রবিবার ৯ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৯ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডিজিটাল পেমেন্ট বাড়লেও ব্যাংকের বাইরে নগদ টাকা ৩ লাখ ৮০ হাজার কোটি ছাড়িয়েছে

🗓 রবিবার, ০৯ আগস্ট ২০২৬

👁️ ১৪ বার দেখা হয়েছে

🗓 রবিবার, ০৯ আগস্ট ২০২৬

👁️ ১৪ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম :: দেশে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার দ্রুত সম্প্রসারণ হলেও কমছে না নগদ অর্থের ব্যবহার। বরং ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে শেষে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। জুন ও জুলাইয়ে এ পরিমাণ আরও বেড়ে বর্তমানে ৩ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।

নগদ অর্থের এমন ঊর্ধ্বমুখী প্রবাহ ঘটছে এমন সময়ে, যখন দেশে ডিজিটাল লেনদেনের অবকাঠামো আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বিস্তৃত হয়েছে। ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপ ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), কার্ড, কিউআর কোডসহ বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে ঘরে বসেই অর্থ স্থানান্তর, কেনাকাটা, বিল পরিশোধসহ প্রায় সব ধরনের আর্থিক লেনদেন করা সম্ভব হচ্ছে।

তার পরও নগদ অর্থের চাহিদা কমছে না। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, দেশের বড় অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, নগদনির্ভর ব্যবসা, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সীমিত আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং ব্যাংক খাতের প্রতি আস্থার সংকট—সব মিলিয়ে নগদ অর্থের ব্যবহার বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে ডিজিটাল লেনদেন নগদের বিকল্প হয়ে ওঠার পরিবর্তে নগদের পাশাপাশি ব্যবহৃত হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকলে তা আনুষ্ঠানিক আর্থিক প্রবাহে যুক্ত হয় না। এতে ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহের সক্ষমতা কমে এবং ঋণ ও বিনিয়োগে অর্থের জোগান বাধাগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে অর্থনীতিতে অপ্রদর্শিত আয়, কর ফাঁকি ও অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের ঝুঁকিও বাড়ে। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

নগদ অর্থের প্রবাহ এতটা বেড়ে যাওয়ার কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, পেমেন্ট ব্যবস্থার আধুনিকায়নের ফলে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার ছোট হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না। বরং ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ বাড়ছে। একই সময়ে ব্যাংক আমানতেরও প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, যা অর্থনীতির দুটি পরস্পরবিরোধী প্রবণতা নির্দেশ করে। কেন এমন হচ্ছে, অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তা খতিয়ে দেখা উচিত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ড. ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি বড় হওয়ার অর্থ হলো অর্থনীতির কোনো না কোনো উৎস থেকে অতিরিক্ত অর্থ আসছে। সেই অর্থ বৈধ উৎস থেকে এসেছে কিনা এবং এর বিপরীতে কর পরিশোধ করা হয়েছে কিনা, সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। সাধারণত ব্যাংকের প্রতি অনাস্থা, ঘুষ-দুর্নীতি ও কালো টাকার দৌরাত্ম্য বাড়লে নগদ অর্থের চাহিদাও বাড়ে।

দেড় দশকে নগদ অর্থ বেড়েছে কয়েক গুণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে দেশে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ৫৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে এ পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে। ২০২১ সালের জুনে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ দাঁড়ায় ২ লাখ ৯ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা। ২০২২ সালের জুনে তা বেড়ে হয় ২ লাখ ৩৬ হাজার ৪৪৮ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের জুনে এ পরিমাণ আরও বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯১ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা।

২০২৪ ও ২০২৫ সালে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের স্থিতিতে কিছুটা ওঠানামা থাকলেও বড় ধরনের বৃদ্ধি দেখা যায়নি। গত বছরের জুনে এ অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা। কিন্তু মাত্র এক বছরের ব্যবধানে চলতি বছরের মে শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা।

এরপর জুনে ব্যাংক খাতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হলে নগদ অর্থের চাহিদা আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকে চেয়ারম্যান পদত্যাগ ও নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রভাবে ব্যাংকটি থেকে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার আমানত বেরিয়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দিতে হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ইসলামী ব্যাংকের অস্থিরতার প্রভাব দেশের অন্যান্য ব্যাংকেও পড়ে। আতঙ্কিত হয়ে বিভিন্ন ব্যাংকের এক শ্রেণির গ্রাহক আমানত তুলে নেন। এর ফলে জুনে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। জুলাইয়ে তা আরও বেড়ে প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছে।

তবে বর্তমানে নগদ টাকার চাহিদা কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ইসলামী ব্যাংকে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের পর পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে নিযুক্ত প্রশাসক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন বলেন, ইসলামী ব্যাংকের দৈনন্দিন লেনদেন পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেয়া অর্থ কিস্তিতে পরিশোধ করা হবে। আতঙ্কিত হয়ে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেয়া অনেক গ্রাহক আবার ব্যাংকে ফিরে এসেছেন।

আমানতও বাড়ছে, তাহলে নগদ যাচ্ছে কোথায়?

