শনিবার ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি: মূল্যস্ফীতির প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রাখুন

🗓 মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

👁️ ৫৩ বার দেখা হয়েছে

🗓 মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

👁️ ৫৩ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা সম্পাদকীয়(২১ সেপ্টেম্বর) :: ডিজেলসহ চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর পর এর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য খাতেও এর প্রভাব খুব শিগগিরই দৃশ্যমান হবে। কারণ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি কেবল পরিবহন ব্যয় বাড়ায় না, এর সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত হয়ে বাড়ে উৎপাদন, কৃষি, বিদ্যুৎ ও পণ্য পরিবহনের খরচ।

গ্যাস সংকটের সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা ও জ্বালানি তেলের ব্যবহার বেড়েছিল। দেশে গ্যাসের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি তেলের ব্যবহার ও ব্যয় আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে কয়লা আমদানিতেও রয়েছে নানা জটিলতা। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হলে তা ভোক্তাদের জন্য নতুন বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

আন্তর্জাতিক বাজারেও জ্বালানি পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে এলএনজিসহ বিভিন্ন জ্বালানি পণ্যের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ফলে এলএনজি আমদানিতে সরকারের ব্যয় বেড়েছে। এলএনজি টার্মিনালসংক্রান্ত সমস্যার অবসান হলেও পর্যাপ্ত গ্যাস আমদানি ও সরবরাহ বাড়াতে সময় লাগছে। এর মধ্যে গ্যাসের দাম বাড়ানো হবে কি না, তা নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম কি আপাতত অপরিবর্তিত থাকবে?

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে পরিবহন খাতে। বাস, ট্রাক, পণ্যবাহী যান ও অন্যান্য পরিবহনের পরিচালন ব্যয় বাড়বে। আর পরিবহন ব্যয় বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ প্রায় সব ধরনের পণ্যের দামে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে রপ্তানি খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিযোগী দেশগুলো তুলনামূলক কম ব্যয়ে পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

সরকার অবশ্য দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর চাপ সামলানোর চেষ্টা করে আসছে। এর আগে অন্যান্য জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলেও ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। ডিজেল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত জ্বালানি হওয়ায় এর মূল্য স্থিতিশীল রাখার অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্বও বেশি। দুর্ভাগ্যজনক হলো, বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ও সরবরাহের সামান্য পরিবর্তনও তাই দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।

ডিজেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব কৃষিতেও পড়তে পারে। বিশেষ করে ডিজেলচালিত সেচব্যবস্থায় কৃষকের ব্যয় বাড়বে। তবে বর্তমানে বৃষ্টিনির্ভর চাষাবাদের কারণে সেচের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকায় তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কম অনুভূত হতে পারে। বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ব্যবহার বাড়বে, সেখানেও বাড়বে ব্যয়।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার রাত থেকেই বাস ও ট্রাকের ভাড়া বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে—এমন খবরও পাওয়া যাচ্ছে। নতুন ভাড়া নির্ধারণে সময় লাগলে বিভিন্ন স্থানে পণ্য পরিবহনে জটিলতা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। হিলি স্থলবন্দরে পরিবহন ভাড়া নিয়ে জটিলতার কারণে পণ্য আটকে থাকার খবরও এসেছে। সরকার যদি আগে থেকেই ভাড়া সমন্বয়ের একটি কার্যকর ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখত, তাহলে আকস্মিক পরিস্থিতি কিছুটা হলেও এড়ানো সম্ভব হতো।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকটের মতো অপ্রত্যাশিত চাপের মুখে পড়েছে—এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি। তবে প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এক নয়। বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশিত মাত্রায় না হওয়া এবং ধারাবাহিক ঋণনির্ভরতার কারণে সরকারের আর্থিক সক্ষমতাও সীমিত। ফলে জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যাপক ভর্তুকি অব্যাহত রাখা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।

জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চলতি লোকসান পুরোপুরি বন্ধ হবে না বলে জানানো হয়েছে। দাম বাড়ার ফলে সরকার কিছুটা বাড়তি রাজস্ব পেলেও এর বিপরীতে বিভিন্ন খাতে ব্যয়ও বাড়ছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধিজনিত অতিরিক্ত ব্যয়ও সরকারের ওপর নতুন আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই জ্বালানি মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের বক্তব্য রয়েছে।

তবে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু রাজস্ব বা ভর্তুকির হিসাব বিবেচনা করলেই হবে না; এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। কারণ জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্যের দাম বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তার চাপ পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য এই চাপ সামলানো বিশেষভাবে কঠিন।

এ অবস্থায় দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক করা জরুরি। জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজন হলে তা সর্বজনীন না করে যেসব খাত ও জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কৃষি, গণপরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিশেষ সহায়তার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।

জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা থাকতেই পারে। কিন্তু সেই সমন্বয় যেন হঠাৎ করে জনজীবনে বড় ধরনের ধাক্কা না দেয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে। মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি বাজার তদারকি, পরিবহন ভাড়া নির্ধারণ, পণ্য সরবরাহব্যবস্থা ও সামাজিক সুরক্ষার মধ্যে সমন্বয় করা এখন জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, জ্বালানি সংকটকে শুধু মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে মোকাবিলা না করে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার দিকে নজর দেওয়া। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো, এলএনজি আমদানির ঝুঁকি কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির বহুমুখী উৎস নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমাতে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নিতে হবে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রভাব যে মূল্যস্ফীতির ওপর পড়বে, তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ কম। এখন মূল প্রশ্ন হলো—এই অতিরিক্ত চাপ কীভাবে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা যায়। কাজের সুযোগ ও আয় দ্রুত বাড়ানো না গেলে মূল্যস্ফীতির অভিঘাত আরও তীব্র হবে। তাই জ্বালানি মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি মানুষের আয়, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে সমন্বিত ও লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপের এখনই প্রয়োজন।

এই বিভাগ এর আরো খবর

২০৩ এমপির জন্য বিশেষ বরাদ্দ

শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

স্পষ্ট হচ্ছে সংবিধান সংশোধনের কাঠামো

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

মারা গেলেন বলিউড অভিনেতা নানা পাটেকার

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর