বুধবার ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৯ চৈত্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কক্সবাজারের ঘারে আসছে আরও ৬৯ হাজার সৌদি রোহিঙ্গার চাপ !

🗓 সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬

👁️ ৯৭ বার দেখা হয়েছে

🗓 সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬

👁️ ৯৭ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা রিপোর্ট :: বাংলাদেশের ঘাড়ে অপেক্ষা করছে আরও ৬৯ হাজার সৌদি রোহিঙ্গার চাপ।ইতিমধ্যে সৌদি আরবে অবস্থানরত ৬৯ হাজার রোহিঙ্গার পাসপোর্ট দিতে বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দেয়া শুরু করেছে।

এরই মধ্যে বৈধৈ-অবৈধ মিলে সীমান্ত জেলা কক্সবাজারে ১৮ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এর সাথে নতুন করে যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় আরও ৬৯ হাজার সৌদি রোহিঙ্গা।

ধারণা করা যাচ্ছে এসব সৌদি রোহিঙ্গা পাসপোর্ট পেয়ে গেলে পর্যায়ক্রমে তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে সৌদি সরকার। এর ফলে ২০ লাখ রোহিঙ্গার চাপ পড়তে যাচ্ছে কক্সবার জেলায়।

জানা যায়, সৌদি আরবের পবিত্র শহর মক্কার নাক্কাছা বাজার ও এর আশপাশের এলাকায় বসবাসকারী কয়েকশ’ দোকানি ও বাসিন্দাদের অধিকাংশই রোহিঙ্গা। কিন্তু কাগজপত্রে তারা সবাই ‘বাংলাদেশি’। বাংলাদেশি পাসপোর্টের মাধ্যমেই তারা সৌদি আরবে অবস্থান করছেন, যা একটি জটিল ও সুদীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফসল।

১৯৫০ সাল থেকেই রোহিঙ্গারা সৌদি আরবে বসবাস করছে। সত্তরের দশকের গোড়ায় মিয়ানমারে সহিংসতা শুরু হলে বাদশাহ ফয়সাল তাদের থাকা, কাজ ও চলাচলের অনুমতি দেন। তখন অনেকে হজে গিয়েই থেকে যান। ওআইসির মধ্যস্থতায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে ২ লাখ ৫০ হাজারকে বাংলাদেশি ও বাকি অর্ধেককে পাকিস্তানি পাসপোর্ট দেওয়া হয়।

কিন্তু পাকিস্তান তাদের ‘মিয়ানমারের নাগরিক’ উল্লেখ করলেও বাংলাদেশ সেটি করেনি, ফলে তারা ‘বাংলাদেশি’ হিসেবেই চিহ্নিত হন। সৌদি আরব এখন বলছে, যেহেতু তারা বাংলাদেশ থেকে গিয়েছে, তাই তারাই বাংলাদেশের নাগরিক।

১৯৭৬-৭৯ সালে নির্যাতনের মুখে প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছাড়তে বাধ্য হয়। সে সময় আন্তর্জাতিক উদ্যোগে তাদের একটি অংশকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের পাসপোর্ট দেওয়া হয়। তবে বাংলাদেশের পাসপোর্টে নাগরিকত্ব স্পষ্ট না থাকায় তারা কার্যত বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পড়ে—যা আজকের সংকটের মূল উৎস।

এরপর ১৯৯২, ২০১১ ও ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডুতে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন শুরু হলে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে ভুয়া ও দুর্নীতির মাধ্যমে তৈরি করা বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে তারা সৌদি আরবে পাড়ি জমান।

বর্তমানে সৌদি আরবে আনুমানিক আড়াই লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। বাংলাদেশের পর সৌদি আরবই তাদের অন্যতম বড় আশ্রয়স্থল।

সূত্র জানায়, নব্বইয়ের দশকে প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসেবে সৌদি আরবে প্রবেশ করে এবং তারা কিছু সুবিধাও পায়। কিন্তু পরবর্তীতে যারা গেছে, তাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী হিসেবে পরিচিতি পায়। এমনকি তাদের পরবর্তী প্রজন্মও একই পথে পাসপোর্ট পাচ্ছে। যা এখন বড় কূটনৈতিক জটিলতায় রূপ নিয়েছে।