অন্যদিকে, ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধিও চলতি বছরে আগের তুলনায় ভালো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে অর্থাৎ জুলাই থেকে মে পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলোতে আমানত বেড়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৫২২ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে আমানত বেড়েছিল ৮৯ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা।

অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে আমানত বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। চলতি বছরের মে শেষে ব্যাংকগুলোতে গ্রাহকদের জমা থাকা আমানতের মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ৪১ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। এ সময়ে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৪১ শতাংশ।

ব্যাংক আমানত বাড়ার পাশাপাশি ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের পরিমাণও দ্রুত বৃদ্ধির বিষয়টি অর্থনীতিবিদদের কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, সাধারণত ডিজিটাল লেনদেন ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিস্তার বাড়লে নগদ অর্থের ব্যবহার কমার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে একই সময়ে আমানত ও ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ—দুটিই বাড়ছে।

মূল্যস্ফীতিকে দায়ী করছেন ব্যাংকাররা

ব্যাংকের বাইরে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ জমা হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে দায়ী করছেন সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন। তিনি বলেন, পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যাওয়ায় একই পরিমাণ পণ্য কিনতে এখন আগের চেয়ে বেশি অর্থ প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে খুচরা বাজারে বেশি পরিমাণ নগদ অর্থ হাতবদল হচ্ছে।

তার মতে, মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নেমে এলে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে।

তবে শুধু মূল্যস্ফীতি নয়, ডিজিটাল লেনদেনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও নগদনির্ভরতা বাড়াচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষ্য, দেশের লাখ লাখ দোকানের তুলনায় কিউআর কোড, পস মেশিন, কার্ড ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের বিস্তার এখনো সীমিত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংক খাতের প্রতি আস্থার সংকট।

অনেক এলাকায় ভালো ব্যাংকের শাখা বা সেবা সীমিত থাকায় মানুষ দুর্বল ব্যাংক থেকে টাকা তুলে হাতে রাখছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ব্যাংক খাতের অনিয়ম ও লুটপাট নিয়ে ধারাবাহিক নেতিবাচক সংবাদও ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মনে করেন এই ব্যাংকার।

তার মতে, দেশের বিশাল অর্থনীতির প্রয়োজন মেটাতে শক্তিশালী ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের পাশাপাশি বিকাশের মতো বিস্তৃত ডিজিটাল আর্থিক সেবার আরও বিকাশ প্রয়োজন।

ডিজিটাল লেনদেন বাড়লেও নগদনির্ভরতা কাটছে না

গত কয়েক বছরে দেশে প্রযুক্তিনির্ভর পেমেন্ট ব্যবস্থার ব্যাপক সম্প্রসারণ হয়েছে। প্রতি মাসে শুধু মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। অধিকাংশ ব্যাংক চালু করেছে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ড। ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপ ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও প্রতি মাসে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে।

এ ছাড়া নগদবিহীন লেনদেন বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘বাংলা কিউআর’ জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে। আরটিজিএস, এনপিএসবি ও এমএফএসসহ বিভিন্ন ডিজিটাল পেমেন্ট মাধ্যমও আগের তুলনায় দ্রুত ও সহজ হয়েছে।

তার পরও ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের পরিমাণ বাড়তে থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, দেশের সব মার্চেন্টকে বাংলা কিউআরের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ডিজিটাল পেমেন্টের সব প্রধান মাধ্যমই এখন আগের তুলনায় জনপ্রিয়।

তিনি বলেন, এর পরও ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া উদ্বেগের বিষয়। এর ফলে মানুষ ব্যাংকবিমুখী হয়ে যাচ্ছে কিনা, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। তবে ব্যাংক খাতে সুশাসন, শৃঙ্খলা ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।

আরিফ হোসেন খানও উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে নগদ অর্থ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, ২০২২ সাল থেকে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলমান থাকায় পণ্য ও সেবার মূল্য পরিশোধে মানুষকে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। পাশাপাশি গত কয়েক বছরে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ তারল্য সহায়তা দেয়া হয়েছে। ওই অর্থের বড় একটি অংশ আমানতকারীরা তুলে নিয়েছেন। ফলে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধির পেছনে এসব কারণও ভূমিকা রেখেছে।

সব মিলিয়ে দেশে ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমছে না। বরং ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের পরিমাণ নতুন রেকর্ড গড়ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির পরিধি কমানোর পাশাপাশি ডিজিটাল লেনদেনের অবকাঠামো আরও বিস্তৃত করা না গেলে নগদনির্ভরতা কমানো কঠিন হবে।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর