কক্সবাংলা ডটকম(১৪ মে) :: দেশের অর্থনীতি এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এক দিকে রাজস্ব আদায়ে বিশাল ঘাটতি, অন্য দিকে বিদেশি ঋণ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ। এই দুর্বল ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই সরকার আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ — ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার।
বাজেটের হিসাব-নিকাশ
প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থের জোগান আসবে দেশি-বিদেশি ঋণ থেকে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বৈদেশিক ঋণ থেকে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। রাজস্ব ঘাটতির বিষয়টি মাথায় রেখে বাজেট সহায়তা হিসেবে আরও প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে।
ইতিহাসের সর্বোচ্চ বৈদেশিক ঋণ
ইআরডি সূত্র জানাচ্ছে, আগামী অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। গত অর্থবছরের মূল এডিপির তুলনায় এবার ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে ২৪ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপির তুলনায় বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা — অর্থাৎ প্রায় ৫২ শতাংশ বেশি।
চলতি অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৬ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু ৯ মাসে ঋণ ছাড় হয়েছে মাত্র ৪৭ হাজার কোটি টাকা। তার পরেও নতুন বছরে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়ছে — যা পরিস্থিতির গভীরতা স্পষ্ট করে।
পুরনো ঋণ পরিশোধের ভার
নতুন ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনার পাশাপাশি পুরনো ঋণ পরিশোধের চাপও দ্রুত বাড়ছে। ইআরডির তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশকে মোট প্রায় ২৫.৯৯ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে আসল ১৮.৩৮ বিলিয়ন ডলার এবং সুদ প্রায় ৭.৬ বিলিয়ন ডলার। শুধু ২০২৯-৩০ অর্থবছরেই পরিশোধ করতে হবে প্রায় ৫.৫ বিলিয়ন ডলার, যা হবে সবচেয়ে চাপের বছর।
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ একাধিক মেগা প্রকল্পের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ায় আসল ঋণ পরিশোধ শুরু হতে চলেছে। কিন্তু এই প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল না মেলায় ঋণের বোঝা অর্থনীতির জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে বাংলাদেশকে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৪০৯ কোটি ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে। আগের অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ৩৩৫ কোটি এবং তার আগের বছর ছিল ২৬৭ কোটি ডলার। বৈশ্বিক সুদের হার বৃদ্ধিই মূলত এই ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, চলতি অর্থবছরে এই পরিমাণ সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
রাজস্বে ধস, ব্যাংকে ভার
রাজস্ব খাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আট মাসের হিসাবে দেখা গেছে, লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা।
এই শূন্যস্থান পূরণ করতে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা — যা পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। শুধু জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকেই ঋণ নেওয়া হয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, সরকারের এই অতিরিক্ত ব্যাংকঋণ বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে বাধা তৈরি করছে। কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি এটি দীর্ঘমেয়াদে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আইএমএফ ও আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তা
বর্তমানে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ২৩ লাখ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যেই উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে নতুন করে প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা চাওয়া হয়েছে। তবে আইএমএফের ৪.৭৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণের পরবর্তী কিস্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। সংস্কার ও শর্ত বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে ওয়াশিংটনে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকেও স্পষ্ট নিশ্চয়তা মেলেনি।
এই চাপের মুখেই সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করেছে, যদিও আগে বারবার দাম না বাড়ানোর আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। আইএমএফের ভর্তুকি কমানোর চাপ এবং বিপুল আর্থিক ক্ষতি সামলাতেই এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, এর প্রভাব মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।
ব্যয়ের চাপ কমছে না
চলতি অর্থবছরে শুধু সুদ পরিশোধেই বরাদ্দ ছিল প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। আগামী বাজেটে তা বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকায়। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে জ্বালানি ভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিস্তার, নতুন বেতন কাঠামো এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপ। সব মিলিয়ে বাজেট ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশ যেন ঋণ ফাঁদে না পড়ে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সম্পদ আহরণ ও রাজস্ব বাড়ানো।”
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “শুধু ঋণ নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। আমদানি ব্যয়, রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স, ভর্তুকি ও রাজস্ব পরিস্থিতি মিলিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর চাপের স্পষ্ট মূল্যায়ন জরুরি। পাশাপাশি সমন্বিত সংস্কার ও উন্নয়ন সহযোগীদের কার্যকর সহায়তাও প্রয়োজন।”
অর্থনীতিবিদরা একমত — উচ্চ সুদের বৈদেশিক ঋণ, ক্রমবর্ধমান ব্যাংকনির্ভরতা, রাজস্ব ঘাটতি আর ভারী সুদ পরিশোধের বোঝা নিয়ে এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য সহজ হবে না। এখনই কাঠামোগত সংস্কারে না গেলে এই ‘মহাবাজেট’ ভবিষ্যতে একটি মহাসংকটের বীজ বপন করে যাবে।













