোহনার পরিবেশগত পরিবর্তন নিয়ে নিয়মিত গবেষণা প্রয়োজন।
ইলিশ সংরক্ষণে সরকারের আগের প্রকল্পে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা, সচেতনতা সভা, কর্মশালা এবং বিপুলসংখ্যক অভিযান পরিচালনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। এখন সেই অভিজ্ঞতার আলোকে আরও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাই ইলিশের সংকট মোকাবিলার বড় চ্যালেঞ্জ।
কারণ ইলিশ শুধু একটি মাছ নয়—বাংলাদেশের নদী, উপকূলীয় অর্থনীতি, জেলেদের জীবন-জীবিকা এবং জাতীয় খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি সম্পদ। তাই ভরা মৌসুমে বাজারে ইলিশের সংকট ও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া দাম—দুটিই ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনায় নতুন করে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা প্রয়োজন।













