মঙ্গলবার ২৩ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্বকাপে ‘হাইড্রেশন বিরতি’ বদলে দিচ্ছে ম্যাচের ছন্দ?

🗓 রবিবার, ২১ জুন ২০২৬

👁️ ১৮ বার দেখা হয়েছে

🗓 রবিবার, ২১ জুন ২০২৬

👁️ ১৮ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম :: উত্তর আমেরিকার গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহ ও আর্দ্রতার কথা বিবেচনায় নিয়ে খেলোয়াড়দের সুরক্ষার জন্য ফিফা এবার প্রতিটি ম্যাচে বাধ্যতামূলকভাবে দুটি করে হাইড্রেশন বিরতি চালু করেছে। প্রতি অর্ধের মাঝামাঝি সময়ে খেলা থেমে যাচ্ছে প্রায় ৩ মিনিটের জন্য।

কাগজে-কলমে বিষয়টি যুক্তিসংগত। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ক্লাব বিশ্বকাপে চরম গরমের কারণে খেলোয়াড়দের শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল। সে অভিজ্ঞতার আলোকে রাখা হয়েছে পানি পানের বিরতি। কিন্তু মাঠে বাস্তব চিত্র দেখা যাচ্ছে কিছুটা ভিন্ন।

এ বিরতি কেবল খেলোয়াড়দের পানি খাওয়ানোর জন্য নয়; বরং এটি ম্যাচের গতি, মোমেন্টাম, কৌশল এবং দর্শক অভিজ্ঞতার ওপরও বড় প্রভাব ফেলছে। এটি ম্যাচের সম্প্রচার অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে।

হাইড্রেশন বিরতি নিয়ে বিতর্কের মূল কারণ মাঠের কৌশলগত প্রভাব। ফুটবল ঐতিহ্যগতভাবে এমন একটি খেলা, যেখানে কোচরা ম্যাচ চলাকালে সরাসরি খেলোয়াড়দের সঙ্গে খুব সীমিত যোগাযোগের সুযোগ পান। টাচলাইনে দাঁড়িয়ে নির্দেশনা দেয়া যায়, কিন্তু পুরো দলকে একত্র করে কৌশল বোঝানোর সুযোগ খুব কমই আসে। হাইড্রেশন বিরতি সেই বাস্তবতা বদলে দিয়েছে।

এখন প্রায় প্রতিটি হাইড্রেশন বিরতিতেই দেখা যাচ্ছে, কোচরা খেলোয়াড়দের ঘিরে কৌশলগত আলোচনা করছেন। কেউ ট্যাকটিক্যাল বোর্ড বের করছেন, কেউ মাঠে অবস্থান বদলের নির্দেশ দিচ্ছেন, কেউ বা প্রতিপক্ষের দুর্বলতা কাজে লাগানোর নতুন পরিকল্পনা তুলে ধরছেন। ফলে ৩ মিনিটের এ বিরতি কার্যত ফুটবলের এক ধরনের ‘টাইমআউট’-এ পরিণত হয়েছে।

ব্রাজিল বনাম মরক্কো ম্যাচের কথাই ধরা যাক। ম্যাচে প্রথম দিকে ব্রাজিলকে ছন্নছাড়া দেখাচ্ছিল। মাঝমাঠে সংযোগ ছিল না, আক্রমণেও ছিল না ধার। ঠিক তখনই আসে হাইড্রেশন বিরতি। খেলোয়াড়দের ডেকে নিয়ে কিছু কৌশলগত পরিবর্তনের নির্দেশ দেন আনচেলত্তি। খেলা পুনরায় শুরু হওয়ার পরই ব্রাজিলের পারফরম্যান্সে পরিবর্তন দেখা যায় এবং ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের গোলে তারা সমতায় ফেরে। ম্যাচ শেষে আনচেলত্তি স্বীকার করেছেন, এমন বিরতি কোচদের জন্য সমস্যা ব্যাখ্যা করা এবং তাৎক্ষণিক সমাধান দেয়ার সুযোগ তৈরি করে।

বেলজিয়ামের কোচ রুডি গার্সিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি আরো স্পষ্ট। তার মতে, এটি ‘কুলিং ব্রেক’ নয়, বরং ‘কোচিং ব্রেক’। ম্যাচের মাঝপথে দলকে নতুন তথ্য দেয়া কিংবা প্রতিপক্ষের কৌশলের জবাব তৈরির জন্য এটি মূল্যবান সময়।