বর্তমানে মক্কা ও মদিনা অঞ্চলে রোহিঙ্গাদের শক্তিশালী একটি নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে তারা আত্মীয়স্বজনদের ভিসা পেতে সহায়তা করে। শুধু তাই নয়, এই সম্প্রদায়ের পরবর্তী প্রজন্মও একইভাবে পাসপোর্ট সংগ্রহ করছে।

ঐতিহাসিকভাবে সৌদি বাদশাহ ফয়সালের সময় রোহিঙ্গাদের বসবাস, কাজ ও চলাচলের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সেই সুযোগকে অনেকেই নাগরিকত্বের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করেছে—যদিও মিয়ানমারে তারা এখনো রাষ্ট্রহীন।

বর্তমানে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ভিশন-২০৩০-এর আওতায় ভুয়া কাগজপত্র নিয়ে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। অনেকে আটক হয়েছেন এবং এখন তারা আফসোস করছেন। সৌদি আইন অনুযায়ী, প্রত্যেক বিদেশি কর্মীকে একজন স্থানীয় ‘কফিলের’ (নিয়োগকারী) অধীনে থেকে আকামা (কাজের অনুমতি) নিয়ে নির্দিষ্ট এলাকায় থাকতে হয়। কিন্তু রোহিঙ্গারা তা না মেনে বস্তিতে গিয়ে জড়ো হন, নির্ধারিত কাজ ছেড়ে অন্য কাজ করেন এবং আকামা নবায়ন করেন না। ফলে ধরা পড়লেই দেশে ফেরত পাঠানো হয়।

এতে বিপদে পড়ছেন প্রকৃত বাংলাদেশিরা। সৌদি আরবে বাংলাদেশিদের বিরূপ ধারণা তৈরি হচ্ছে, কারণ রোহিঙ্গাদের প্রায় সবাই নিয়ম ভাঙেন—যা সত্যিকারের বাংলাদেশিদের জন্য কূটনৈতিক ও সামাজিক সংকট তৈরি করছে।

বর্তমানে সৌদি আরবে অন্তত আড়াই লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে, যা বাংলাদেশের পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। তাদের অধিকাংশ মক্কা ও মদিনায় বাস করেন। এদের মধ্যে ৬৯ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্টের ওপর নির্ভরশীল।

সৌদি আইন অনুযায়ী, প্রতিটি বিদেশি কর্মীকে একজন ‘কফিল’ বা স্পনসরের অধীনে থাকতে হয় এবং বৈধ ‘আকামা’ (কাজের অনুমতি) থাকতে হয়। কিন্তু প্রবাসী বাংলাদেশিদের অভিযোগ—রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ এই নিয়ম মানে না। তারা নির্ধারিত কর্মস্থল ছেড়ে অন্যত্র বসবাস করে, আকামা নবায়ন করে না এবং দলবদ্ধভাবে কাজ করে।

ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে তাদের সরাসরি ফেরত পাঠানো হয়। এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে প্রকৃত বাংলাদেশি শ্রমিকদের ওপরও। সৌদিতে বাংলাদেশিদের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

রাখাইনে বসবাসরত রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিকত্ব হারিয়ে রাষ্ট্রহীন। জাতিগত নিধন ও গণহত্যার অভিযোগ এড়াতে তারা বাংলাদেশ,মালয়েশিয়া,ইন্দোনেশিয়া ও সৌদি আরবে আশ্রয় নিয়েছেন।  রোহিঙ্গারা এখন সৌদি আরবে স্বাবলম্বী হয়েছেন; তাদের সন্তানরা সেখানকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছেন। তাই তারা আর বাংলাদেশে ফিরতে চান না। কিন্তু সৌদি সরকার তাদের নথিভুক্ত করতে কোনো না কোনো দেশের নাগরিকত্বের প্রমাণ চাচ্ছে। সৌদি সরকার তাদের জন্য ‘আকামা ফি’ মওকুফসহ কিছু সুবিধা দিলেও বর্তমানে ধরপাকড় ও আটক আটকেন্দ্রে বন্দি করে রাখার ঘটনা বাড়ছে।যেখানে বাংলাদেশ সরাসরি জড়িত একটি বড় কূটনৈতিক জটিলতায়।

ভুয়া ও দুর্নীতির মাধ্যমে তৈরি বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে সৌদি আরবে বসবাসকারী কয়েক লাখ রোহিঙ্গা এখন দুই দেশের জন্যই একটি জটিল কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। পাসপোর্ট বৈধকরণে তৎপরতা বাড়লেও, অনিয়ম ও আইন ভাঙার ঘটনায় প্রকৃত বাংলাদেশিরাও পড়ছেন বিপাকে।

রোহিঙ্গাদের মানবিক সংকট, অবৈধ পাসপোর্ট বাণিজ্য, এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন ব্যবস্থার দুর্বলতা—সব মিলিয়ে এই ইস্যুটি এখন একটি বহুমাত্রিক সংকটে পরিণত হয়েছে। একদিকে মানবিক দায়, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ভারসাম্য—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবকে খুঁজতে হচ্ছে একটি টেকসই সমাধান।

এই প্রসঙ্গে সোমবার(২০ এপ্রিল) বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফর বিন আবিয়াহ। বৈঠককালে তাঁরা দুই দেশের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ইস্যু, সৌদি আরবে বসবাসরত ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাদের (মিয়ানমার নাগরিক) বাংলাদেশী পাসপোর্ট প্রদান, পর্যটন ও জ্বালানি খাতে সৌদি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

রাষ্ট্রদূত পাসপোর্ট ইস্যুর প্রক্রিয়া দ্রুত করার ওপর জোর দেন। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনীয় দলিলের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে ২২ হাজার রোহিঙ্গাকে পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে এবং প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে বাংলাদেশ থেকে বিশেষ টিম পাঠানো হয়েছে। তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেন—পাসপোর্ট ইস্যুতে কোনো দুর্নীতি বা অনিয়ম সহ্য করা হবে না। যাদের বৈধ কাগজ আছে, তাদের দ্রুত পাসপোর্ট দিতে সৌদি আরব থেকে পূর্ণাঙ্গ তালিকা চেয়ে পুনরায় যাচাইয়ের নির্দেশ দেন মন্ত্রী।বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

তথ্যানুযায়ী, ১৯৭৭-৭৮ সালে ২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে, যার মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার মিয়ানমারে ফিরে যায়। এরপর ১৯৯১ সালে ২ লাখ ৫০ হাজার ৮৭৭ জন অনুপ্রবেশ করে, যার মধ্যে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৯ জন মিয়ানমারে ফিরে যায়। ২০১২ থেকে ১৬ সাল পর্যন্ত ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে। তারপর ২০১৭ সালে ৮ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে। আর ২০২৪ সাল থেকে প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। যার মধ্যে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৩ লাখ । পরিবার রয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ২৭৪টি। আশ্রিতদের মধ্যে ৫২ শতাংশ শিশু, ৪৪ শতাংশ প্রাপ্ত বয়স্ক এবং ৪ শতাংশ বয়স্ক রয়েছে। যার মধ্যে ৪৯ শতাংশ পুরুষ এবং ৫১ শতাংশ নারী। আর প্রতিবছর ৩০ হাজার রোহিঙ্গা শিশু জন্মগ্রহণ করে।

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে স্থানীয় জনগোষ্ঠী রয়েছে ৫ লাখের কাছাকাছি। কিন্তু তার বিপরীতে রোহিঙ্গার সংখ্যা দ্বিগুণের কাছাকাছি। সম্প্রতি প্রথম পর্যায়ে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের জন্য শনাক্ত করেছে মিয়ানমার। তাই রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর জন্য প্রস্তুত হচ্ছে ট্রানজিট সেন্টার। নতুনভাবে ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দুটি ট্রানজিট সেন্টার হস্তান্তর হচ্ছে শিগগিরই। টেকনাফ ও ঘুমধুমে আগে থেকেই প্রস্তুত আছে দুটি। আর প্রত্যাবাসনের জন্য সম্মত রোহিঙ্গাদের তালিকা হালনাগাদ করার কথা বলছে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ সরকার ২০১৮ সাল থেকে নানা প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছে। কিন্তু নানা ছলচাতুরির মাধ্যমে মিয়ানমার একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত নেয়নি।

 

 

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর