বিশেষ প্রতিবেদক :: গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে জ্বলছে কক্সবাজার। প্রখর রোদে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হলেও এই আবহাওয়া লবণ ও শুঁটকি—দুটি শিল্পের জন্য সাধারণত অনুকূল।
তবে এ মৌসুমে লবণ উৎপাদন চলমান থাকলেও মাছের সংকটে প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে শুঁটকি শিল্প।
১৫ এপ্রিল থেকে সাগরে মাছ ধরার ওপর ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ায় শুঁটকিপল্লিগুলোতে কাঁচামালের তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে।
অন্যান্য বছর নিষেধাজ্ঞার আগে মহালমালিকরা মাছ মজুত করে রাখলেও এবার তা সম্ভব হয়নি।
ফলে জেলার অধিকাংশ শুঁটকিমহালে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। সীমিত পরিসরে বিদেশ থেকে আমদানি করা মাছ দিয়ে কিছু মহালে কাজ চললেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।
কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের নাজিরারটেক উপকূলে প্রায় ৭০০টি শুঁটকিমহাল রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৬৫০টি মহাল বন্ধ হয়ে আছে।
মাত্র ৫০-৬০টি মহালে আমদানি করা মাছ দিয়ে সামান্য উৎপাদন চলছে, যেখানে অল্পসংখ্যক শ্রমিক কাজের সুযোগ পাচ্ছেন।
স্থানীয়রা বলছেন, গ্রীষ্মকাল শুঁটকি তৈরির জন্য সবচেয়ে উপযোগী সময়। কিন্তু মাছের সংকট ও সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে এ সুযোগ কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
এতে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন, যাদের বড় একটি অংশ নারী।
নাজিরারটেকের শুঁটকিপল্লির অধিকাংশ শ্রমিকই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষ। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ঘরবাড়ি হারিয়ে তারা এখানে বসতি গড়েন।
জীবিকার তাগিদে বছরের পর বছর শুঁটকিমহালেই কাজ করে আসছেন তারা।
এদেরই একজন মায়েশা বেগম। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত টানা ১২ ঘণ্টা কাজ করেও দিনে মাত্র ৫০০ টাকা আয় করেন তিনি। এত অল্প আয়ে বড় পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
একই অবস্থা সামছুন্নাহারের মতো আরও অনেক শ্রমিকের, যাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনের পথ এই কাজ।
শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা জানান, গত কয়েক মাস ধরে সাগরে মাছের আহরণ কমে যাওয়ায় এ সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
আগে স্থানীয়ভাবে ধরা মাছই শুঁটকি তৈরির প্রধান উৎস ছিল, এখন তা অনেকটাই কমে গেছে। ফলে ভারত, ওমানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মাছ আমদানি করে সীমিত উৎপাদন চালাতে হচ্ছে।
জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে শুঁটকি উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় কমেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাছের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এ খাতের পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
অন্যদিকে, কক্সবাজার শহরের বাজারগুলোতে স্থানীয় শুঁটকির ঘাটতি থাকায় আমদানিকৃত শুঁটকি বিক্রি বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো স্থানীয় উৎপাদিত বলে বিক্রি করা হচ্ছে।
সরবরাহ কম থাকায় বাজারে শুঁটকির দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, নিষেধাজ্ঞা শেষ হলে জেলেরা আবার সাগরে নামবেন। তখন মাছের জোগান বাড়লে শুঁটকি উৎপাদন স্বাভাবিক হবে এবং বাজারদরও কমে আসবে।
শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, “সাগরে মাছ কমে যাওয়ায় উৎপাদন বিপর্যস্ত। আগে স্থানীয় ট্রলার থেকে প্রচুর সরবরাহ মিলত, এখন আমদানি করা মাছেই ভরসা।” তাঁর মতে, নিষেধাজ্ঞার সময় কিছুটা পেছালে ক্ষতি সামলানো যেত।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা জানান, মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় শুঁটকি শিল্পও টানাপোড়েনের মুখে। জলবায়ু পরিবর্তন, অতিমাত্রায় ট্রলিং এবং সমুদ্রদূষণ এর বড় কারণ হতে পারে—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সূত্র :: আব্দুল কুদ্দুস রানা।