অবশ্য এ সুবিধা সবসময় ইতিবাচক ফল দেয় না। অনেক সময় ম্যাচের ছন্দও ভেঙে যায়। ফুটবলে ‘মোমেন্টাম’ বা গতিপ্রবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো দল ভালো খেলতে শুরু করলে, আক্রমণের পর আক্রমণ চালালে কিংবা গোল করে আত্মবিশ্বাস পেলে সেই ছন্দ ধরে রাখাই তাদের লক্ষ্য থাকে। কিন্তু হাইড্রেশন বিরতি সেই ধারাবাহিকতা হঠাৎ থামিয়ে দিতে পারে।

এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ কুরাসাও-জার্মানি ম্যাচ। কুরাসাও বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অঘটনের স্বপ্ন দেখছিল। তারা জার্মানির বিপক্ষে সমতায় ফিরেছিল এবং ম্যাচে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ঠিক তার পরই আসে বিরতি। সেই সময় জার্মান কোচ জুলিয়ান নাগেলসমান তার দলকে পুনর্গঠিত করেন। খেলা শুরু হওয়ার পর জার্মানি আবার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং শেষ পর্যন্ত ৭-১ গোলের বিশাল জয় পায়। বিরতিই জার্মানির জয়ের একমাত্র কারণ নয়, কিন্তু ম্যাচের মোড় ঘোরানোর ক্ষেত্রে এর ভূমিকা ছিল বলেই অনেকে মনে করেন।

স্পেনের সাবেক মিডফিল্ডার হুয়ান মাতাও খেলোয়াড়দের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, একজন ফুটবলার যখন পিছিয়ে থাকে, তখন দ্রুত গোল শোধ করার জন্য অবিরাম চাপ তৈরি করতে চায়। আবার এগিয়ে থাকা দল বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায়। মাঝপথে খেলা থেমে গেলে দুই ক্ষেত্রেই ছন্দ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

বিতর্কের আরেকটি বড় কারণ হাইড্রেশন বিরতি সব ম্যাচেই বাধ্যতামূলক। আবহাওয়া যতই অনুকূল হোক, স্টেডিয়ামে ছাদ থাকুক কিংবা তাপমাত্রা আরামদায়ক পর্যায়ে থাকুক—নিয়ম সবার জন্য একই। ফলে এমন অনেক ম্যাচেও খেলা থামানো হয়েছে, যেখানে গরম কোনো বড় সমস্যা ছিল না। টরন্টোয় ঘানা-পানামা ম্যাচের সময় তাপমাত্রা ছিল মাত্র ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবু নির্ধারিত সময়ে খেলা থামানো হয়েছে।

এ কারণেই সমালোচকদের একটি অংশ মনে করছে, বিষয়টি কেবল খেলোয়াড় কল্যাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের অভিযোগ, ফুটবলকে ধীরে ধীরে চার কোয়ার্টারের খেলায় রূপ দেয়া হচ্ছে।

উত্তর আমেরিকার ক্রীড়া সংস্কৃতিতে যেভাবে নির্দিষ্ট বিরতির সময় বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়, বিশ্বকাপেও সেই মডেলের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। হাইড্রেশন বিরতির সময় বেশ কয়েকটি সম্প্রচারমাধ্যম সরাসরি বিজ্ঞাপনে চলে যাচ্ছে। ফলে অনেক দর্শকের কাছে মনে হচ্ছে, খেলার ধারাবাহিকতা বাণিজ্যিক প্রয়োজনের কাছে কিছুটা হলেও বিসর্জিত হচ্ছে।

নেদারল্যান্ডস অধিনায়ক ভার্জিল ফন ডাইকও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, প্রতিবার বিরতির সঙ্গে সম্প্রচারে বিজ্ঞাপন চলে যাওয়াটা দর্শকদের অভিজ্ঞতার জন্য খুব সুখকর নয়। বিশেষ করে নিরপেক্ষ দর্শকদের কাছে এটি ম্যাচের স্বাভাবিক প্রবাহে ব্যাঘাত ঘটায়।

বিতর্কের মাঝেও একটি বাস্তবতা অস্বীকার করা কঠিন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ক্রমশ বাড়ছে। ক্রীড়া বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, উত্তর আমেরিকার কিছু ভেন্যুতে দিনের বেলার ম্যাচগুলো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ তাপমাত্রার সীমা অতিক্রম করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

বরং কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, বর্তমান ৩ মিনিটের বিরতিও যথেষ্ট নয়। তাদের দাবি, খেলোয়াড়দের শরীর ঠাণ্ডা করা, পর্যাপ্ত পানি ও ইলেকট্রোলাইট গ্রহণ নিশ্চিত করা এবং শারীরিক পুনরুদ্ধারের জন্য অন্তত ৫-৬ মিনিট সময় প্রয়োজন।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর