কক্সবাংলা ডটকম(৩০ এপ্রিল) :: বৈশাখের শুরুতেই সারা দেশে বজ্রপাতের ভয়াবহতা নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। দিনভিত্তিক বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের কৃষিজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন।
চলতি বছরে এ পর্যন্ত বিভিন্ন জেলায় বজ্রপাতে ৭৮ জনের মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সংশ্লিষ্টরা এটিকে ‘নীরব দুর্যোগ’ উল্লেখ করে বজ্রপাত নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও ধারাবাহিক পরিকল্পনার অভাবকে দায়ী করেছেন।
অথচ বজ্রপাত নিরোধে ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত টিআর-কাবিখা প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে নতুন তৈরি করা সড়কের দুই পাশে তালগাছ লাগানোর কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।
এ জন্য শর্ত সাপেক্ষে কিছু বরাদ্দ ছিল। কিন্তু ২০২২-২৩ অর্থবছরের পর থেকে নেই কোনো আর্থিক বরাদ্দ, সরকারি উদ্যোগে সচেতনতা বাড়াতে এ-সংক্রান্ত নেই কোনো কর্মসূচি।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯-২০ সালের মধ্যে দেশে বজ্রপাত হয়েছে ৩১ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি। দেশে সারা বছর যে পরিমাণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৬ শতাংশ হয় মে মাসে।
ঋতুভিত্তিক বিন্যাসেও বজ্রপাতের ধরনে পার্থক্য রয়েছে। মার্চ থেকে মে মাসে প্রায় ৫৯ শতাংশ, আর মৌসুমি বায়ু আসার সময় অর্থাৎ জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৬ শতাংশ বজ্রপাত হয়।
তবে মোট বজ্রপাতের প্রায় ৭০ শতাংশ হয় এপ্রিল থেকে জুনে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশে বজ্রপাত বৃদ্ধির প্রধান কারণ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ুর ধরন পরিবর্তন। পাশাপাশি বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং ব্যাপক বায়ুদূষণ এর জন্য দায়ী।
বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়েছে, যা শক্তিশালী কিউমুলোনিম্বাস মেঘ তৈরি করে।
তা ছাড়া অভ্যন্তরীণ বনভূমি হ্রাস ও জলাভূমি ভরাটের কারণে দেশে বজ্রপাতের পরিমাণ বাড়ছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি বৃদ্ধি পেলে বজ্রপাতের সম্ভাবনাও বেড়ে যায় শতকরা ১০ থেকে ১২ ভাগ।
এ ছাড়া ভৌগোলিক অবস্থানই এর মূল কারণ জানিয়ে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের একপাশে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা গরম ও আর্দ্র বাতাস এবং অন্যদিকে হিমালয় থেকে আসা ঠাণ্ডা বাতাসের সংমিশ্রণ বজ্রঝড় বা ‘কালবৈশাখী’র তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়।
সেই সঙ্গে কলকারখানা ও যানবাহনের ধোঁয়া এবং বাতাসে ভাসমান সালফেট কণা বা ধূলিকণা মেঘের মধ্যে বৈদ্যুতিক চার্জ (স্থির বিদ্যুৎ) তৈরি করতে সাহায্য করে, যা বজ্রপাত বৃদ্ধির জন্য দায়ী।
নগরায়ণকেও অনেকটা দায়ী করে আবহাওয়াবিদরা জানান, কংক্রিটের দালানকোঠা ও পিচের রাস্তা তাপ ধরে রাখে, যা স্থানীয়ভাবে বাতাসের তাপমাত্রা বাড়িয়ে মেঘের ভেতরে বৈদ্যুতিক চার্জ বাড়িয়ে দেয়।
চলতি বৈশাখজুড়ে বজ্রপাতে প্রাণহানি বেড়েই চলেছে। চলতি বছর এ পর্যন্ত বজ্রপাতে ৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এপ্রিলের শুরুতেই নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একাধিক মৃত্যু ঘটে। ২২ ও ২৩ এপ্রিল কয়েকটি জেলায় ৪-৫ জন নিহত হন।
২৬ এপ্রিল গাইবান্ধায় ৫ জন, সিরাজগঞ্জে ২ জন, জামালপুরে ২ জন, ঠাকুরগাঁওয়ে ২ জন, পঞ্চগড়ে ১ জন, বগুড়ায় ১ জন ও নাটোরে ১ জনের মৃত্যু হয়। পরদিন নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলায় আরও প্রাণহানি ঘটে।
২৯ এপ্রিল আরও কয়েকটি জেলায় মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
২০১৬ সালে এক বছরে বজ্রপাতে মৃত্যু হয় প্রায় ২০০ জনের। সে সময় এক দিনেই মৃত্যু হয়েছে ৮২ জনের। এক বছরে বজ্রপাতের এমন তাণ্ডব হওয়ায় একই বছর (২০১৬ সাল) বজ্রপাতকে ‘দুর্যোগ’ হিসেবে ঘোষণা করে সরকার।
এরপর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সরকার বজ্রপাতের ক্ষতি কমাতে দেশব্যাপী সড়কের উভয় পাশে তালগাছ রোপণের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু ২০২২-২৩ অর্থবছরে সরকারের এ উদ্যোগ থেমে যায়।
চলতি বছর বজ্রপাতে মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছানোর কারণে সরকারের পুরোনো উদ্যোগ ‘তালগাছ লাগানোর প্রকল্প’ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সরকারি হিসাবে, ২০১৭-২০১৮ থেকে ২০২১-২০২২ অর্থবছর পর্যন্ত সারা দেশে মোট ৫৯ লাখ ৫ হাজার ৮৫৫টি তালগাছ রোপণ করা হয়। এর মধ্যে ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে ৩১ লাখ ৯৮ হাজার ৭৩০টি, ২০১৮-২০১৯ সালে ১৭ লাখ ২৯ হাজার ২৮টি, ২০১৯-২০২০ সালে ৩ লাখ ৬৯ হাজার ২৮৬টি, ২০২০-২০২১ সালে ৩ লাখ ২৮ হাজার ৫৮১টি এবং ২০২১-২০২২ সালে ২ লাখ ৮০ হাজার ২৩০টি তালগাছ লাগানো হয়।
এই কর্মসূচির জন্য বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দও দেওয়া হয়েছিল। ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে কাবিটা কর্মসূচির আওতায় প্রায় ২৭১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়, যার একটি বড় অংশ খাদ্যশস্য (চাল) হিসেবে বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া ২০২০-২০২১ অর্থবছরে প্রায় ৩৮০ কোটি ৫১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
তালগাছকে প্রাকৃতিক ‘লাইটনিং রড’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রায় ৯০-১০০ ফুট উঁচু এই গাছ বজ্রপাতের সময় বিদ্যুৎ শোষণ করে আশপাশের মানুষ ও গবাদিপশুকে সুরক্ষা দিতে পারে।
তবে তালগাছ বড় হতে হতে ১০ থেকে ১৫ বছরের দীর্ঘ সময় ও বীজ ও চারা রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং অব্যবস্থাপনার কারণে ২০২২ সাল থেকে সরকার তালগাছ প্রকল্প থেকে সরে এসে আধুনিক বজ্রনিরোধক টাওয়ার (লাইটনিং অ্যারেস্টার) ডিভাইস স্থাপন শুরু করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সরকার বজ্রপাতকে দুর্যোগ ঘোষণা করলেও বজ্রপাত নিরোধে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করেনি। এ জন্য আলাদা কোনো অর্থ বরাদ্দ ছিল না কখনো।
কাবিটা ও টিআর প্রকল্পের আওতায় যেসব নতুন সড়ক তৈরি হবে বা সংস্কার হবে সেই সড়কের দুই পাশে অথবা এক পাশে তালগাছের চারা লাগাতে হবে এমন শর্ত দিয়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পরে সরকারের এই নির্দেশনা বাস্তবায়িত হয় ২০২২ সাল পর্যন্ত।
অধিদপ্তরের অপর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রথমে ১৫টি জেলায় বজ্রপাত নিরোধক টাওয়ার স্থাপনের জন্য সাড়ে ১৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে সাধারণ বরাদ্দের আওতায় অতিরিক্ত ১৫টি জেলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
পরে যোগ হওয়া ১৫টি জেলায় টিআর প্রকল্পের বরাদ্দের আওতায় বজ্র নিরোধক টাওয়ার স্থাপন করা হয়। বাস্তবায়িত ৩০ জেলায় এ পর্যন্ত ৪১৫টি বজ্র নিরোধক টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫৭টি বজ্র নিরোধক টাওয়ার সচল আছে এবং অচল হয়ে আছে ৫৮টি টাওয়ার।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সারা দেশে গ্রামীণ সড়কের পাশে তালগাছ লাগানোর পরিকল্পনা থাকলেও মাঝখানে এই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে আবার নতুন করে তালগাছ লাগানোর চিন্তা করা হচ্ছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বলেন, বজ্রপাতে প্রাণহানি রোধে সরকার সচেতনতা বৃদ্ধি, সাইরেন স্থাপন, তালগাছ রোপণ এবং বজ্র নিরোধক টাওয়ার বসানোর মতো একাধিক উদ্যোগ নিচ্ছে।
বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় বজ্রপাতের ঝুঁকি বেশি, যেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৫টিরও বেশি বজ্রপাত হয়। এ সময় ত্রাণমন্ত্রী স্বীকার করে বলেন, বজ্রপাত জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষিত হলেও এখনো কার্যকর সমন্বিত কর্মসূচি ও সঠিক পরিসংখ্যানের অভাব রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বজ্রপাত মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গবেষণা ও ধারাবাহিক উদ্যোগ জরুরি। তালগাছ লাগানো একটি প্রাকৃতিক সমাধান হলেও তা মাঝপথে থেমে যাওয়ায় এর সুফল পুরোপুরি পাওয়া যায়নি। ফলে প্রতিবছর বৈশাখ এলেই বজ্রপাতের এই নীরব দুর্যোগ নতুন করে প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে।
দেশে বজ্রপাতের হার বৃদ্ধি প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল সরোয়ার বলেন, দুর্যোগ তৈরি হয় কিছুটা প্রাকৃতিকভাবে। আবার কিছু দুর্যাগের সৃষ্টি হয় মানুষের অসচেতনতার কারণে। এর মধ্যে বজ্রপাত প্রকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি।
তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে আমাদের দেশের জলবায়ুর ধরনে পরিবর্তন হয়েছে। তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে বায়ুমণ্ডলে এর প্রভাব পড়ায় বজ্রমেঘ সৃষ্টি হচ্ছে। বায়ুমণ্ডলে পানির সঙ্গে মেঘের কনার সংঘর্ষের ফলে বজ্রমেঘ তৈরি হয়। এসব তৈরির পেছনে মানুষের কিছুটা হাত রয়েছে।
মানুষ পুকুর-জলাশয় ভরাট করেছেন। ফলে আগে পানি তাপ শোষণ করতে পারলেও এখন পারছে না। সম্প্রতি বজ্রপাতে যেসব মানুষ মারা গেছেন তারা প্রায় সবাই খোলা মাঠে মারা গেছেন। আশপাশে কোনো আশ্রয়কেন্দ্র ছিল না। এখন যেহেতু বজ্রপাতে মানুষ বেশি মারা যাচ্ছেন, তাই এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
উঁচু হয় এমন কিছু গাছ বেশি বেশি লাগাতে হবে। আবার বড় ও উঁচু গাছপালাগুলো বজ্রপাতকে শোষণ করে ফেলে। এ জন্য বনায়ন বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বাড়ির আশপাশে তাল, নারিকেল, সুপারির মতো লম্বা লম্বা উঁচু গাছ কেটে ফেলেছে। সেসব আবার লাগাতে হবে। এভাবেই প্রাকৃতিক এই দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হবে।’













