মঙ্গলবার ১২ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১২ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অবশেষে পশ্চিমবঙ্গে ঐতিহাসিক জয় গেরুয়া শিবিরের : এককভাবে সরকার গঠনের পথে বিজেপি

🗓 মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬

👁️ ৫৩ বার দেখা হয়েছে

🗓 মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬

👁️ ৫৩ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(৫ মে) :: সব জল্পনার অবসান। দীর্ঘ দেড় দশক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনের ইতি টেনে পশ্চিমবঙ্গের মসনদে বসতে চলেছে বিজেপি । স্রেফ জয় নয়, রীতিমতো দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নবান্ন দখল করল গেরুয়া শিবির।

অবশেষে অধরা রাজ্য ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।

দীর্ঘদিন ধরেই হিন্দিভাষী উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের পাশাপাশি পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও প্রভাব বাড়িয়ে আসছিল দলটি।

তবে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবোধে দৃঢ় পশ্চিমবঙ্গ এতদিন তাদের নাগালের বাইরে ছিল।

রোববার ভোট গণনা শেষে বেসরকারি ফলাফলে দেখা গেছে, ২৯৪ আসনের বিধানসভায় বিজেপি ২০০-র বেশি আসনে জয়লাভ করে এককভাবে সরকার গঠনের পথে এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৮১টি আসন। বাম জোট ও কংগ্রেস পেয়েছে দুটি করে আসন।

পশ্চিমবঙ্গের এই ফলাফলকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত অর্ধশতকে রাজ্যটিতে সরকার পরিবর্তন হয়েছে মাত্র একবার—৩৪ বছর বামফ্রন্টের শাসনের পর টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজ্যটিতে দীর্ঘদিন ধরে ‘একক প্রভাবশালী দলভিত্তিক’ রাজনীতির প্রবণতা ছিল, যা এবার ভেঙে গেছে।

কৌশলী নেতৃত্বে বিজেপির সাফল্য

এই জয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। নির্বাচনের সময় তিনি টানা প্রায় দুই সপ্তাহ পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম তদারকি করেন।

দিনভর জনসভা ও রোডশো করার পাশাপাশি রাতে নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করে নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ করেন।

তার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান, ভূপেন্দ্র যাদব, বিজেপির জাতীয় সাধারণ সম্পাদক সুনীল বানসাল, ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব এবং আইটি সেলের প্রধান অমিত মালব্য সমন্বিতভাবে মাঠপর্যায়ে ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রচার জোরদার করেন।

বুথভিত্তিক সংগঠন গড়ে তোলা থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনমত তৈরিতে তাদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

মোদির প্রতিক্রিয়া

ফলাফল প্রকাশের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, পশ্চিমবঙ্গে ‘পদ্ম ফুটেছে’ এবং জনগণের রায়ে সুশাসনের বিজয় হয়েছে। তিনি রাজ্যের মানুষের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করার আশ্বাস দেন।

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ঐতিহাসিক জয়ের পর একসুরে প্রতিক্রিয়া দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। দু’জনেই এই জয়ের কৃতিত্ব দিয়েছেন দলের কর্মীদের ত্যাগ, সংগ্রাম এবং মানুষের আস্থাকে। বিজেপির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেন দুজনই।

মমতার অভিযোগ

অন্যদিকে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি দাবি করেন, শতাধিক আসনে কারচুপি হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেনি। তবে তিনি ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেছেন।

তিন কারণ বড়

কী করে এই অসম্ভব সম্ভব হলো, দিনভর তা নিয়েই চলেছে গবেষণা। তিনটি কারণ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

প্রথম কারণ, নির্বাচন কমিশনের অতি তৎপরতা। গত বছরের শেষার্ধে নির্বাচন কমিশন সারা দেশের ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। লক্ষ্য, ভুয়া ভোটারের পাশাপাশি ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ তালিকা থেকে হটানো। বিজেপি নেতারা বারবার তা মনেও করিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, এক কোটি অনুপ্রবেশকারী ও রোহিঙ্গাকে বাছাই করা হবে। বিহার রাজ্যে ভোটের আগে এই সংশোধনের কাজে হাত দেওয়া হয়। সেই ভোট মিটতেই পশ্চিমবঙ্গসহ মোট ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে এসআইআরের আওতায় আনা হয়, যদিও কমিশনের গঠনতন্ত্রে এসআইআরের কোনো উল্লেখই নেই। সময়–সময় ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ নির্বাচন কমিশন করেই থাকে।

বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর সোমবার নয়া দিল্লিতে বিজেপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি
বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর সোমবার নয়া দিল্লিতে বিজেপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিছবি: নরেন্দ্র মোদির ফেসবুক থেকে নেওয়া

কিন্তু এবার যেভাবে তা করা হলো, তাতে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় এক কোটি মানুষ ভোটাধিকার হারালেন। ২৭ লাখ মানুষ ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যানসি’র ফাঁদে আটকে ভোটই দিতে পারলেন না। এসআইআর–আতঙ্ক এমনভাবে মানুষকে শঙ্কাগ্রস্ত করে তোলে—জনতা ভাবতে থাকেন, এবার ভোট না দিলে তাঁদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠে যাবে। এর ফলে দেখা গেল, ২০২৪ সালের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের ভোটার ৭ কোটি ৬২ লাখের জায়গায় কমে দাঁড়াল ৬ কোটি ৮২ লাখ। ভোটার কমলেও আগেরবারের তুলনায় এবার ভোট পড়ল ৩০ লাখ বেশি।

এসআইআরের কোপ সবচেয়ে বেশি পড়েছে মুসলমান ও মতুয়া সম্প্রদায়ের ওপর। কেন মুসলমান, তা সহজেই অনুমেয়। তৃণমূল কংগ্রেস তা প্রচারও করেছে। অবশ্য তাদের আশা ছিল, মতুয়া ভোটে কোপ পড়ার ফলে ওই সম্প্রদায় বিজেপির প্রতি রুষ্ট হবে। কিন্তু দেখা গেল, মুসলমান ভোট সব জায়গায় ঢালাওভাবে তৃণমূলের ঝুলিতে আসেনি। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ ও মালদহে। নাগরিকত্ব আইনে লাভ না হওয়া ও ভোটার তালিকায় নাম না ওঠা সত্ত্বেও মতুয়ারা বিজেপির প্রতি ভরসা রাখতে চেয়েছে। তাদের কথায়, নাগরিকত্ব দিলে দিল্লিই দেবে। দিদি নন। ভোটেও তারই প্রতিফলন ঘটেছে।

অন্যান্য রাজ্যে চমক

একই দিনে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখা গেছে।

  • তামিলনাড়ু: অভিনেতা থেকে রাজনীতিক হওয়া বিজয় থালাপাতির দল তামিলাগা ভেত্রি কাজগম (টিভিকে) ১০৭টি আসন পেয়ে সরকার গঠনের পথে। ডিএমকে পেয়েছে ৭৪ এবং এআইএডিএমকে জোট ৫২ আসন।
  • কেরালা: কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ) ১৪০ আসনের মধ্যে ৮৯টি জিতে ক্ষমতায় আসছে। বাম জোট এলডিএফ পেয়েছে ৩৫টি আসন।
  • আসাম: ১২৬ আসনের মধ্যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট ১০১টি আসনে জয় পেয়ে ক্ষমতা ধরে রেখেছে।
  • পুদুচেরি: ৩০ আসনের বিধানসভায় বিজেপি জোট ১৮টি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।

সার্বিক চিত্র

সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন ভারতের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই বিজয় দেশের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর